বাংলাদেশের তৈরি পোশাক (আরএমজি) খাত গত অর্থবছরে মোট রপ্তানি কিছুটা কমলেও প্রতি ডলার রপ্তানি থেকে আগের চেয়ে বেশি অর্থ দেশে ধরে রাখতে পেরেছে। কাঁচামাল আমদানির ব্যয় কমে যাওয়ায় এমনটা সম্ভব হয়েছে। ফলে সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে পোশাক খাতের মূল্য সংযোজন বা আয় ধরে রাখার হারও বেড়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক ও রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে জুলাই থেকে জুন পর্যন্ত দেশের পোশাক রপ্তানি থেকে নিট আয় হয়েছে ২৪ দশমিক ২২ বিলিয়ন ডলার। আগের অর্থবছরে এই আয় ছিল ২৩ দশমিক ২২ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ এক বছরে নিট রপ্তানি আয় বেড়েছে প্রায় ৪ দশমিক ৩১ শতাংশ।
অন্যদিকে মোট পোশাক রপ্তানি সামান্য কমেছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে যেখানে মোট রপ্তানি আয় ছিল ৩৯ দশমিক ৩৫ বিলিয়ন ডলার, গত অর্থবছরে তা নেমে এসেছে ৩৮ দশমিক ৯৭ বিলিয়ন ডলারে। অর্থাৎ মোট রপ্তানি কমেছে শূন্য দশমিক ৯৬ শতাংশ।
মূল পরিবর্তনটি এসেছে কাঁচামাল আমদানির ব্যয়ে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে পোশাক তৈরির বিভিন্ন কাঁচামাল আমদানিতে ব্যয় হয়েছে ১৪ দশমিক ৭৫ বিলিয়ন ডলার, যা আগের অর্থবছরের ১৬ দশমিক ১৩ বিলিয়ন ডলারের তুলনায় ৮ দশমিক ৫৪ শতাংশ কম।
এর ফলে রপ্তানি আয়ের যে অংশ দেশে থেকে যাচ্ছে, সেই হারও বেড়েছে। গত অর্থবছরে পোশাক খাতের গড় মূল্য ধরে রাখার হার দাঁড়িয়েছে ৬২ দশমিক ১৫ শতাংশ। এক বছর আগে এই হার ছিল ৫৯ দশমিক ১ শতাংশ। অর্থাৎ এক বছরে হার বেড়েছে ৩ দশমিক ১৪ শতাংশীয় পয়েন্ট।
বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে এ হিসাব করতে শুধু ব্যাক-টু-ব্যাক এলসির মাধ্যমে আমদানি করা কাঁচামাল নয়, কাঁচা তুলা, সিনথেটিক ও ভিসকস ফাইবার, বিভিন্ন ধরনের সুতা, কাপড় এবং পোশাকের আনুষঙ্গিক পণ্য আমদানির ব্যয়ও বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে।
দেশের পোশাক খাতে মূল্য সংযোজনের হার দীর্ঘ সময় ৬০ থেকে ৬৪ শতাংশের মধ্যে ছিল। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এতে বেশ ওঠানামা দেখা গেছে। ২০২০ অর্থবছরে হার নেমে আসে ৫৬ দশমিক ৪৯ শতাংশে। পরের বছর তা বেড়ে ৫৯ দশমিক ১৩ শতাংশ হলেও ২০২২ অর্থবছরে আবার কমে দাঁড়ায় ৫৪ দশমিক ৩৮ শতাংশে। এরপর ২০২৩ ও ২০২৪ অর্থবছরে হার যথাক্রমে ৫৮ দশমিক ১১ ও ৬০ দশমিক ১৩ শতাংশে ওঠে।
রপ্তানিকারকদের মতে, নিট আয় বাড়ার পেছনে দেশের স্থানীয় পশ্চাৎমুখী সংযোগ শিল্পের সক্ষমতা বৃদ্ধি, কাঁচামাল সংগ্রহে দক্ষতা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে সুতা ও কাপড়ের দাম কিছুটা কমে আসার ভূমিকা রয়েছে।
তবে কাঁচামাল আমদানিতে ব্যয় কমে যাওয়াকে পুরোপুরি ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন না তৈরি পোশাক খাতের উদ্যোক্তারা। বাংলাদেশ গার্মেন্ট ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিজিএমইএ) জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি ইনায়েতুল হক খান বলেন, আমদানি কমে যাওয়ার অর্থ সবসময় ভালো কিছু ঘটছে—এমন নয়। কারণ রপ্তানি বাড়লে প্রয়োজন অনুযায়ী কাঁচামাল আমদানিও বাড়তে পারে।
তিনি বলেন, উৎপাদন ও ব্যবসা পরিচালনার ব্যয়ও বেড়েছে। বিশেষ করে গ্যাস সংকটের কারণে কারখানাগুলোকে বাড়তি চাপ সামলাতে হয়েছে। গ্যাস সরবরাহ কিছুটা স্বাভাবিক হলেও এখনও আগের পর্যায়ে ফেরেনি বলে জানান তিনি।
গ্যাস সংকটের কারণে দেশের পোশাক খাতের ভাবমূর্তিও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে মনে করেন বিজিএমইএর এই নেতা। বর্তমানে বাড়তি উৎপাদন ব্যয়ের পাশাপাশি সময়মতো পণ্য পাঠিয়ে বিদেশি ক্রেতাদের ধরে রাখাই রপ্তানিকারকদের বড় চিন্তার বিষয়।
তাঁর মতে, পুরো অর্থবছরের হিসাব একসঙ্গে দেখলে পরিস্থিতির পুরো চিত্র পাওয়া যায় না। বিভিন্ন প্রান্তিকে ব্যবসার পরিস্থিতিতে পার্থক্য ছিল। আগস্ট ও সেপ্টেম্বর সাধারণত তুলনামূলক দুর্বল সময় হলেও ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে অর্ডারে কিছুটা উন্নতি দেখা যাচ্ছে। অক্টোবর থেকে স্বাভাবিকভাবে অর্ডার বাড়তে পারে, তবে এর জন্য নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করা জরুরি।
বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সভাপতি ফজলুল হকও নিট রপ্তানি আয় বৃদ্ধিকে আংশিকভাবে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। তাঁর মতে, ইউটিলিটি ব্যয় ও শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধিসহ বিভিন্ন কারণে উৎপাদন খরচ বেড়েছে। সেই পরিস্থিতিতে নিট আয় বাড়া কিছুটা স্বস্তির খবর।
তবে তাঁর মতে, বেশি নিট আয় ধরে রাখতে পারা একটি ইতিবাচক পরিবর্তনের ইঙ্গিতও দেয়। এর অর্থ হচ্ছে উদ্যোক্তারা তুলনামূলক বেশি মূল্য সংযোজন করা পণ্য তৈরি করছেন, ভালো দাম পাচ্ছেন এবং উৎপাদন প্রক্রিয়ায় দক্ষতা বাড়াতে পারছেন।
ফজলুল হক আরও বলেন, কাঁচামালের কার্যকর ব্যবহার বাড়ায় উৎপাদন পর্যায়ে অপচয়ও কমেছে। ফলে সামগ্রিকভাবে কম খরচে বেশি মূল্য ধরে রাখার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
সব মিলিয়ে, গত অর্থবছরের পোশাক রপ্তানির পরিসংখ্যান একটি মিশ্র চিত্র তুলে ধরছে। মোট রপ্তানি সামান্য কমলেও কাঁচামাল ব্যয় কমানো, উৎপাদন দক্ষতা বৃদ্ধি এবং মূল্য সংযোজনের ফলে খাতটি আগের চেয়ে বেশি অর্থ দেশে ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে। তবে গ্যাস সংকট, মজুরি ও অন্যান্য উৎপাদন ব্যয় রপ্তানিকারকদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়েই রয়েছে।

