বাংলাদেশে হীরার বৈধ আমদানি প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে ২০১৮ সালেই। অথচ দেশের হীরার গয়নার বাজার এখন বছরে ১১ হাজার কোটি টাকার বেশি বলে ব্যবসায়ীদের দাবি। ফলে বড় প্রশ্ন উঠেছে—আইনগতভাবে হীরা না ঢুকলেও এত বড় বাজারে পাথর আসছে কোথা থেকে?
তদন্ত ও বিভিন্ন সংস্থার তথ্য বলছে, এই বাজারের বড় একটি অংশ নির্ভর করছে চোরাচালানের ওপর। পাশাপাশি পরীক্ষাগারে তৈরি হীরা, মোইসানাইট ও জিরকনের মতো কৃত্রিম পাথরও কোথাও কোথাও প্রাকৃতিক হীরা হিসেবে বিক্রি হওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
ঢাকার শ্যামলী স্কয়ার শপিং মলের একটি গয়নার দোকান সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মাত্র ৪,৯৯৯ টাকায় হীরার নাকফুল বিক্রির বিজ্ঞাপন দেয়। একজন ক্রেতা সেটি আসল হীরা কি না জানতে চাইলে দোকানটি দাবি করে, তাদের হীরা শতভাগ প্রাকৃতিক এবং দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে বৈধভাবে সংগ্রহ করা।
কিন্তু এমন দাবির সঙ্গে দেশের বৈধ আমদানির হিসাবের বড় অমিল রয়েছে।
একসময় ছিল রপ্তানির সম্ভাবনা
বাংলাদেশের হীরা ব্যবসা একসময় রপ্তানিমুখী হওয়ার সম্ভাবনা দেখিয়েছিল। ২০০৭ সালে সাভারের ব্রিলিয়ান্ট ডায়মন্ডস লিমিটেড প্রথমবারের মতো বেলজিয়ামে পালিশ করা হীরা রপ্তানি করে। পরে রেনেসাঁ জুয়েলারি ও ডায়মন্ড ওয়ার্ল্ডও এ ব্যবসায় যুক্ত হয়।
২০০৭ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ প্রায় ৩ কোটি ৯৬ লাখ ডলারের হীরা রপ্তানি করে। সে সময় প্রায় প্রতি সপ্তাহেই হীরার চালান দেশের বাইরে যেত।
আমদানিও তখন সক্রিয় ছিল। ২০০৩ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ ৯৩ লাখ ৫০ হাজার ডলারের হীরা ও হীরার গয়না আমদানি করে। এর মধ্যে ভারতের অংশ ছিল ৮৭ শতাংশ।
২০১৮ সালে ডায়মন্ড ওয়ার্ল্ডসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান প্রায় ১ লাখ ৪০ হাজার ডলারের হীরা আমদানি করেছিল। এরপর থেকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বৈধ আমদানির আর কোনো তথ্য নেই।
গত আট বছরে বৈধভাবে আমদানি করা হীরার মূল্য ১০ লাখ টাকারও কম, যার বড় অংশই শিল্পকারখানার কাজে ব্যবহারের জন্য এসেছে।
অন্যদিকে বাজারের আকার কমেনি। বরং ২০১৯ সালের পর থেকে দেশে হীরা বিক্রির দোকান বেড়েছে। ব্যবসায়ীদের হিসাবে, বছরে প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকার বাজার কয়েক বছরের মধ্যে ১১ হাজার কোটি টাকার বেশি হয়েছে।
চোরাচালানই কি বড় উৎস?
বাংলাদেশে বিমানপথে যাত্রীর সঙ্গে হীরা আনার সুযোগ নেই। এর সঙ্গে রয়েছে উচ্চ শুল্ক। বন্ড সুবিধা ছাড়া অপরিশোধিত হীরায় প্রায় ৮৯ শতাংশ এবং পালিশ করা হীরায় প্রায় ১৫১ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক দিতে হয়।
ব্যবসায়ীদের একাংশের মতে, এই উচ্চ শুল্কই অবৈধ আমদানিকে উৎসাহিত করছে।
বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশনের হিসাবে, প্রতিদিন প্রায় ৩০ কোটি টাকার হীরা ও হীরার গয়না অবৈধভাবে দেশে ঢোকে। অর্থাৎ বছরে এর পরিমাণ প্রায় ১০ হাজার ৯৫০ কোটি টাকা।
ব্যবসায়ীদের ভাষ্য অনুযায়ী, ভারতের সুরাট—বিশ্বের অন্যতম বড় হীরা কাটা ও পালিশের কেন্দ্র—বাংলাদেশে চোরাই হীরা আসার অন্যতম উৎস। সীমান্ত এলাকায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিভিন্ন অভিযানে উদ্ধার হওয়া হীরাও অবৈধ বাণিজ্যের ব্যাপকতার ইঙ্গিত দেয়।
গত ২ এপ্রিল যশোরে এক ভারতীয় নাগরিকের কাছ থেকে ১৫৫ দশমিক ৭৬ গ্রাম হীরা এবং প্রায় ৬ কোটি ৬২ লাখ টাকার বৈদেশিক মুদ্রা উদ্ধার করে বিজিবি।
এর আগে ২০২৫ সালের ৩০ জানুয়ারি যশোরের পাঁচভুলোট সীমান্ত এলাকায় প্রায় ১০ কোটি টাকা মূল্যের হীরার গয়নাসহ এক সন্দেহভাজন চোরাকারবারিকে আটক করা হয়।
২০২১ সালে সাতক্ষীরায় প্রায় ২ কোটি টাকা মূল্যের ১৪৪টি হীরার গয়না উদ্ধার করেছিল কর্তৃপক্ষ। বিভিন্ন সময় বিজিবির আরও কয়েকটি অভিযানে হীরা উদ্ধারের ঘটনাও ঘটেছে।
আসল হীরার সঙ্গে নকলেরও দাপট
শুধু চোরাই আসল হীরাই নয়, বাজারে নকল ও পরীক্ষাগারে তৈরি হীরার উপস্থিতিও উদ্বেগ বাড়াচ্ছে।
মোইসানাইট ও জিরকনের মতো দেখতে পাথর এবং পরীক্ষাগারে তৈরি হীরা অনেক সময় প্রাকৃতিক হীরা হিসেবে বিক্রি হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
বাংলাদেশে এক ক্যারেট বা শূন্য দশমিক ২ গ্রাম প্রাকৃতিক হীরার দাম ৮৩ হাজার টাকারও বেশি হতে পারে। তাই ৫ হাজার টাকা বা তার কম দামে হীরার নাকফুল বিক্রির বিজ্ঞাপন স্বাভাবিকভাবেই পণ্যের সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করে।
২০২২ সালে লন্ডন ও নিউইয়র্কভিত্তিক আন্তর্জাতিক রত্ন পরীক্ষাগার সলিটেয়ার জেমোলজিক্যাল ল্যাবরেটরিজ বাংলাদেশে কার্যক্রম শুরু করে। ঢাকার বাংলামোটরে তাদের পরীক্ষাগারে হীরা পরীক্ষা করে সনদ দেওয়া হয়। আসল পাথরের ক্ষেত্রে সনদ নম্বরও খোদাই করা থাকে।সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দাবি, পরীক্ষায় বাজারে থাকা আসল ও নকল—দুই ধরনের পাথরই শনাক্ত হয়েছে।
ডায়মন্ড ওয়ার্ল্ডকে ঘিরে অভিযোগ
দেশের বড় হীরা ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান ডায়মন্ড ওয়ার্ল্ড এবং এর মালিক দিলীপ কুমার আগরওয়ালাকে ঘিরেও নানা অভিযোগ রয়েছে।
দেশজুড়ে প্রতিষ্ঠানটির বহু শোরুম রয়েছে এবং প্রতিদিন কোটি কোটি টাকার লেনদেন হয় বলে জানা যায়। তবে নথিপত্রে প্রতিষ্ঠানটির বৈধ হীরা আমদানির পরিমাণের সঙ্গে বাজারে তাদের ব্যবসার বড় পার্থক্য দেখা যায়।
২০২৫ সালের নভেম্বর মাসে অপরাধ তদন্ত বিভাগ আগরওয়ালার বিরুদ্ধে ৬৭৮ কোটি টাকার অর্থপাচারের মামলা করে। মামলায় চোরাই সোনা ও হীরা কেনা এবং সেখান থেকে অবৈধভাবে অর্জিত অর্থ পাচারের অভিযোগ আনা হয়।
মামলার নথি অনুযায়ী, ২০০৬ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটি ঋণপত্রের মাধ্যমে বৈধভাবে মাত্র ৩৮ কোটি ৪৭ লাখ টাকার পণ্য আমদানি করে। একই সময়ে স্থানীয় বাজার থেকে ৬৭৮ কোটি টাকার সোনা ও হীরা কেনার বৈধ নথি নিয়েও তদন্তকারীরা প্রশ্ন তোলেন।
অবৈধ সম্পদ, সন্দেহজনক লেনদেন ও মূল্য সংযোজন কর ফাঁকির অভিযোগেও আগরওয়ালা ও তাঁর স্ত্রীর বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে।
হীরা ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে মোইসানাইট বা জিরকনকে আসল হীরা হিসেবে বাজারজাত করার অভিযোগও দীর্ঘদিনের।
সম্প্রতি একটি পৃথক মামলায় একটি প্রতিষ্ঠানের দুই নারী কর্মীকে হীরা ও সোনার গয়না চুরি ও আত্মসাতের অভিযোগে পাঁচ দিনের রিমান্ডে নেওয়া হয়। মামলার অভিযোগ অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ২৭ এপ্রিল থেকে ২০২৬ সালের ৮ জুলাই পর্যন্ত তারা সহযোগীদের নিয়ে আসল গয়নার পরিবর্তে নকল গয়না বসিয়ে আসল গয়না সরিয়ে নেন।
শিল্প হিসেবে সম্ভাবনা এখনও আছে
বাংলাদেশে হীরার বৈধ বাণিজ্য সংকুচিত হলেও এই খাতের সম্ভাবনা পুরোপুরি শেষ হয়ে যায়নি।
২০২২ সালে মালাবার গোল্ড অ্যান্ড ডায়মন্ডস ও নিতল-নিলয় গ্রুপ নারায়ণগঞ্জের মদনপুরে সোনা ও হীরার গয়না তৈরির একটি কারখানা স্থাপনের উদ্যোগ নেয়। লক্ষ্য ছিল দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারের জন্য গয়না উৎপাদন।
বাংলাদেশে এখনও অল্প কয়েকটি হীরা কাটা ও পালিশের কারখানা রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, নীতিগত সহায়তা পেলে দেশটি রপ্তানিমুখী হীরা শিল্প গড়ে তুলতে পারে।
বিশ্বে পালিশ করা হীরা রপ্তানির বাজার প্রায় ১০ বিলিয়ন ডলারের। এ বাজারে ভারতের বড় অংশীদারত্ব রয়েছে।
বাংলাদেশের দক্ষ গয়না কারিগর রয়েছে। সরকারও সোনা আমদানির ক্ষেত্রে কিছু বাধা কমিয়েছে। ব্যবসায়ীদের মতে, অপরিশোধিত হীরায় শুল্ক কমানো, বন্ড সুবিধা সহজ করা এবং রপ্তানিতে প্রণোদনা বাড়ানো গেলে এই খাত আবার ঘুরে দাঁড়াতে পারে।
জব্দ হীরা নিয়ে নতুন নিয়ম
সম্প্রতি জব্দ ও চোরাচালানের পণ্য নিষ্পত্তির প্রক্রিয়া আরও স্বচ্ছ করতে নতুন স্থায়ী আদেশ জারি করেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড।
১৭ আগস্ট জারি করা ‘চোরাচালানের অভিযোগে অনিষ্পন্ন, জব্দ ও বাজেয়াপ্ত পণ্য নিষ্পত্তি পদ্ধতি, ২০২৬’ শীর্ষক আদেশে সোনা, রুপা, প্লাটিনাম, হীরা, গয়না ও বৈদেশিক মুদ্রার জন্য বিশেষ বিধান রাখা হয়েছে।
নতুন নিয়ম অনুযায়ী, স্বীকৃত পরীক্ষাগারকে এসব মূল্যবান পণ্যের সত্যতা পরীক্ষা করে সনদ দিতে হবে। সনদ পাওয়া সম্ভব না হলে সাময়িকভাবে পণ্য বাংলাদেশ ব্যাংকে জমা রাখতে হবে।
গুদামে পণ্য পৌঁছানোর পর পুলিশি পাহারায় দ্রুত নিকটস্থ বাংলাদেশ ব্যাংক বা সরকারি কোষাগার ব্যাংকে পাঠানোর বিধানও রাখা হয়েছে। বিচারিক প্রক্রিয়া দুই মাসের মধ্যে শেষ না হলে সংশ্লিষ্ট পণ্য বাংলাদেশ ব্যাংকে জমা দিতে হবে।
কর্তৃপক্ষের আশা, নতুন ব্যবস্থায় জব্দ হীরা ও অন্যান্য মূল্যবান পাথরের তদারকি এবং নিষ্পত্তি প্রক্রিয়া আরও স্বচ্ছ হবে।
বৈধ আমদানি বাড়ানোর দাবি
বাংলাদেশ জুয়েলারি প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির সভাপতি এবং বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশনের মুখপাত্র আনোয়ার হোসেন বলেন, বৈধ আমদানি না থাকা সত্ত্বেও বাজারে বিপুল পরিমাণ হীরা পাওয়া যাওয়াই বড় উদ্বেগের বিষয়।
তাঁর অভিযোগ, কিছু অসাধু ব্যবসায়ী অবৈধ বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িত। তিনি এ বিষয়ে নজরদারি বাড়ানোর পাশাপাশি দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানান।
আনোয়ার হোসেনের মতে, ২০১৮ সালের পর উল্লেখযোগ্য বৈধ আমদানি না হলেও বাজারে হীরার গয়না পাওয়া যাচ্ছে। তাঁর ভাষায়, এর অর্থ হলো হীরা অবৈধ পথেই দেশে প্রবেশ করছে।
তিনি বলেন, চোরাই পণ্যের প্রবেশ বন্ধ করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। একই সঙ্গে নকল বা পরীক্ষাগারে তৈরি হীরাকে প্রাকৃতিক হীরা হিসেবে বিক্রি করাও বন্ধ করতে হবে।
তিনি ক্রেতাদের হীরা কেনার আগে বৈধ সনদ যাচাই করার পরামর্শ দেন। পাশাপাশি ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নিয়মিত বাজার তদারকির আহ্বান জানান।
সব মিলিয়ে বাংলাদেশের হীরার বাজার এখন একটি বড় প্রশ্নের সামনে দাঁড়িয়ে। ২০১৮ সালের পর বৈধ আমদানি প্রায় বন্ধ, অথচ বাজারের আকার ১১ হাজার কোটি টাকার বেশি। তাহলে এই বিপুল হীরা আসছে কোথা থেকে?
ব্যবসায়ীদের একাংশের মতে, এর পেছনে রয়েছে চোরাচালান ও কর ফাঁকি। আর এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে পরীক্ষাগারে তৈরি ও নকল পাথরের বিস্তার। ফলে বাজার বড় হওয়ার পাশাপাশি ক্রেতার জন্যও বড় হয়ে উঠছে ঝুঁকি—তিনি যে হীরা কিনছেন, সেটি সত্যিই প্রাকৃতিক ও বৈধ কি না, তা নিশ্চিত হওয়াই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

