২০২৬ সালের শুরুর দিকে অর্থনীতিবিদরা যে পূর্বাভাস দিয়েছিলেন, তা ছিল আশাবাদী; প্রায় ১৭ লাখ মানুষ এ বছর দারিদ্র্যসীমার ওপরে উঠবেন। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ সেই সমীকরণ পুরোপুরি বদলে দিয়েছে। বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক মূল্যায়ন প্রতিবেদন বলছে, এ বছর মাত্র ৫ লাখ মানুষ দারিদ্র্য থেকে বের হতে পারবেন। বাকি ১২ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচেই থেকে যাবেন। শুধু তা-ই নয়, সংকটের কারণে আরও কমপক্ষে ৬ লাখ মানুষ চাকরি হারাবেন।
দেশের অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের যে সম্ভাবনা ছিল, তা এখন ঝুঁকির মুখে। ২০২২ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে উৎপাদনশীল কর্মসংস্থান সৃষ্টির সীমাবদ্ধতা, শ্রম আয়ের মন্থর প্রবৃদ্ধি ও উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে বাংলাদেশে দারিদ্র্য বিমোচনের গতি ইতিমধ্যেই কমে গিয়েছিল। জাতীয় দারিদ্র্যের হার টানা তৃতীয় বছরের মতো বাড়ছে, ২০২২ সালে ১৮.৭ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০২৫ সালে দাঁড়িয়েছে ২১.৪ শতাংশে। ২০২৫ সালেই নতুন করে প্রায় ১৪ লাখ মানুষ দারিদ্র্যের শিকার হয়েছেন। আর মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ সেই সংকটকে আরও গভীর করে তুলেছে।
বিশ্বব্যাংকের বাজেট সহায়তা: ৭১ কোটি ডলার
এই সংকট মোকাবিলায় বাংলাদেশ সরকার বিশ্বব্যাংকের কাছে বাজেট সহায়তা চায়। বিশ্বব্যাংক ২৬ জুন ৭১ কোটি ৩০ লাখ ডলার (৭১৩ মিলিয়ন) বাজেট সহায়তা অনুমোদন করে। এই অর্থ দিয়ে মূলত আন্তর্জাতিক বাজার থেকে কেনা জ্বালানি পণ্যের দাম পরিশোধ করা হবে। পাশাপাশি সংকটে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার এবং ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের জন্য নগদ সহায়তা ও জীবিকা সহায়তা দেওয়া হবে।
এর বাইরে আরও ৩০০ মিলিয়ন ডলারের ‘ইমার্জেন্সি সাপোর্ট ফর ফুড সিকিউরিটি প্রজেক্ট’-এর আওতায় ৬০০ হাজার মেট্রিক টন সার আমদানিতে সহায়তা করা হবে, যার অর্ধেকই ইউরিয়া। মোট ১.১ বিলিয়ন ডলারের এই জরুরি অর্থায়ন প্যাকেজটি খাদ্য নিরাপত্তা, সার, জ্বালানি ও ভর্তুকি খাতে ব্যয় করা হবে। বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ ও ভুটান ডিরেক্টর জঁ পেসমে বলেছেন, ‘মধ্যপ্রাচ্য সংকটের কারণে বাড়তি খাদ্য, সার ও জ্বালানি মূল্য এবং সীমিত রাজস্ব স্থান বাংলাদেশের অর্থনীতিকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে, বিশেষ করে ক্ষুদ্র কৃষক ও দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ মানুষদের সবচেয়ে বেশি আঘাত করেছে’।
জ্বালানি সংকট: ভর্তুকির বোঝা বাড়ছে
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ বাংলাদেশের জ্বালানি খাতে সরাসরি আঘাত এনেছে। দেশের প্রাথমিক জ্বালানি সরবরাহের ৫০ শতাংশের বেশি আসে গ্যাস থেকে। অপরিশোধিত তেলের ৬০-৬৫ শতাংশ ও এলএনজির ৫৫-৬০ শতাংশ আসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে। পেট্রোবাংলার ছয়টি এলএনজি সরবরাহ চুক্তির মধ্যে পাঁচটি ‘ফোর্স মেজর’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। এলএনজির স্পট মূল্য বেড়ে প্রতি এমএমবিটিইউতে ২৪-২৮ ডলারে উঠেছে, যা স্বাভাবিক সময়ের দ্বিগুণের বেশি।
বিশ্বব্যাংকের মূল্যায়ন অনুযায়ী, ২০২৬ সালে জ্বালানি খাতে মোট ভর্তুকির বোঝা দাঁড়াতে পারে ২.৫ বিলিয়ন ডলার থেকে ৪.৮ বিলিয়ন ডলার। অন্যদিকে ইউরিয়া সারের দাম ইতিমধ্যে ৩০ শতাংশ বেড়েছে। সংকট দীর্ঘস্থায়ী হলে এই দাম দ্বিগুণও হতে পারে। উচ্চ মূল্যস্ফীতি ইতিমধ্যেই ৮.৫ শতাংশে পৌঁছেছে, যা নিম্নআয়ের মানুষের ক্রয়ক্ষমতাকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
কাঠামোগত দুর্বলতা: সংকট মোকাবিলার সক্ষমতা কতটুকু?
বিশ্বব্যাংক বলছে, বাংলাদেশের কাঠামোগত অর্থনৈতিক দুর্বলতাগুলো বড় ধরনের অভিঘাত মোকাবিলায় সরকারের সক্ষমতাকে গুরুতরভাবে সীমিত করে দিয়েছে। ১৫ বছরের মধ্যে প্রথমবারের মতো কর-জিডিপি অনুপাত ৭ শতাংশের নিচে নেমে গেছে। টানা তিন বছর মূল্যস্ফীতি প্রায় ৯ শতাংশে রয়েছে। প্রায় ৮০ শতাংশ শ্রমিক অনানুষ্ঠানিক খাতে কাজ করেন।
বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো প্রতি মাসে ২৬ বার বিদ্যুৎ-বিভ্রাটের মুখে পড়ে, যার ফলে বার্ষিক বিক্রির ৯ শতাংশ সমপরিমাণ ক্ষতি হয়। নিয়ন্ত্রক সংস্থার বিভিন্ন বিধিবিধানের কারণে প্রতিষ্ঠানগুলোর বিনিয়োগের সম্ভাবনা ১৯ শতাংশ কমে যায়। উৎপাদনশীল শীর্ষ ১০ শতাংশ প্রতিষ্ঠান দেশের রাজস্বের ৭৫ শতাংশ ও রপ্তানির ৭০ শতাংশ করে, কিন্তু কর্মসংস্থানের মাত্র ১৫ শতাংশ দেয়। অন্যদিকে এসএমই ও খাতের বিপুলসংখ্যক প্রতিষ্ঠান কর্মসংস্থানের অধিকাংশ দেয়, কিন্তু নীতি সহায়তা পায় খুব কম। ২০১৬ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে সৃষ্টি হওয়া নতুন কর্মসংস্থানের প্রতি ১০টির মধ্যে সাতটি হয়েছে কম উৎপাদনশীল কৃষিখাতে।
সংকট কাটাতে কী করা দরকার?
বিশ্বব্যাংক বলছে, এই ঝুঁকিগুলো মোকাবিলায় একটি সুসংহত স্থিতিশীলতা কৌশল প্রয়োজন; যার মধ্যে থাকতে পারে কাঠামোগত সংস্কার, রাজস্ব সংগ্রহ বাড়ানো, আর্থিক খাত শক্তিশালী করা ও ব্যবসায়িক পরিবেশের উন্নয়ন। সিপিডির গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেছেন, ‘দারিদ্র্য থেকে বেরিয়ে আসার লোকের সংখ্যা কমছে, এটি বেশ উদ্বেগজনক। সরকার ঘোষিত বিভিন্ন সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি যেন দরিদ্রদের উপযোগী হয়, সেদিকে নজর দেওয়া উচিত। রাজনৈতিক বিবেচনা থেকে বেরিয়ে এসে নির্মোহভাবে সুবিধাভোগী চিহ্নিত করতে হবে।
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ যদি দীর্ঘায়িত হয়, তাহলে জ্বালানি ও সারের মূল্য আরও বাড়তে পারে, রেমিট্যান্স প্রবাহ কমতে পারে এবং রপ্তানি বাধাগ্রস্ত হতে পারে। কিন্তু বিশ্বব্যাংক মনে করে, ২০২৬ সালের নির্বাচনের পর রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও কাঠামোগত সংস্কারে দ্রুত অগ্রগতি শক্তিশালী পুনরুদ্ধারকে সহায়তা করতে পারে। এখন সময় মূল্যায়নের নয়, বরং দ্রুত বাস্তবায়নের।

