দেশের অবকাঠামো বদলে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে গত দেড় দশকে একের পর এক বড় প্রকল্প হাতে নিয়েছিল আওয়ামী লীগ সরকার। পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, পদ্মা সেতু রেলসংযোগ, মাতারবাড়ী বিদ্যুৎকেন্দ্র, গভীর সমুদ্রবন্দর, তৃতীয় টার্মিনাল কিংবা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের মতো প্রকল্পে ব্যয় হয়েছে বিপুল অর্থ।
কিছু প্রকল্প ইতোমধ্যে মানুষের কাজে এসেছে। কিছু এখনো নির্মাণাধীন। আবার কোনো কোনো প্রকল্প চালু হলেও প্রত্যাশিত ব্যবহার বা আয় হচ্ছে না। এর মধ্যে কয়েকটির ব্যয় বারবার বেড়েছে, মেয়াদও দীর্ঘ হয়েছে। ফলে এসব প্রকল্পের সুফল পাওয়ার আগেই রাষ্ট্রকে বহন করতে হচ্ছে বড় অঙ্কের আর্থিক দায়।
বর্তমান নির্বাচিত সরকারের জন্য এটাই এখন বড় বাস্তবতা। একদিকে ভঙ্গুর আর্থিক খাত, অন্যদিকে আগের সরকারের নেওয়া ও অসমাপ্ত বড় প্রকল্পের কাজ এগিয়ে নেওয়ার চাপ। ফলে প্রশ্ন উঠছে—যে প্রকল্পে হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে, সেগুলো শেষ পর্যন্ত দেশের অর্থনীতিতে কতটা আয় ও উৎপাদনশীলতা যোগ করবে?
একসময় অগ্রাধিকার, এখন আর্থিক দায়
২০১৬ সালে তৎকালীন সরকার আটটি প্রকল্পকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে ‘ফাস্ট ট্র্যাক মেগা প্রজেক্ট’ হিসেবে চিহ্নিত করেছিল। এর মধ্যে ছিল পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র, পায়রা সমুদ্রবন্দর, মাতারবাড়ী বিদ্যুৎ প্রকল্প, পদ্মা সেতু রেলসংযোগ এবং দোহাজারী-কক্সবাজার-ঘুমধুম রেললাইন।
এর পরের বছর সরকারি নথিতে ১৩টি রূপান্তরমূলক মেগা প্রকল্পের কথা বলা হয়। সেখানে আগের প্রকল্পগুলোর পাশাপাশি ভোলা গ্যাস পাইপলাইন, এলএনজি টার্মিনাল, মাতারবাড়ী কয়লা টার্মিনাল ও উপকূলীয় পেট্রোকেমিক্যাল শিল্পের মতো প্রকল্পও যুক্ত হয়।
উদ্দেশ্য ছিল বড় অবকাঠামো তৈরি করে দেশের অর্থনীতিকে দ্রুত এগিয়ে নেওয়া। কিন্তু প্রকল্পের আকার যত বড় হয়েছে, ততই সামনে এসেছে ব্যয়, বাস্তবায়ন, ঋণ এবং অর্থনৈতিক সুফলের প্রশ্ন।
প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীরের মতে, অতিমূল্যায়িত প্রকল্প সরকারি অর্থের অপচয় ও দুর্নীতির সুযোগ তৈরি করে। তাঁর ভাষায়, আগের সরকারের এসব প্রকল্পের কাজ চালিয়ে যাওয়াও বর্তমান সরকারের জন্য চাপের কারণ, কারণ দেশের আর্থিক খাতের দুর্বলতা দ্রুত কাটিয়ে ওঠা সম্ভব নয়।
সিপিডির গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেমও মনে করেন, আগের সরকারের অনেক মেগা প্রকল্প অতিমূল্যায়িত ছিল। পাশাপাশি কিছু প্রকল্পের প্রয়োজনীয়তা ও অর্থনৈতিক সুফল নিয়েও প্রশ্ন ছিল।
পদ্মা সেতু আছে, কিন্তু রেলসংযোগে পূর্ণ সক্ষমতা কাজে লাগছে না
৬ দশমিক ১৫ কিলোমিটার দীর্ঘ পদ্মা সেতু ২০২২ সালের জুনে যান চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া হয়। এর প্রকৃত ব্যয় প্রায় ৩২ হাজার ৭৭০ কোটি টাকা।
সড়ক যোগাযোগের ক্ষেত্রে সেতুটি দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সঙ্গে রাজধানীর যোগাযোগে বড় পরিবর্তন এনেছে। তবে এর সঙ্গে যুক্ত পদ্মা সেতু রেলসংযোগ প্রকল্পের পুরো সক্ষমতা এখনো ব্যবহার করা যাচ্ছে না।
ঢাকা থেকে যশোর পর্যন্ত ১৭২ কিলোমিটার নতুন ব্রডগেজ রেলপথ নির্মাণ করা হয়েছে। ঢাকা-মাওয়া, মাওয়া-ভাঙ্গা এবং ভাঙ্গা-যশোর—এই তিন অংশে ভাগ করা প্রকল্পটি অবকাঠামোগতভাবে শেষ হলেও পরিকল্পনা অনুযায়ী ট্রেন চলছে না।
প্রকল্পটির দৈনিক ২৪টি ট্রেন পরিচালনার সক্ষমতা রয়েছে। কিন্তু জনবল, লোকোমোটিভ ও কোচের ঘাটতির কারণে বর্তমানে মাত্র আটটি ট্রেন চলছে।
প্রায় ৩৯ হাজার কোটি টাকার এই প্রকল্পে চীনা ঋণের দায়ও রয়েছে। ফলে শুধু রেললাইন নির্মাণ শেষ করলেই প্রকল্পের সাফল্য নিশ্চিত হবে না। পর্যাপ্ত যাত্রী ও পণ্য পরিবহন নিশ্চিত করে আয় বাড়ানো এখন বড় চ্যালেঞ্জ।
অর্থাৎ অবকাঠামো তৈরি হয়েছে, কিন্তু তার পূর্ণ ব্যবহার না হলে প্রত্যাশিত অর্থনৈতিক সুফল পাওয়া কঠিন।
মেট্রোরেলে সাফল্য, তবে ব্যয়ও কম নয়
সব মেগা প্রকল্পের চিত্র অবশ্য এক নয়। ঢাকার মেট্রোরেল এর একটি বড় উদাহরণ।
এমআরটি-৬-এর উত্তরা-মতিঝিল অংশ চালু হওয়ার পর গত দুই বছরে এর ব্যবহার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। মতিঝিল থেকে কমলাপুর পর্যন্ত অংশের নির্মাণকাজও চলছে।
২০২৪ সালের জুনে এমআরটি-৬-এর সামগ্রিক অগ্রগতি ছিল প্রায় ৭২ শতাংশ। ২০২৬ সালের জুনে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮১ দশমিক ২ শতাংশে। প্রকল্পটির সংশোধিত ব্যয় ৩৩ হাজার ৪৭২ কোটি টাকা।
এদিকে এমআরটি-১ ও এমআরটি-৫-এর কাজও এগিয়েছে। এমআরটি-১-এর অগ্রগতি ২০২৪ সালের জুনের ৪ দশমিক ৬ শতাংশ থেকে ২০২৬ সালের জুনে ২৪ দশমিক ৪ শতাংশ হয়েছে। এমআরটি-৫-এর উত্তর রুটের অগ্রগতিও ৯ দশমিক ৯ শতাংশ থেকে বেড়ে ১৫ দশমিক ৬ শতাংশে পৌঁছেছে।
এখানে বড় প্রশ্ন হলো—নগর পরিবহনে মেট্রোরেল যে সুবিধা দিচ্ছে, তার বিপরীতে নির্মাণ ব্যয় ও ভবিষ্যৎ পরিচালন ব্যয় কতটা টেকসইভাবে সামলানো যাবে।
রূপপুরে বিপুল বিনিয়োগ, বিদ্যুতের অপেক্ষাও দীর্ঘ
দেশের সবচেয়ে ব্যয়বহুল প্রকল্প রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র। প্রায় ১ লাখ ১৪ হাজার ২২৬ কোটি টাকা ব্যয়ের এই প্রকল্পে দুই ইউনিটে মোট ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য রয়েছে।
২০২৪ সালের জুনে প্রকল্পটির অগ্রগতি ছিল প্রায় ৬৫ দশমিক ৭ শতাংশ। ২০২৬ সালের জুনে তা বেড়ে হয়েছে ৮২ দশমিক ৭ শতাংশ।
২০২৬ সালে প্রথম ইউনিটে পারমাণবিক জ্বালানি লোডিংও শুরু হয়েছে। অর্থাৎ প্রকল্পটি এখন নির্মাণের শেষ ধাপ পেরিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রস্তুতির দিকে এগিয়েছে।
তবে বারবার উৎপাদনে যাওয়ার সময় পিছিয়ে যাওয়ায় প্রশ্ন উঠেছে, বিপুল বিনিয়োগের এই প্রকল্প থেকে পূর্ণ সুবিধা পেতে আর কত অপেক্ষা করতে হবে।
এখানে শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু করাই শেষ কথা নয়। প্রকল্পের বিপুল বিনিয়োগ, পরিচালন ব্যয় এবং সংশ্লিষ্ট ঋণের দায় বিবেচনায় নিয়ে দীর্ঘমেয়াদে এর অর্থনৈতিক সুফল কতটা হবে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
কর্ণফুলী টানেল সবচেয়ে বড় সতর্কবার্তা
মেগা প্রকল্পের অর্থনৈতিক বাস্তবতা বোঝার ক্ষেত্রে কর্ণফুলী টানেল সবচেয়ে আলোচিত উদাহরণগুলোর একটি।
প্রায় ১০ হাজার ৬৮৯ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এই টানেল দিয়ে প্রতিদিন ২৮ হাজারের বেশি যানবাহন চলাচলের প্রত্যাশা করা হয়েছিল। কিন্তু বর্তমানে দৈনিক যান চলাচল করছে মাত্র ৪ হাজারের মতো। অর্থাৎ প্রত্যাশিত ব্যবহারের মাত্র ১৪ শতাংশ।
ফলে টোল থেকে যে আয় হচ্ছে, তা দিয়ে টানেলের নির্মাণ ব্যয় তো দূরের কথা, রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় মেটানোও কঠিন হয়ে পড়েছে।
বর্তমান টোল আদায়ের হার দিয়ে নির্মাণ ব্যয় তুলতে প্রায় ২৬৫ বছর সময় লাগতে পারে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। যদিও সাম্প্রতিক সময়ে লোকসানের পরিমাণ কিছুটা কমেছে, তবুও প্রকল্পটি এখনো আর্থিক ঝুঁকির উদাহরণ হয়ে আছে।
পরিকল্পনা কমিশনের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের প্রভাব মূল্যায়নেও এই ঝুঁকির কথা উঠে এসেছে।
এখানেই মেগা প্রকল্পের মূল শিক্ষা—বড় অবকাঠামো নির্মাণ করলেই তা অর্থনৈতিকভাবে সফল হয় না। প্রকল্পটি কতটা ব্যবহার হবে, কত আয় করবে এবং পরিচালন ব্যয় কত হবে—এসব হিসাবও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের ব্যয় বেড়েছে বারবার
ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের বিমানবন্দর-ফার্মগেট অংশ চালু হলেও পুরো প্রকল্প এখনো শেষ হয়নি। ফলে এর আংশিক সুবিধা পাওয়া গেলেও পুরোপুরি যানজট কমানোর সুফল এখনো মিলছে না।
অন্যদিকে ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের কাজ গত দুই বছরে উল্লেখযোগ্যভাবে এগিয়েছে। ২০২৪ সালের জুনে প্রকল্পটির অগ্রগতি ছিল প্রায় ৪৯ দশমিক ৫ শতাংশ। ২০২৬ সালের জুনে তা বেড়ে হয়েছে ৮৯ দশমিক ৪ শতাংশ।
তবে প্রকল্পটির সংশোধিত ব্যয় প্রায় ১৭ হাজার ৫৫৩ কোটি টাকা। প্রকল্পটি শুরু হয়েছিল এক দশকেরও বেশি সময় আগে। এর মেয়াদ অন্তত ছয়বার বাড়ানো হয়েছে এবং ব্যয় সংশোধন করা হয়েছে সাতবার।
প্রশ্ন হচ্ছে, একটি প্রকল্প শেষ করতে এতবার সময় ও ব্যয় সংশোধনের প্রয়োজন কেন হলো? প্রকল্পের প্রাথমিক পরিকল্পনা কতটা বাস্তবসম্মত ছিল? আর সময় বাড়ার কারণে যে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় হয়েছে, তার দায় শেষ পর্যন্ত কে বহন করবে?
মাতারবাড়ী বিদ্যুৎকেন্দ্রেও অপেক্ষা
মাতারবাড়ীতে ২ হাজার ৬০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ প্রকল্পে গত দুই বছরে অগ্রগতি হয়েছে। ২০২৪ সালের জুনে প্রকল্পটির ভৌত অগ্রগতি ছিল ৭৫ দশমিক ২ শতাংশ। ২০২৬ সালের জুনে তা বেড়ে হয়েছে ৮৭ দশমিক ৪ শতাংশ।
প্রকল্পটির সংশোধিত ব্যয় প্রায় ৫৬ হাজার ৬৯৪ কোটি টাকা। মেয়াদ রয়েছে ২০২৬ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত।
অগ্রগতি বাড়লেও নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পুরো কাজ শেষ হবে কি না, তা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। অতীতের নানা জটিলতা ও প্রকল্প বাস্তবায়নের ধীরগতির কারণে সময়মতো কাজ শেষ করা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
গভীর সমুদ্রবন্দরের অগ্রগতি ধীর
মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর প্রকল্পের অগ্রগতি বিদ্যুৎ প্রকল্পটির তুলনায় অনেক ধীর।
২০২৪ সালের জুনে প্রকল্পটির অগ্রগতি ছিল মাত্র ৩ দশমিক ৩ শতাংশ। ২০২৬ সালের জুনে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৫ দশমিক ৫ শতাংশে।
প্রকল্পটির সংশোধিত ব্যয় প্রায় ২৪ হাজার ৩৮১ কোটি টাকা এবং শেষ করার সময়সীমা ২০২৯ সাল।
এ ধরনের দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্পের ক্ষেত্রে নির্মাণ ব্যয় ছাড়াও সময়ের সঙ্গে অর্থের মূল্য, ঋণের ব্যয় এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের পরিবর্তিত বাস্তবতা বিবেচনায় রাখা জরুরি।
উদ্বোধন হলেও পুরোপুরি প্রস্তুত নয় তৃতীয় টার্মিনাল
বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনালও মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নের আরেকটি বিতর্কিত দৃষ্টান্ত।
২০২৪ সালের নির্বাচনের সময় কাজ পুরোপুরি শেষ হওয়ার আগেই টার্মিনালটির উদ্বোধন করা হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে তখনও অনেক কাজ বাকি ছিল।
২০২৪ সালের জুনে প্রকল্পটির অগ্রগতি ছিল প্রায় ৪০ শতাংশ। ২০২৬ সালের জুনে তা বেড়ে হয়েছে ৬১ দশমিক ৫ শতাংশ।
এখন বড় প্রশ্ন শুধু নির্মাণকাজ শেষ করা নয়। টার্মিনাল পরিচালনা, রক্ষণাবেক্ষণ এবং পূর্ণ সক্ষমতায় ব্যবহার নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
একটি স্থাপনা উদ্বোধন করা এবং সেটিকে কার্যকরভাবে ব্যবহার করতে পারা—দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। তৃতীয় টার্মিনালের ক্ষেত্রে সেই পার্থক্যই এখন স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
উৎপাদনে এলেও রামপাল-পায়রায় জ্বালানি সংকট
রামপাল ও পায়রা বিদ্যুৎকেন্দ্র ইতোমধ্যে উৎপাদনে রয়েছে। কিন্তু এগুলোর ক্ষেত্রেও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ শেষ হয়নি।
কয়লা আমদানি, ডলার সংকট এবং অর্থায়নের সমস্যায় গত দুই-তিন বছরে বিভিন্ন সময় বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে।
এতে একটি বিষয় পরিষ্কার—বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করাই শেষ নয়। নিয়মিত জ্বালানি আমদানি, পরিচালন ব্যয়, বৈদেশিক মুদ্রার প্রয়োজন এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনের ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করাও প্রকল্পের সাফল্যের অংশ।
সামগ্রিক প্রকল্প ব্যবস্থাপনাও প্রশ্নের মুখে
মেগা প্রকল্পগুলোর সমস্যা আলাদা করে দেখলে পুরো চিত্র বোঝা যায় না। কারণ সরকারি প্রকল্প বাস্তবায়নের সামগ্রিক সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
সরকারি সংস্থা আইএমইডির হিসাবে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ১৫৯টি উন্নয়ন প্রকল্পে কোনো ভৌত অগ্রগতি হয়নি। আরও ১ হাজার ১১টি প্রকল্পে অগ্রগতি ছিল ২৫ শতাংশের নিচে।
এমন পরিস্থিতিতে বিপুল ব্যয়ের মেগা প্রকল্পগুলো সময়মতো এবং নির্ধারিত ব্যয়ের মধ্যে শেষ করার সক্ষমতা নিয়েও স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে।
সামনে দুটি কঠিন প্রশ্ন
বর্তমান সরকারের সামনে তাই মেগা প্রকল্প নিয়ে মূলত দুটি বড় প্রশ্ন।
প্রথমত, অসম্পূর্ণ প্রকল্পগুলো শেষ করতে আর কত অর্থ ও সময় প্রয়োজন হবে?
দ্বিতীয়ত, প্রকল্পগুলো শেষ হওয়ার পর সেগুলো থেকে বাস্তবে কতটা অর্থনৈতিক সুফল পাওয়া যাবে?
এই দুটি প্রশ্নের উত্তর শুধু প্রকল্পের নির্মাণ অগ্রগতি দিয়ে পাওয়া যাবে না। প্রতিটি প্রকল্পের আয়, ব্যবহার, পরিচালন ব্যয়, রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় এবং ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা হিসাব করতে হবে।
বিশেষ করে কর্ণফুলী টানেলের মতো কম ব্যবহৃত প্রকল্প এবং বিপুল বৈদেশিক ঋণনির্ভর প্রকল্পগুলোর ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ।
উন্নয়ন আর আর্থিক বোঝার মধ্যে ভারসাম্য জরুরি
বড় অবকাঠামো দেশের অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তন আনতে পারে। পদ্মা সেতু বা মেট্রোরেলের মতো প্রকল্প তার উদাহরণ। কিন্তু প্রতিটি বড় প্রকল্প একইভাবে সুফল দেবে—এমন নিশ্চয়তা নেই।
একটি প্রকল্পের আকার যত বড়, ভুল সিদ্ধান্তের আর্থিক ক্ষতিও তত বড় হতে পারে। অতিমূল্যায়ন, অপ্রয়োজনীয় ব্যয়, বারবার সময় বৃদ্ধি কিংবা প্রকল্পের ব্যবহার সম্পর্কে ভুল পূর্বাভাস—সবকিছুর বোঝা শেষ পর্যন্ত জনগণের অর্থের ওপরই পড়ে।
বাংলাদেশ এখন এমন এক সময়ে দাঁড়িয়ে আছে, যখন নতুন বিনিয়োগের পাশাপাশি পুরোনো প্রকল্পগুলোর অর্থনৈতিক ফলাফলও কঠোরভাবে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
কোন প্রকল্প শেষ করা জরুরি, কোনটির ব্যয় কমানো সম্ভব, কোন প্রকল্প থেকে দ্রুত আয় বাড়ানো যায় এবং কোন প্রকল্পের কাঠামো পুনর্বিবেচনা দরকার—এসব প্রশ্নের বাস্তবভিত্তিক উত্তর খুঁজতে হবে।
কারণ মেগা প্রকল্প শুধু সেতু, রেললাইন, বিদ্যুৎকেন্দ্র কিংবা টানেল নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে রাষ্ট্রের ঋণ, করদাতার অর্থ এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের আর্থিক দায়।
তাই এখন সবচেয়ে বড় প্রয়োজন আরও বড় প্রকল্প নেওয়া নয়; বরং নেওয়া প্রকল্পগুলোর প্রকৃত প্রয়োজন, ব্যয়, ব্যবহার এবং অর্থনৈতিক সুফল নিশ্চিত করা। বর্তমান সরকারের জন্য এটাই হতে পারে আগের সরকারের মেগা প্রকল্পের ভার সামলে অর্থনীতিকে এগিয়ে নেওয়ার সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা।

