গ্যাসের চাপ শূন্যে নেমে যাওয়ায় নরসিংদীর বস্ত্রশিল্পে ভয়াবহ সংকট দেখা দিয়েছে। একের পর এক কারখানার উৎপাদন বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, নষ্ট হচ্ছে রাসায়নিক প্রক্রিয়াজাত কাপড়। প্রতিদিন বাড়ছে মালিকদের লোকসান, অন্যদিকে ক্রেতারা বাতিল করছেন আগের দেওয়া আদেশ।
মাধবদীর তিথি টেক্সটাইলের ঘটনা সংকটের ভয়াবহতা স্পষ্ট করে। কারখানাটিতে টানা চার দিন গ্যাসের চাপ শূন্য থাকায় উৎপাদন ও জেনারেটর দুটিই বন্ধ হয়ে যায়। এতে প্রায় ২.৫ লাখ গজ রাসায়নিক প্রক্রিয়াজাত কাপড় নষ্ট হয়েছে বলে জানান কারখানাটির রক্ষণাবেক্ষণ ব্যবস্থাপক সনেট সাহা।
ক্ষতির পরিমাণ শুধু কাপড় নষ্ট হওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। বিভিন্ন দেশের ক্রেতারা পণ্যের আদেশ বাতিল করছেন। শ্রমিকদের বেতন পরিশোধ করাও কঠিন হয়ে পড়েছে। ক্রেতাদের আর্থিক ক্ষতির জন্য ক্ষতিপূরণ দিতে হতে পারে বলেও জানিয়েছেন কারখানাটির উৎপাদন ব্যবস্থাপক শিহাবুল ইসলাম।
৩ হাজার কারখানার অঞ্চলে অচলাবস্থা
নরসিংদীতে ৩ হাজারের বেশি শিল্পকারখানা রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ২ হাজার ৫০০টি বস্ত্র, রং, সাইজিং, সুতা ও পোশাক কারখানা। স্থানীয় ব্যবসায়ীদের হিসাবে, প্রায় ৪০০টি কারখানা গ্যাসনির্ভর এবং নিরবচ্ছিন্নভাবে ১০ থেকে ১৫ পিএসআই গ্যাসের চাপ প্রয়োজন হয়।
দেশব্যাপী গ্যাস সংকট শুরু হয় ২১ জুলাই। কক্সবাজারের মহেশখালীর কাছে একটি ভাসমান তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস টার্মিনালে কারিগরি ত্রুটির পর সরবরাহে বড় ধরনের ব্যাঘাত ঘটে। এরপর বারবার সরবরাহ কমে যাওয়ায় বিদ্যুৎকেন্দ্র ও শিল্পকারখানাগুলোও সমস্যায় পড়ে।
দেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩ হাজার ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট। সংকটের আগে সরবরাহ ছিল প্রায় ২ হাজার ৬৫০ মিলিয়ন ঘনফুট। ১৯ আগস্ট তা কমে ২ হাজার ১৭৫ মিলিয়ন ঘনফুটে নেমে যায়। শনিবার সরবরাহ কিছুটা বেড়ে ২ হাজার ৩০০ মিলিয়ন ঘনফুট হয়েছে বলে পেট্রোবাংলার তথ্য।
নরসিংদীতে সংকট শুরু হয় আগস্টের প্রথম সপ্তাহে। তবে গত পাঁচ দিনে পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি হয়েছে। বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের মুখপাত্র ও আবেদ টেক্সটাইল প্রসেসিং মিলসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবদুল্লাহ আল মামুন জানান, এরই মধ্যে শতাধিক কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে।
কয়েক ঘণ্টার কাজ আটকে থাকছে দিনের পর দিন
নরসিংদী সদর ও মাধবদীর ১১টি শিল্পপ্রতিষ্ঠান ঘুরে দেখা গেছে, গ্যাসের অভাবে অধিকাংশ কারখানার বয়লার বন্ধ রয়েছে।
কারখানার কারিগরি কর্মীরা জানান, রাসায়নিক দ্রবণে ভেজানো কাপড় সাধারণত ১৬ ঘণ্টার মধ্যে পরবর্তী ধাপে প্রক্রিয়াজাত করতে হয়। কিন্তু কোথাও কোথাও তিন থেকে চার দিন ধরে গ্যাসের চাপ শূন্য থাকায় মেশিন চালানো যাচ্ছে না। ফলে মাঝপথে আটকে থাকা কাপড় আর ব্যবহারযোগ্য থাকছে না।
চৌয়ালা টেক্সটাইল মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক নান্নু মোল্লা বলেন, গ্যাসের চাপ বাড়েনি। কারখানার মেঝেতে পড়ে আছে বিপুল পরিমাণ রাসায়নিক প্রক্রিয়াজাত ধূসর কাপড়।
দীর্ঘ সময় পড়ে থাকায় কাপড়ে পচন ধরেছে এবং দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। দ্রুত সংকট সমাধানে সরকারের হস্তক্ষেপ চান তিনি।
মাধবদীর মুসলিম উইভিংয়ের মালিক মো. বিপুল মোল্লা বলেন, গ্যাস ও বিদ্যুৎ কখন পাওয়া যাবে, তার কোনো নিশ্চয়তা না থাকায় উৎপাদন ব্যাপকভাবে কমে গেছে।
চৌয়ালার ভাই ভাই সাইজিং মিলে গিয়ে মাত্র দুজন কর্মীকে পাওয়া যায়। মালিক আতাউর রহমান মিঠু জানান, গ্যাসের চাপ না থাকায় অনির্দিষ্টকালের জন্য কারখানা বন্ধ করে দিয়েছেন তিনি।
তার ভাষায়, শ্রমিকদের বসিয়ে রেখে নিয়মিত বেতন দেওয়া সম্ভব নয়। তাই পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত তাদের ছুটিতে পাঠানো হয়েছে। গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক হলেই কারখানা চালু করা হবে।
ব্যবসা চালাতে অনেক মালিক ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়েছেন। সংকট দীর্ঘ হলে কারখানা বিক্রি করে পথে বসার আশঙ্কাও করছেন তারা।
আগের সংকটের সঙ্গে যুক্ত হলো গ্যাস-বিদ্যুতের ধাক্কা
মাধবদীর হাবিব টেক্সটাইল মিলসের মালিকের ছেলে সেলিম আহমেদ জানান, শিল্পটি আগে থেকেই নানা সমস্যার মধ্যে ছিল। ব্যবসার গতি কমেছে, উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে, আধুনিক যন্ত্রপাতির সঙ্গে প্রতিযোগিতা কঠিন হয়েছে এবং ঋণের চাপও বাড়ছে।
এর সঙ্গে গত এক মাসের গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তুলেছে।
উৎপাদন বন্ধ থাকলেও শ্রমিকদের বেতন, কারখানার স্থায়ী ব্যয় এবং ব্যাংক ঋণের কিস্তি থেমে থাকে না—এটাই এখন মালিকদের বড় দুশ্চিন্তা।
বাংলাদেশ টেক্সটাইল ডাইং অ্যান্ড প্রিন্টিং অ্যাসোসিয়েশনের নরসিংদী শাখার চেয়ারম্যান ও মাধবদী ডাইং ফিনিশিং মিলসের মালিক নিজাম উদ্দিন ভূঁইয়া লিটনের দাবি, দেশের কাপড়ের চাহিদার প্রায় ৭৫ শতাংশ নরসিংদী থেকে সরবরাহ করা হয়।
তার মতে, গ্যাস ও বিদ্যুৎ না থাকায় নরসিংদী ও মাধবদীর প্রায় ৮০ শতাংশ মিল বন্ধ হয়ে গেছে। সংকট অব্যাহত থাকলে শ্রমিকদের বেতন, গ্যাস-বিদ্যুতের বিল ও অন্যান্য খরচ মেটানো অসম্ভব হয়ে পড়বে।
শিল্পকারখানাগুলো টিকিয়ে রাখাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। কারণ এসব প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভর করে হাজারো শ্রমিক ও তাদের পরিবার।
প্রতিদিন ৪০০-৫০০ কোটি টাকা লোকসানের দাবি
বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের মুখপাত্র আবদুল্লাহ আল মামুন জানান, নরসিংদীতে গ্যাসের অবকাঠামো থাকলেও শিল্পকারখানাগুলো প্রয়োজনীয় গ্যাস পাচ্ছে না।
এর ফলে রং করা, ছাপা ও অন্যান্য প্রক্রিয়াজাতকরণের সময় প্রতিদিন প্রায় ১ থেকে ১.৫ কোটি গজ কাপড় নষ্ট হচ্ছে বলে তার দাবি।
তিনি হিসাব করে বলেন, নরসিংদীর শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো প্রতিদিন প্রায় ৪০০ থেকে ৫০০ কোটি টাকা লোকসান করছে। ব্যাংক ঋণ নিয়ে ব্যবসা করা কারখানা মালিকদের জন্য পরিস্থিতি তাই অত্যন্ত কঠিন হয়ে উঠেছে।
মামুন বলেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোর বিভিন্ন প্রাকৃতিক ও মানবসৃষ্ট দুর্যোগে ব্যবসায়ীরা এমনিতেই চাপে ছিলেন। এখন গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকট পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করেছে। মাসের শেষ দিকে শ্রমিকদের বেতন, ব্যাংকের সুদ, বিভিন্ন পরিষেবার বিলসহ অন্যান্য খরচ পরিশোধ করা কঠিন হয়ে পড়বে।
দীর্ঘদিন এভাবে অনিশ্চয়তা চলতে থাকলে শ্রমিকদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়ে শিল্পাঞ্চলে অস্থিরতার আশঙ্কাও রয়েছে বলে তিনি সতর্ক করেছেন।
গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক করতে সরকারকে নির্দিষ্ট সময়সীমা ঘোষণা করার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
বিকল্প জ্বালানিতেও বাড়ছে খরচ
নরসিংদী চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি রাশেদুল হাসান রিন্টু জানান, বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার করেও কারখানাগুলো পূর্ণ সক্ষমতায় চালানো যাচ্ছে না।
কিছু কারখানায় বস্ত্রের বর্জ্য জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। তবে কাঠ ব্যবহারের ক্ষেত্রে পরিবেশগত বিধিনিষেধ রয়েছে।
নরসিংদী পরিবেশ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোহাম্মদ বদরুল হুদা জানান, সরকারি বা ব্যক্তিমালিকানাধীন গাছ কাটতে বন বিভাগের অনুমতি প্রয়োজন। তবে বাস্তবে এসব বিধি যথাযথভাবে মানা হচ্ছে না, যার ফলে পরিবেশের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
চৌয়ালা শিল্প এলাকায় অবশ্য কিছু কারখানায় বাষ্প তৈরির বয়লারে কাঠ পোড়াতে দেখা গেছে। হক টেক্সটাইলের বয়লার অপারেটর মো. শাখাওয়াত জানান, বস্ত্রের বর্জ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় কারখানাগুলো কাঠের দিকে ঝুঁকছে।
একেকটি কারখানায় শুধু জ্বালানি কাঠ কিনতেই প্রতিদিন ১২ হাজার টাকার বেশি খরচ হচ্ছে বলে জানান তিনি।
কবে স্বাভাবিক হবে গ্যাস সরবরাহ?
তিতাস গ্যাসের নরসিংদী কার্যালয়ের ব্যবস্থাপক প্রকৌশলী মো. মাকসুদুর রহমান জানান, সরকার ঘোড়াশাল-পলাশ ইউরিয়া সার কারখানায় অগ্রাধিকার ভিত্তিতে গ্যাস সরবরাহের নির্দেশ দিয়েছে।
কারখানাটি বর্তমানে ২০০ পিএসআই চাপে গ্যাস পাচ্ছে। অবশিষ্ট গ্যাস সিএনজি স্টেশন, শিল্পকারখানা ও আবাসিক গ্রাহকদের মধ্যে ভাগ করে দেওয়া হচ্ছে।
চলমান সংকটের কারণে শিল্পকারখানার মালিকদের চাহিদা অনুযায়ী গ্যাস সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে না বলে জানান তিনি।
তবে পরিস্থিতি আগামী সপ্তাহে কিছুটা উন্নতি হতে পারে বলে আশা প্রকাশ করেছেন তিতাসের এই কর্মকর্তা।
নরসিংদীর শিল্পাঞ্চলের বর্তমান পরিস্থিতি বলছে, গ্যাস সংকট এখন আর শুধু উৎপাদন কমে যাওয়ার সমস্যা নয়। কাঁচামাল নষ্ট হওয়া, ক্রেতার আদেশ বাতিল, শ্রমিকের বেতন, ব্যাংক ঋণ ও প্রতিদিনের বিপুল আর্থিক ক্ষতি—সব মিলিয়ে সংকটটি পুরো শিল্পখাতের টিকে থাকার প্রশ্নে পরিণত হয়েছে।

