বাংলাদেশের অর্থনীতিতে সেবা খাতের গুরুত্ব যত বাড়ছে, ততই বড় হচ্ছে আবাসন ও রিয়েল এস্টেট-সংশ্লিষ্ট কর্মকাণ্ডের পরিধি। সরকারি পরিসংখ্যানে অন্তত সেই চিত্রই পাওয়া যাচ্ছে। গত পাঁচ বছরে দেশের রিয়েল এস্টেট খাতের উৎপাদনের আর্থিক মূল্য উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। কিন্তু এই প্রবৃদ্ধির সঙ্গে খাতটির বাস্তব ব্যবসায়িক পরিস্থিতির যেন পুরোপুরি মিল নেই। উদ্যোক্তাদের ভাষ্য, করের চাপ, ঋণের উচ্চ ব্যয়, নীতিগত সীমাবদ্ধতা এবং দুর্বল বিনিয়োগ পরিবেশ আবাসন ব্যবসার স্বাভাবিক সম্প্রসারণকে বাধাগ্রস্ত করছে।
সরকারি চলতি মূল্যের মোট দেশজ উৎপাদনের হিসাবে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশে রিয়েল এস্টেট খাতের উৎপাদনের মূল্য দাঁড়িয়েছে ৪ লাখ ৭৭ হাজার কোটি টাকা। ২০২০-২১ অর্থবছরে এই পরিমাণ ছিল ৩ লাখ ১৩ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ পাঁচ বছরের ব্যবধানে খাতটির আর্থিক আকার বেড়েছে ৫২ দশমিক ৫ শতাংশ।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২১-২২ অর্থবছরে রিয়েল এস্টেট কর্মকাণ্ডের মূল্য বেড়ে দাঁড়ায় ৩ লাখ ৪০ হাজার কোটি টাকা। পরের অর্থবছরে তা আরও বেড়ে হয় ৩ লাখ ৭৩ হাজার কোটি টাকা। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে এই পরিমাণ ছিল ৪ লাখ ৯ হাজার কোটি টাকা এবং ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৪ লাখ ৪৫ হাজার কোটি টাকা। সর্বশেষ ২০২৫-২৬ অর্থবছরে খাতটির বার্ষিক প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৭ দশমিক ১৯ শতাংশ।
অর্থাৎ টানা পাঁচ বছরেই রিয়েল এস্টেট কর্মকাণ্ডের আর্থিক মূল্য বেড়েছে। প্রশ্ন হচ্ছে, এই প্রবৃদ্ধি কি আবাসন খাতের বাস্তব চিত্র তুলে ধরছে?
খাতসংশ্লিষ্টদের বক্তব্যে অবশ্য ভিন্ন চিত্র পাওয়া যায়।
পরিসংখ্যান বনাম মাঠের বাস্তবতা
বাংলাদেশের আবাসন খাত দীর্ঘদিন ধরেই নগরায়ণ, জনসংখ্যা বৃদ্ধি এবং নতুন আবাসনের চাহিদার ওপর নির্ভর করে এগিয়েছে। শহরাঞ্চলে মানুষের সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়ি, ফ্ল্যাট, জমি, ভাড়া এবং সংশ্লিষ্ট সেবার চাহিদাও তৈরি হয়েছে।
কিন্তু বর্তমানে বাজারের বাস্তব অবস্থা নিয়ে উদ্যোক্তাদের মধ্যে স্বস্তি নেই। রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সাবেক জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি লিয়াকত আলী ভূঁইয়ার মতে, খাতটি এখন ভালো সময় পার করছে না। বরং ব্যবসা সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে বড় ধরনের বাধার মুখে পড়েছেন উদ্যোক্তারা।
সরকারি প্রবৃদ্ধির হিসাব নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তিনি। তাঁর প্রশ্ন, এই পরিসংখ্যান কীভাবে তৈরি করা হচ্ছে এবং তা বর্তমান বাজার পরিস্থিতিকে কতটা সঠিকভাবে প্রতিফলিত করছে।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সামনে আসে। কোনো খাতের আর্থিক মূল্য বাড়লেই যে সেই খাতের উদ্যোক্তাদের ব্যবসা সমান হারে ভালো চলছে, এমনটা ধরে নেওয়া যায় না। পণ্যের দাম বৃদ্ধি, জমির মূল্য, নির্মাণ ব্যয় এবং অন্যান্য খরচ বাড়লেও মোট আর্থিক কর্মকাণ্ডের পরিমাণ বাড়তে পারে। কিন্তু একই সময়ে প্রকৃত বিনিয়োগ, নতুন প্রকল্প, বিক্রয় কিংবা উদ্যোক্তার মুনাফা কমে যেতে পারে।
রিয়েল এস্টেট খাতের বর্তমান পরিস্থিতি বিশ্লেষণে তাই শুধু উৎপাদনের আর্থিক মূল্য নয়, বিনিয়োগ, বিক্রয়, ঋণের সুদ, নির্মাণ ব্যয় এবং ক্রেতাদের সক্ষমতার দিকটিও বিবেচনায় নেওয়া জরুরি।
করের চাপ বড় বাধা
খাতসংশ্লিষ্টদের অভিযোগের অন্যতম প্রধান জায়গা কর। লিয়াকত আলী ভূঁইয়ার মতে, ১৫ শতাংশ আয়কর রিয়েল এস্টেট ব্যবসার জন্য বড় ধরনের চাপ তৈরি করছে। তাঁর ভাষ্য, এই করব্যবস্থা বিনিয়োগকে নিরুৎসাহিত করছে এবং ব্যবসায়ীদের সম্প্রসারণের সুযোগ কমিয়ে দিচ্ছে।
রিয়েল এস্টেট এমন একটি খাত, যেখানে প্রকল্প শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত দীর্ঘ সময় প্রয়োজন হয়। জমি কেনা, অনুমোদন, নকশা, নির্মাণ, বিপণন এবং বিক্রির পুরো প্রক্রিয়ায় বিপুল অর্থ আটকে থাকে। এর সঙ্গে যদি কর ও অন্যান্য ব্যয় যোগ হয়, তাহলে প্রকল্পের মোট ব্যয় আরও বেড়ে যায়।
ফলে নির্মাণ ব্যয় বাড়ার পাশাপাশি ক্রেতার ওপরও বাড়তি চাপ তৈরি হয়। একদিকে ক্রেতাদের ক্রয়ক্ষমতা সীমিত, অন্যদিকে ফ্ল্যাট বা জমির দাম তুলনামূলক বেশি। এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য না থাকলে বাজারে চাহিদা দুর্বল হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
ভবনের উচ্চতায় বিধিনিষেধ, বাড়ছে প্রকল্পের জটিলতা
আবাসন খাতের আরেকটি বড় সমস্যা হিসেবে উঠে এসেছে বিস্তারিত অঞ্চল পরিকল্পনা বা ড্যাপ। লিয়াকত আলী ভূঁইয়ার অভিযোগ, এই পরিকল্পনার বিভিন্ন বিধিনিষেধের কারণে অনেক এলাকায় ভবনের উচ্চতা বাড়ানোর সুযোগ সীমিত হয়ে গেছে।
এতে একই জমিতে বেশি আবাসিক ইউনিট তৈরির সম্ভাবনা কমে যায়। অথচ জমির দাম, নির্মাণসামগ্রীর মূল্য এবং অন্যান্য ব্যয় যখন বাড়ছে, তখন একটি প্রকল্পে পর্যাপ্ত সংখ্যক ইউনিট তৈরি করতে না পারলে সেটির আর্থিক হিসাবও কঠিন হয়ে পড়ে।
ফলে একটি প্রকল্পের সম্ভাব্যতা নির্ভর করছে শুধু জমি বা ভবনের ওপর নয়, বরং অনুমোদনযোগ্য ভবনের আয়তন, উচ্চতা এবং ব্যবহারযোগ্য জায়গার ওপরও।
খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, নগর পরিকল্পনার প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। তবে এমন নীতিও প্রয়োজন, যাতে পরিকল্পিত নগরায়ণের পাশাপাশি আবাসন খাতের অর্থনৈতিক বাস্তবতাও বিবেচনায় থাকে।
অর্থনীতির পরিবর্তনের সঙ্গেও জড়িয়ে আছে আবাসন
রিয়েল এস্টেটের এই প্রবৃদ্ধিকে দেশের অর্থনীতির বৃহত্তর পরিবর্তনের অংশ হিসেবেও দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। বাংলাদেশের অর্থনীতিতে সেবা খাতের অবদান ক্রমেই বাড়ছে। কর্মসংস্থান ও আয় সৃষ্টিতেও সেবা খাতের গুরুত্ব বাড়ছে।
রিয়েল এস্টেট শুধু ফ্ল্যাট বা ভবন নির্মাণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে জমি কেনাবেচা, ভাড়া, সম্পত্তি ব্যবস্থাপনা এবং ভবন ও ভূমির সঙ্গে সম্পর্কিত নানা ধরনের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড যুক্ত।
তাই এই খাতের আর্থিক কর্মকাণ্ড বাড়ার অর্থ হলো শহর ও জনপদে সম্পত্তিকে ঘিরে অর্থনৈতিক লেনদেনের পরিমাণও বাড়ছে।
তবে প্রবৃদ্ধির এই ধারা দীর্ঘমেয়াদে ধরে রাখতে হলে বিনিয়োগের পরিবেশ শক্তিশালী করা জরুরি।
নীতি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ড. মাসরুর রিয়াজের মতে, রিয়েল এস্টেট সেবা অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলেও এর প্রবৃদ্ধি অনেকটাই নির্ভর করে বিনিয়োগ, অর্থায়নের পরিস্থিতি এবং ব্যবসায়ীদের আস্থার ওপর।
চাহিদা আছে, কিন্তু ক্রেতার সামর্থ্য কতটা?
বাংলাদেশের নগরায়ণ ও জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে দীর্ঘমেয়াদে আবাসনের চাহিদা থাকার কথা। নতুন পরিবার, শহরে মানুষের স্থানান্তর এবং নগর সম্প্রসারণ—সব মিলিয়ে আবাসন খাতে কাঠামোগত চাহিদা তৈরি হচ্ছে।
কিন্তু চাহিদা থাকা আর সেই চাহিদা কার্যকর বাজারে পরিণত হওয়া এক বিষয় নয়।
একজন ক্রেতার একটি ফ্ল্যাটের প্রয়োজন থাকতে পারে, কিন্তু ঋণের সুদ বেশি হলে কিংবা মাসিক কিস্তি তাঁর সামর্থ্যের বাইরে চলে গেলে তিনি ফ্ল্যাট কিনতে পারবেন না। একইভাবে নির্মাণসামগ্রীর দাম ও জমির মূল্য বাড়লে আবাসন ব্যবসায়ীরাও কম দামে পণ্য দিতে পারবেন না।
এ কারণেই রিয়েল এস্টেট খাতের ভবিষ্যৎ শুধু চাহিদার ওপর নির্ভর করছে না; ক্রেতার ক্রয়ক্ষমতা এবং অর্থায়নের সুযোগও এখানে গুরুত্বপূর্ণ।
মাসরুর রিয়াজের মতে, উচ্চ অর্থায়ন ব্যয়, নীতিগত বাধা এবং মানুষের দুর্বল ক্রয়ক্ষমতা খাতটির সম্প্রসারণের গতি কমিয়ে দিতে পারে। টেকসই প্রবৃদ্ধির জন্য সাশ্রয়ী অর্থায়ন, উন্নত বিনিয়োগ পরিবেশ এবং প্রয়োজনীয় নীতিগত সংস্কার দরকার।
জমি ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা জরুরি
রিয়েল এস্টেট ব্যবসার সঙ্গে জমি সরাসরি যুক্ত। ফলে জমির মালিকানা, নিবন্ধন, মূল্য, ব্যবহার এবং অনুমোদনসংক্রান্ত জটিলতা এই খাতের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জমি ব্যবস্থাপনা আরও সহজ, স্বচ্ছ ও আধুনিক করা গেলে লেনদেনের খরচ কমানো সম্ভব। একই সঙ্গে অনুমোদন ও নিবন্ধন প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা বাড়ানো গেলে উদ্যোক্তা ও ক্রেতা—দুই পক্ষের আস্থাও বাড়বে।
বর্তমানে একটি আবাসন প্রকল্প বাস্তবায়নে দীর্ঘ সময় এবং নানা ধরনের অনুমোদনের প্রয়োজন হয়। কোনো একটি ধাপে বিলম্ব হলে পুরো প্রকল্পের সময়সূচি পিছিয়ে যেতে পারে। এতে অর্থের খরচ বাড়ে এবং বিনিয়োগের ওপর চাপ তৈরি হয়।
এখন কী করা দরকার?
রিয়েল এস্টেট খাতের সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এখন প্রবৃদ্ধি হচ্ছে কি না, তা নয়। বরং প্রশ্ন হলো—এই প্রবৃদ্ধি কতটা টেকসই এবং তা বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে কতটা কার্যকর ভূমিকা রাখছে।
সরকারি হিসাবে ২০২০-২১ অর্থবছরের ৩ লাখ ১৩ হাজার কোটি টাকা থেকে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে খাতটির আর্থিক মূল্য ৪ লাখ ৭৭ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছেছে। এই বৃদ্ধি নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু একই সময়ে উদ্যোক্তারা যদি উচ্চ কর, অর্থায়নের ব্যয়, নীতিগত বিধিনিষেধ এবং দুর্বল ক্রয়ক্ষমতার কারণে নতুন প্রকল্প নিতে না পারেন, তাহলে শুধু আর্থিক প্রবৃদ্ধির পরিসংখ্যান দিয়ে খাতটির স্বাস্থ্য বিচার করা কঠিন।
এ কারণে নীতিনির্ধারকদের সামনে কয়েকটি বিষয় গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা প্রয়োজন। করের চাপ যৌক্তিক পর্যায়ে রাখা, নগর পরিকল্পনার সঙ্গে আবাসন ব্যবসার বাস্তবতা সমন্বয় করা, সাশ্রয়ী অর্থায়নের সুযোগ তৈরি করা এবং জমি ও সম্পত্তি ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা বাড়ানো—এসব পদক্ষেপ খাতটির দীর্ঘমেয়াদি সক্ষমতা বাড়াতে পারে।
রিয়েল এস্টেটের সঙ্গে নির্মাণ, সিমেন্ট, ইস্পাত, টাইলস, আসবাব, পরিবহনসহ অসংখ্য শিল্প ও সেবার সম্পর্ক রয়েছে। ফলে আবাসন খাতে বিনিয়োগ কমে গেলে এর প্রভাব শুধু ভবন নির্মাণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না; অর্থনীতির আরও বহু খাতে তার প্রতিফলন দেখা দিতে পারে।
সব মিলিয়ে সরকারি পরিসংখ্যানে বাংলাদেশের রিয়েল এস্টেট খাতের প্রবৃদ্ধির চিত্র আশাব্যঞ্জক। কিন্তু মাঠের বাস্তবতা বলছে, এই খাত এখনও নানা বাধার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। তাই এখন প্রয়োজন শুধু প্রবৃদ্ধির হিসাব প্রকাশ নয়—বরং এমন নীতি তৈরি করা, যাতে সেই প্রবৃদ্ধি বাস্তব বিনিয়োগ, নতুন প্রকল্প, কর্মসংস্থান এবং সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে আবাসনে রূপ নেয়।

