দীর্ঘস্থায়ী গ্যাস সংকট নিয়ে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের মধ্যে উদ্বেগ থাকলেও এখনই বাংলাদেশ থেকে পোশাকের ক্রয়াদেশ কমাচ্ছেন না তারা। তবে সংকট মোকাবিলায় বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার করতে গিয়ে উৎপাদন ব্যয় দিন দিন বেড়ে চলেছে রপ্তানিকারকদের।
শীর্ষস্থানীয় চারটি আন্তর্জাতিক ক্রেতা প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা জানিয়েছেন, তাদের প্রতিষ্ঠান আপাতত ক্রয়াদেশ কমাচ্ছে না— বরং একটি প্রতিষ্ঠান সম্প্রতি অর্ডার কিছুটা বাড়িয়েছে। তাদের ভাষ্যমতে, সরবরাহকারীদের কেউই এখন পর্যন্ত পণ্য সরবরাহে দেরি করেননি; ডিজেল বা অন্যান্য বিকল্প উপায়ে উৎপাদন সচল রেখে তারা সময়মতো পণ্য পৌঁছে দিচ্ছেন।
একটি খ্যাতনামা ক্রীড়া পোশাক ব্র্যান্ডের ঢাকা কার্যালয়ের একজন প্রতিনিধি বলেন, রপ্তানিকারকদের কষ্ট বাড়লেও তারা প্রতিশ্রুতি রক্ষা করে চলেছেন, তাই অর্ডার কমানোর কোনো পরিকল্পনা তাদের নেই।
ছয়জন রপ্তানিকারকের সঙ্গে আলাপে জানা গেছে, তাদের মধ্যে একজন ছাড়া বাকি সবাই এখনো ক্রয়াদেশ কমার কোনো লক্ষণ দেখেননি। তবে একটি টেক্সটাইল মিল জানিয়েছে, গ্যাস সংকটের কারণে চাহিদা থাকলেও তারা সীমিত পরিমাণে ক্রয়াদেশ গ্রহণ করছে।
দুই বছর ধরে চলা এই জ্বালানি সংকট মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক সংঘাতের প্রভাবে আরও তীব্র হয়েছে। এর মধ্যে জুলাই মাসে একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল বিকল হয়ে পড়ায় পরিস্থিতি আরও নাজুক হয়ে ওঠে। এর প্রভাব পড়েছে দেশের প্রধান শিল্পাঞ্চলগুলোতে— কিছু কারখানা কার্যক্রম সাময়িক বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছে, আবার কিছু কারখানা ব্যয়বহুল বিকল্প জ্বালানির ওপর নির্ভর করছে। এতে মালিকরা আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন এবং শ্রমিক ছাঁটাইয়ের আশঙ্কাও বাড়ছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় করণীয় নির্ধারণে আজ বৈঠকে বসছে নিটওয়্যার শিল্প মালিকদের একটি শীর্ষ সংগঠন।
উল্লেখ্য, বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম পোশাক রপ্তানিকারক দেশ হিসেবে গত অর্থবছরে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি ছিল প্রায় ঊনচল্লিশ বিলিয়ন ডলার, অন্যান্য টেক্সটাইল পণ্য যোগ করলে যা চল্লিশ বিলিয়নের কাছাকাছি। এই শিল্পের প্রায় পুরোটাই গ্যাসনির্ভর— গ্যাস দিয়ে ক্যাপটিভ বিদ্যুৎ উৎপাদন করেই সুতা ও কাপড় তৈরি হয়। সরকারের পক্ষ থেকে মাসের মাঝামাঝি পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার আশ্বাস দেওয়া হলেও কয়েক সপ্তাহ পরও উল্লেখযোগ্য কোনো উন্নতি হয়নি বলে জানিয়েছেন শিল্পমালিকরা।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক একটি বড় ব্র্যান্ডের ঢাকা কার্যালয়ের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, বাংলাদেশ থেকে ক্রয়াদেশ কমানোর কোনো পরিকল্পনা তাদের নেই। বছরে এক বিলিয়ন ডলারের বেশি পোশাক আমদানিকারী এই প্রতিষ্ঠানের বাংলাদেশে শতাধিক সরবরাহকারী রয়েছে। তার ভাষায়, প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেও প্রায় সব সরবরাহকারী সময়মতো পণ্য দিয়ে যাচ্ছেন, যদিও এ জন্য তাদের বাড়তি খরচে ডিজেল কিনতে হচ্ছে।
একইভাবে ইউরোপের একটি ক্রেতা প্রতিষ্ঠানের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, তাদের সরবরাহকারীরাও নির্ধারিত সময়ে পণ্য সরবরাহ অব্যাহত রেখেছেন এবং সাম্প্রতিক সপ্তাহে বরং অর্ডার সামান্য বেড়েছে।
দেশের একটি শীর্ষস্থানীয় রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক জানান, তাদের কোনো ক্রেতা এখনো ক্রয়াদেশ কমানোর কথা জানাননি, তবে নিয়মিত খোঁজখবর নিচ্ছেন এবং পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বিগ্ন। বছরে প্রায় সাড়ে তিনশ মিলিয়ন ডলারের পোশাক রপ্তানিকারী আরেকটি প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার জানান, ডিজেল ব্যবহারের কারণে তাদের মাসে বাড়তি ব্যয় হচ্ছে প্রায় তিন কোটি টাকা, তবে কোনো শিপমেন্টে দেরি হয়নি এবং কোনো ক্রেতাও অর্ডার কমাননি।
তবে ব্যতিক্রমও আছে। নিটওয়্যার প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারকদের একটি সংগঠনের সভাপতি জানান, তাদের এক ইউরোপীয় ক্রেতা প্রতিশ্রুত ক্রয়াদেশের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ কমিয়ে দিয়েছেন, কারণ গ্যাস সংকটের ঝুঁকি নিতে তিনি রাজি নন।
আরেকটি টেক্সটাইল মিলের চেয়ারম্যান জানান, তাদের কারখানায় প্রয়োজনীয় গ্যাসের চাপের তুলনায় বর্তমানে সরবরাহ প্রায় নেই বললেই চলে। ফলে বিকল্প ব্যবস্থায়ও সক্ষমতার ষাট শতাংশের বেশি উৎপাদন সম্ভব হচ্ছে না, যার কারণে চাহিদা থাকা সত্ত্বেও নতুন অর্ডার নিতে পারছেন না তারা।
সংকট মোকাবিলায় কারখানাগুলো এখন সৌরবিদ্যুৎ, ধানের তুষ, ডিজেল, ব্যাটারি এমনকি কাঠ পুড়িয়ে উৎপাদন চালিয়ে যাচ্ছে। কয়েকজন উদ্যোক্তা জানান, বয়লার সচল রাখতে তুষ ব্যবহার করা হচ্ছে, আবার কিছু এলাকায় বাধ্য হয়ে কাঠ পোড়ানো হচ্ছে। গ্যাসের তুলনায় কয়েকগুণ বেশি দামে ডিজেল কিনে উৎপাদন চালানোয় সার্বিক উৎপাদন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে গেছে।
চলমান সংকট মোকাবিলায় করণীয় ঠিক করতে আজ বৈঠকে বসছেন পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠনের সদস্যরা। সংগঠনের সভাপতি জানান, বৈঠক শেষে সিদ্ধান্ত নিয়ে শিগগিরই সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে তাদের অবস্থান জানানো হতে পারে।

