বাংলাদেশের আয়কর ব্যবস্থায় ব্যক্তির আয়কে প্রধানত সাতটি খাতে ভাগ করা হয়েছে। এসব খাতের কোনো একটি থেকে আয় থাকলেই যে সবাইকে আয়কর দিতে হবে, এমন নয়। তবে নির্দিষ্ট আইনি শর্ত পূরণ হলে ওই আয় কর রিটার্নে দেখানো বাধ্যতামূলক হতে পারে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের হিসাব অনুযায়ী, আয়ের সাতটি প্রধান খাত হলো চাকরি, বাড়িভাড়া, কৃষি, ব্যবসা, মূলধনি মুনাফা, আর্থিক সম্পদ এবং অন্যান্য উৎস।
১. চাকরি থেকে আয়
চাকরি বা নিয়োগের মাধ্যমে পাওয়া বেতন, ভাতা, বোনাস এবং অন্যান্য আর্থিক সুবিধা এই খাতের অন্তর্ভুক্ত। অর্থাৎ কোনো প্রতিষ্ঠানে চাকরি করে পাওয়া নিয়মিত ও অতিরিক্ত আয় এ শ্রেণিতে বিবেচিত হয়।
২. বাড়িভাড়া থেকে আয়
বাড়ি, ফ্ল্যাট, দোকান বা অন্য কোনো সম্পত্তি ভাড়া দিয়ে যে অর্থ পাওয়া যায়, তা বাড়িভাড়া থেকে আয় হিসেবে গণ্য হয়। সম্পত্তির ধরন অনুযায়ী প্রযোজ্য বিধি মেনে এ আয় রিটার্নে উল্লেখ করতে হতে পারে।
৩. কৃষি থেকে আয়
কৃষিকাজ, ফসল উৎপাদন এবং কৃষির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন কার্যক্রম থেকে পাওয়া আয় এই খাতের আওতায় পড়ে। কৃষির মাধ্যমে আয় করা ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নিয়ম অনুযায়ী এ আয় হিসাব করতে হয়।
৪. ব্যবসা থেকে আয়
ব্যবসা, পেশাগত কার্যক্রম কিংবা বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ড থেকে অর্জিত অর্থ এই শ্রেণিতে পড়ে। ছোট ব্যবসা থেকে শুরু করে বড় বাণিজ্যিক কার্যক্রম—সব ক্ষেত্রেই সংশ্লিষ্ট আয় নির্ধারিত নিয়মে বিবেচনা করা হয়।
৫. মূলধনি মুনাফা
কোনো সম্পদ বা বিনিয়োগ বিক্রি করে লাভ হলে নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে সেটি মূলধনি মুনাফা হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। তবে সম্পদ বা লেনদেনের ধরন অনুযায়ী এর ওপর প্রযোজ্য নিয়ম ভিন্ন হতে পারে।
৬. আর্থিক সম্পদ থেকে আয়
ব্যাংকে রাখা অর্থের সুদ বা মুনাফা, লভ্যাংশ, সঞ্চয়পত্র এবং বিভিন্ন আর্থিক বিনিয়োগ থেকে পাওয়া আয় এই খাতের অন্তর্ভুক্ত। এ ধরনের আয়ও নির্ধারিত বিধি অনুযায়ী রিটার্নে দেখাতে হতে পারে।
৭. অন্যান্য উৎস থেকে আয়
উপরের খাতগুলোর বাইরে বিভিন্ন ধরনের আয় এই শ্রেণিতে পড়তে পারে। এর মধ্যে রয়্যালটি, লাইসেন্স ফি, সম্মানী এবং নির্দিষ্ট অন্যান্য ফি থেকে পাওয়া অর্থ রয়েছে।
আয় থাকলেই কি কর দিতে হবে?
সাতটি খাতের কোনো একটি থেকে আয় থাকলেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে আয়কর দিতে হবে—বিষয়টি এমন নয়। কর দেওয়ার দায় এবং কর রিটার্ন জমা দেওয়ার বাধ্যবাধকতা দুটি আলাদা বিষয়।
আয়কর আইন, ২০২৩ অনুযায়ী, নির্ধারিত করমুক্ত সীমার বেশি মোট আয় হলে কিংবা আইনে উল্লেখ করা অন্য কোনো শর্ত পূরণ হলে রিটার্ন জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক হতে পারে। ফলে কোনো ব্যক্তির শেষ পর্যন্ত কর দিতে না হলেও নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে তাকে রিটার্ন জমা দিতে হতে পারে।
২০২৬-২৭ ও ২০২৭-২৮ করবর্ষে সাধারণ করদাতার করমুক্ত আয়সীমা ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা। নারী করদাতা এবং ৬৫ বছর বা তার বেশি বয়সী করদাতার ক্ষেত্রে এই সীমা ৪ লাখ ২৫ হাজার টাকা।
প্রতিবন্ধী করদাতা এবং তৃতীয় লিঙ্গের করদাতাদের করমুক্ত আয়সীমা ৫ লাখ টাকা। গেজেটভুক্ত যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা এবং আহত জুলাই যোদ্ধাদের ক্ষেত্রে এই সীমা ৫ লাখ ২৫ হাজার টাকা।
এ ছাড়া প্রতিবন্ধী সন্তান বা নির্ভরশীল ব্যক্তির ক্ষেত্রে বাবা-মা বা আইনগত অভিভাবকের করমুক্ত আয়সীমা প্রতি সন্তান বা নির্ভরশীল ব্যক্তির জন্য ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত বাড়ানোর বিধান রয়েছে, প্রযোজ্য শর্ত সাপেক্ষে।
২০২৬-২৭ করবর্ষের জন্য ব্যক্তিশ্রেণির করদাতাদের ই-রিটার্ন সেবাও চালু করেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড।
তাই শুধু কত টাকা কর দিতে হবে সেটিই নয়, নিজের আয় কোন খাতে পড়ছে এবং আইন অনুযায়ী রিটার্ন জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক কি না—এ বিষয়টিও করদাতাদের গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন।

