দেশে জ্বালানি সংকট আবারও নতুন করে সামনে চলে এসেছে, আর এবারের সংকটের চিত্র শুধু চাহিদা-সরবরাহের ফারাক নয়, বরং উৎপাদন সক্ষমতার একটি বড় অংশই কাজে লাগানো যাচ্ছে না বলে উঠে এসেছে সরকারি হিসাবে। দেশীয় গ্যাসক্ষেত্রের উৎপাদন সক্ষমতা কমে আসার পাশাপাশি পর্যাপ্ত জ্বালানি সরবরাহের অভাবে একদিকে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো পূর্ণ সক্ষমতায় চলতে পারছে না, অন্যদিকে কয়লার ঘাটতিতে বন্ধ হয়ে গেছে দেশের কয়েকটি বড় বিদ্যুৎকেন্দ্র। এর সম্মিলিত প্রভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থায় তৈরি হয়েছে বাড়তি চাপ, যার ভুক্তভোগী হচ্ছেন সাধারণ গ্রাহকরা।
জ্বালানি খাত সংশ্লিষ্ন বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানে দীর্ঘদিনের ঘাটতি এবং আমদানিনির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতাই এই সংকটকে ক্রমেই আরও গভীর করে তুলছে।
পেট্রোবাংলার সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, দেশের গ্যাসক্ষেত্রের ১১৯টি কূপ এবং দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল মিলিয়ে দৈনিক গ্যাস উৎপাদনের সক্ষমতা প্রায় ৩৮৫৪ মিলিয়ন ঘনফুট। কিন্তু বাস্তবে উৎপাদন হচ্ছে মাত্র ২২৬২ মিলিয়ন ঘনফুটের কিছু বেশি—অর্থাৎ মোট সক্ষমতার প্রায় একচল্লিশ শতাংশই থেকে যাচ্ছে অব্যবহৃত।
খাতভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, রাষ্ট্রীয় একটি গ্যাস উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের পাঁচটি ক্ষেত্রে সক্ষমতার প্রায় অর্ধেক গ্যাসই উৎপাদিত হচ্ছে। সিলেটভিত্তিক আরেকটি প্রতিষ্ঠানের পাঁচটি ক্ষেত্রে অবশ্য সক্ষমতার প্রায় পুরোটাই ব্যবহৃত হচ্ছে। অন্যদিকে অনুসন্ধান ও উৎপাদন সংস্থা বাপেক্সের আটটি ক্ষেত্রে সক্ষমতার প্রায় সত্তর শতাংশ ব্যবহার হচ্ছে বলে দেখা গেছে।
আন্তর্জাতিক দুটি তেল-গ্যাস কোম্পানির পরিচালিত ক্ষেত্রগুলোতেও সক্ষমতার প্রায় সাড়ে ছাপ্পান্ন শতাংশ গ্যাস উৎপাদিত হচ্ছে। আর আমদানিকৃত এলএনজি রূপান্তরের দায়িত্বে থাকা প্রতিষ্ঠানের দুটি ভাসমান টার্মিনালের সরবরাহ সক্ষমতার প্রায় সাতান্ন শতাংশই ব্যবহৃত হচ্ছে বলে তথ্যে উঠে এসেছে।
গ্যাস বিতরণ কোম্পানিগুলোর তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, সরবরাহ পরিস্থিতি প্রায় সব অঞ্চলেই সংকটাপন্ন। রাজধানী ও আশপাশের এলাকায় গ্যাস সরবরাহকারী প্রধান প্রতিষ্ঠানের আওতাধীন একুশটি বিদ্যুৎকেন্দ্রে চাহিদার তুলনায় মাত্র প্রায় সাতাশ শতাংশ গ্যাস সরবরাহ করা সম্ভব হয়েছে, এবং একটি বৃহৎ সার কারখানাসহ পনেরোটি বিদ্যুৎকেন্দ্রে গ্যাস সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ ছিল।
কুমিল্লা অঞ্চলের বিতরণ কোম্পানির ক্ষেত্রেও একই ধরনের চিত্র—পনেরোটি বিদ্যুৎকেন্দ্রের চাহিদার প্রায় অর্ধেক গ্যাস সরবরাহ করা গেলেও একটি সার কারখানাসহ ন’টি বিদ্যুৎকেন্দ্রে সরবরাহ সম্পূর্ণ বন্ধ ছিল। চট্টগ্রাম অঞ্চলের বিতরণ প্রতিষ্ঠানের চারটি বিদ্যুৎকেন্দ্রে চাহিদার তুলনায় মাত্র প্রায় সতেরো শতাংশ গ্যাস সরবরাহ করা গেছে, যা অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় সবচেয়ে সংকটাপন্ন।
সিলেট অঞ্চলের বিতরণ ব্যবস্থায় পরিস্থিতি তুলনামূলক ভালো, যেখানে ঊনিশটি বিদ্যুৎকেন্দ্রের চাহিদার প্রায় সত্তর শতাংশ গ্যাস সরবরাহ করা সম্ভব হয়েছে। রাজশাহী ও খুলনা অঞ্চলেও বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর চাহিদার তুলনায় সরবরাহ যথেষ্ট কম ছিল বলে তথ্যে উঠে এসেছে।
বিশেষজ্ঞরা উল্লেখ করেছেন, গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর একটি বড় অংশ প্রয়োজন অনুযায়ী উৎপাদনে ব্যবহৃত না হলেও এসব কেন্দ্রের উদ্যোক্তাদের নির্দিষ্ট হারে ক্যাপাসিটি চার্জ পরিশোধ করতে হচ্ছে সরকারকে। অর্থাৎ কেন্দ্র প্রকৃতপক্ষে বিদ্যুৎ উৎপাদন করুক বা না করুক, চুক্তি অনুযায়ী নির্দিষ্ট সক্ষমতার জন্য অর্থ পরিশোধের বাধ্যবাধকতা থেকেই যাচ্ছে। এতে একদিকে প্রকৃত উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে, অন্যদিকে জ্বালানির অভাবে বসে থাকা কেন্দ্রগুলোর জন্যও ব্যয় হচ্ছে বিপুল অর্থ।
বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানান, কয়লা সংকটের কারণে দুটি বড় বিদ্যুৎকেন্দ্র সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে গেছে, তবে শিগগির এই সমস্যার সমাধান হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন। তাঁর ভাষ্যমতে, বর্তমানে গ্যাস সরবরাহ মোটামুটি সন্তোষজনক পর্যায়ে রয়েছে।
কক্সবাজারের মহেশখালীতে অবস্থিত আমদানিকৃত এলএনজি সরবরাহের দুটি ভাসমান টার্মিনালের একটিতে গত মাসে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটলে সরবরাহ ব্যাহত হয়, যা জাতীয় গ্যাস সরবরাহে বড় প্রভাব ফেলে। প্রায় দুই সপ্তাহ বন্ধ থাকার পর মেরামত শেষে টার্মিনালটি আংশিকভাবে চালু হলেও পরবর্তীতে কারিগরি সমস্যার কারণে আবার সাময়িকভাবে বন্ধ রাখতে হয়।
অন্য টার্মিনালটিতেও সাম্প্রতিক সময়ে সমস্যা দেখা দেয়—সাগর উত্তাল থাকায় এলএনজি কার্গো থেকে গ্যাস সরবরাহে ব্যাঘাত ঘটে এবং কার্গোটি সাময়িকভাবে সরিয়ে নিতে হয়। এরপর সরবরাহ পুনরায় চালু হলেও তা টেকসই হয়নি, বরং বারবার বন্ধ-চালুর মধ্য দিয়ে গেছে পুরো প্রক্রিয়াটি।
সবশেষ তথ্য অনুযায়ী, একটি টার্মিনাল পুরোদমে এবং অন্যটি আংশিকভাবে চালু হওয়ার পরও গত বুধবার বিকেলে একটি টার্মিনাল থেকে গ্যাস সরবরাহ সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়, যা সামগ্রিক সংকটকে আরও তীব্র করে তুলেছে।
পাওয়ার গ্রিড সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক এক দিনে দেশে সন্ধ্যার সর্বোচ্চ চাহিদার সময় বিদ্যুতের চাহিদা ও উৎপাদনের মধ্যে প্রায় ছয়শ মেগাওয়াটের ঘাটতি দেখা গেছে। এর প্রভাবে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ভিন্ন মাত্রার লোডশেডিং করতে হয়েছে—ময়মনসিংহ অঞ্চলে সবচেয়ে বেশি, এরপর ঢাকা ও খুলনা অঞ্চলে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে। তবে বরিশাল ও চট্টগ্রাম অঞ্চলে কোনো লোডশেডিং করতে হয়নি বলে জানানো হয়েছে।
এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের একজন অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞ মন্তব্য করেন, চলমান গ্যাস সংকটের মূল কারণ দেশীয় অনুসন্ধানে দীর্ঘদিনের অবহেলা এবং আমদানিনির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা। তাঁর মতে, এই প্রবণতা থেকে বেরিয়ে এসে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনে জোর দেওয়া গেলে শুধু অভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটানোই নয়, বরং ভবিষ্যতে গ্যাস রপ্তানির সম্ভাবনাও তৈরি হতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, শুধু আমদানি-নির্ভরতা কমানো নয়, বরং বিদ্যমান গ্যাসক্ষেত্রগুলোর ব্যবহৃত-অব্যবহৃত সক্ষমতার ফারাক কমিয়ে আনা এবং বিতরণ ব্যবস্থার দক্ষতা বাড়ানোও এখন সমান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে—যাতে বিদ্যমান অবকাঠামো থেকেই সর্বোচ্চ সুফল আদায় করা যায়।

