আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির বড় ধাক্কা লেগেছে বাংলাদেশের আমদানি ব্যয়ে। গত অর্থবছর দেশে পেট্রোলিয়াম পণ্য আমদানিতে ব্যয় হয়েছে প্রায় ১ হাজার ৬৪ কোটি ডলার। এর আগের অর্থবছর, অর্থাৎ ২০২৪-২৫ সালে এই ব্যয় ছিল ৫১৪ কোটি ডলারেরও কম। ফলে মাত্র এক বছরের ব্যবধানে জ্বালানি তেল আমদানির খরচ বেড়েছে ৫৫০ কোটি ডলার বা ১০৭ শতাংশ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব বলছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশের মোট আমদানি ব্যয় দাঁড়িয়েছে ৭ হাজার ৫২৪ কোটি ডলার। আগের অর্থবছরে যা ছিল ৬ হাজার ৮৩৫ কোটি ডলার। অর্থাৎ সামগ্রিক আমদানি ব্যয় বেড়েছে ৬৮৯ কোটি ডলার বা ১০ দশমিক ০৭ শতাংশ।
এই বাড়তি ব্যয়ের সবচেয়ে বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে জ্বালানি তেল। শুধু পেট্রোলিয়াম পণ্য আমদানিতেই এক বছরে অতিরিক্ত ৫৫০ কোটি ডলার ব্যয় হয়েছে।গত অর্থবছর পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানিতে বাংলাদেশের ব্যয় হয়েছে ৯৪৪ কোটি ডলার। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এ খাতে ব্যয় ছিল ৪৫১ কোটি ডলার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে খরচ বেড়েছে ১০৯ শতাংশের বেশি।
অপরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানির ক্ষেত্রেও ব্যয় বেড়েছে উল্লেখযোগ্যভাবে। এ খাতে খরচ ৯২ শতাংশ বেড়ে ১২০ কোটি ডলারে পৌঁছেছে। আগের অর্থবছরে ব্যয় ছিল মাত্র ৬২ কোটি ডলার।সব মিলিয়ে গত অর্থবছরে জ্বালানি তেল আমদানিতে যে পরিমাণ অর্থ ব্যয় হয়েছে, তা এ পর্যন্ত সর্বোচ্চ।
এর আগে করোনা মহামারি এবং রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে ২০২১-২২ অর্থবছরে এই খাতে সর্বোচ্চ ৭৯৯ কোটি ডলার ব্যয় হয়েছিল। পরের অর্থবছরে তা কমে ৫৭৭ কোটি ডলারে নেমে আসে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে আবার ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় ৬১৩ কোটি ডলার।জ্বালানি তেলের বাজারে অস্থিরতা আরও তীব্র হওয়ায় পরিস্থিতি সামনের দিকে আরও কঠিন হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, গত ফেব্রুয়ারিতে ইরানে হামলা শুরুর পর মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে তৈরি হওয়া অস্থিরতার প্রভাব পড়েছে জ্বালানি বাজারে। সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং বাড়তি চাহিদার কারণে আমদানি ব্যয়ও দ্রুত বেড়েছে।
এরই মধ্যে গত জুন মাসে বাংলাদেশকে জ্বালানি তেল আমদানিতে ১৬০ কোটি ৩৩ লাখ ডলার খরচ করতে হয়েছে। অথচ পুরো ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রতি মাসে গড়ে এ খাতে ব্যয় হয়েছে ৮৮ কোটি ৬২ লাখ ডলার।
অর্থাৎ জুনের এক মাসের ব্যয়ই ছিল বার্ষিক গড়ের তুলনায় অনেক বেশি।
এত বিপুল অর্থ ব্যয় করেও জ্বালানির চাহিদা পুরোপুরি মেটাতে হিমশিম খাচ্ছে সরকার। বাড়তি জ্বালানি ব্যয়ের প্রভাব শিল্প খাতেও পড়ছে। অনেক কারখানায় উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে, কোথাও কোথাও উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। এর প্রভাব সামগ্রিক মূল্যস্তরেও পড়ছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
জ্বালানি তেল আমদানিতে যখন ব্যয় দ্রুত বাড়ছে, তখন কয়েকটি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের আমদানি ব্যয় কমেছে।
২০২৫-২৬ অর্থবছরে তেল, চিনি, ডাল, মসলা, দুধ ও ক্রিমসহ বিভিন্ন ভোগ্যপণ্য আমদানিতে ব্যয় হয়েছে ৫০৩ কোটি ডলার। আগের অর্থবছরে এ ব্যয় ছিল ৫৬৮ কোটি ডলার। অর্থাৎ এক বছরে ব্যয় কমেছে প্রায় ৩৫ কোটি ডলার বা ১১ দশমিক ৪০ শতাংশ।
চাল আমদানিতেও ব্যয় কমেছে সাড়ে ২২ শতাংশ। গত অর্থবছরে চাল আমদানিতে খরচ হয়েছে ৫৩ কোটি ডলারের কম, যেখানে আগের অর্থবছরে এ ব্যয় ছিল ৬৮ কোটি ডলারের বেশি।
তবে গমের ক্ষেত্রে চিত্র ভিন্ন। গম আমদানিতে ব্যয় ২৬ দশমিক ১০ শতাংশ বেড়ে ২০৫ কোটি ডলারে উঠেছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এ খাতে ব্যয় ছিল ১৬২ কোটি ডলার।
বাংলাদেশ ব্যাংকের এক কর্মকর্তা জানান, দীর্ঘদিন ধরে ডলারের বিনিময় হার ১২২ থেকে ১২৪ টাকার মধ্যে রয়েছে। পাশাপাশি ডলারের জোগান নিয়েও বর্তমানে বড় ধরনের সংকট নেই। উচ্চ রেমিট্যান্স প্রবাহ এর অন্যতম কারণ।
তবে আন্তর্জাতিক বাজারে পরিস্থিতি আরও খারাপ হলে আমদানি ব্যয় বাড়তে পারে। সে ক্ষেত্রে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে যে স্বস্তি তৈরি হয়েছে, তা ধরে রাখা কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
গত সোমবার দেশের মোট বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ দাঁড়িয়েছে ৩৭ দশমিক ২৪ বিলিয়ন ডলারে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের হিসাব পদ্ধতি বিপিএম৬ অনুযায়ী রিজার্ভ ৩২ দশমিক ৪৪ বিলিয়ন ডলার।
আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের সময় রিজার্ভ নেমে এসেছিল ২০ দশমিক ৪৮ বিলিয়ন ডলারে। এর আগে ২০২১ সালের আগস্টে দেশের রিজার্ভ সর্বোচ্চ ৪৮ বিলিয়ন ডলারের বেশি হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে অর্থ পাচারসহ বিভিন্ন কারণে তা কমে যায়।
গত অর্থবছরে তৈরি পোশাক খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট পণ্যের আমদানি ৪ শতাংশ কমে ১ হাজার ৭৭০ কোটি ডলারে নেমেছে।তবে অন্যান্য মধ্যবর্তী পণ্যের আমদানি প্রায় ৯ শতাংশ বেড়ে ১ হাজার ৯৩৫ কোটি ডলারে পৌঁছেছে।
মূলধনি পণ্যের আমদানিও বেড়েছে ৭ শতাংশের বেশি। গত অর্থবছরে এ খাতে আমদানি ব্যয় হয়েছে ১ হাজার ২৩ কোটি ডলার।এ ছাড়া অন্যান্য পণ্য আমদানিতে ব্যয় ৩ শতাংশের বেশি বেড়ে ৯৭১ কোটি ডলারে দাঁড়িয়েছে।
ব্যাংকারদের মতে, দেশের বিনিয়োগ পরিস্থিতি এখনও প্রত্যাশিত পর্যায়ে ফেরেনি। গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকট, উচ্চ সুদের হার এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিসহ নানা কারণে ব্যবসায়ীরা নতুন বিনিয়োগে সতর্ক অবস্থানে রয়েছেন।
এর প্রভাব পড়েছে বেসরকারি খাতের ঋণেও। বর্তমানে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি ৪ দশমিক ৪৭ শতাংশে নেমে এসেছে, যা এ পর্যন্ত সর্বনিম্ন।
বিনিয়োগের চাহিদা কম থাকা এবং অর্থ পাচারের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপের কারণে বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে বর্তমানে কিছুটা স্বস্তি রয়েছে। তবে এই পরিস্থিতি দীর্ঘমেয়াদে ধরে রাখতে শুধু রেমিট্যান্সের ওপর নির্ভর করলে হবে না।
রপ্তানি আয় বাড়ানোর পাশাপাশি বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নত করার ওপর জোর দিতে হবে। কারণ দীর্ঘমেয়াদে কর্মসংস্থান বাড়াতে হলে নতুন বিনিয়োগের বিকল্প নেই।
একই সঙ্গে অতীতের মতো অর্থ পাচার যাতে আবার বাড়তে না পারে, সে বিষয়ে কঠোর নজরদারি বজায় রাখাও জরুরি।
সব মিলিয়ে, জ্বালানি তেলের আমদানি ব্যয় এক বছরে ১০৭ শতাংশ বেড়ে যাওয়া বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য নতুন চাপ তৈরি করেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতা দীর্ঘস্থায়ী হলে এই চাপ আরও বাড়তে পারে। তাই একদিকে জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা, অন্যদিকে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর বাড়তি চাপ সামলানো—দুই দিকেই এখন সরকারকে সতর্ক থাকতে হবে।

