বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের সবচেয়ে বড় ভরসা তৈরি পোশাক খাত। প্রতি বছর প্রায় ৩ হাজার ৯০০ কোটি ডলারের পোশাক বিদেশে বিক্রি করে দেশ। সংখ্যাটি বড় হলেও এর পুরোটা বাংলাদেশের অর্থনীতিতে থেকে যায় না। পোশাক তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামাল আমদানি করতে রপ্তানি আয়ের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ আবার বিদেশে চলে যায়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ ত্রৈমাসিক পর্যালোচনায় এমনই একটি চিত্র উঠে এসেছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের এপ্রিল থেকে জুন—এই তিন মাসে বাংলাদেশ ১ হাজার ১০ কোটি ডলারের পোশাক রপ্তানি করেছে। একই সময়ে পোশাক তৈরির কাঁচামাল আমদানিতে ব্যয় হয়েছে ৩৮৭ কোটি ডলার।
অর্থাৎ তিন মাসে পোশাক খাত থেকে নিট বৈদেশিক মুদ্রা আয় হয়েছে ৬২৩ কোটি ডলার। সহজ হিসাবে, প্রতি ১০০ ডলারের পোশাক রপ্তানির বিপরীতে প্রায় ৩৮ ডলার কাঁচামাল আমদানিতে চলে গেছে। দেশের অর্থনীতিতে থেকে গেছে প্রায় ৬২ ডলার।
এই হিসাবটি শুধু পোশাক রপ্তানির আকার নয়, খাতটির স্থানীয় সক্ষমতার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিকও সামনে আনছে। রপ্তানি বাড়ানোর পাশাপাশি দেশে কাঁচামাল উৎপাদন বাড়ানো গেলে একই রপ্তানি থেকে আরও বেশি বৈদেশিক মুদ্রা দেশে রাখা সম্ভব।
বাংলাদেশ ব্যাংকের গবেষণা বিভাগের এপ্রিল-জুন ২০২৬ ত্রৈমাসিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওই সময়ে কাঁচা তুলা, সিনথেটিক ও ভিসকস ফাইবার, সুতা, কাপড় এবং পোশাক তৈরির বিভিন্ন আনুষঙ্গিক পণ্য আমদানিতে ৩৮৭ কোটি ডলার ব্যয় হয়েছে। এই ব্যয় ওই সময়ের পোশাক রপ্তানি আয়ের ৩৮ দশমিক ৩২ শতাংশ।
অর্থনীতিবিদ ও শিল্পসংশ্লিষ্টদের মতে, শুধু মোট রপ্তানি আয় দেখলে পোশাক খাতের প্রকৃত অবদান পুরোপুরি বোঝা যায় না। কারণ রপ্তানি থেকে অর্জিত অর্থের একটি অংশ যদি কাঁচামাল আমদানিতে বিদেশে চলে যায়, তাহলে দেশের হাতে থাকা প্রকৃত বৈদেশিক মুদ্রার পরিমাণ কমে যায়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে, এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে পোশাক খাতের নিট রপ্তানি আয় আগের প্রান্তিকের তুলনায় ১০ দশমিক ৩৮ শতাংশ এবং আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ২০ দশমিক ৩৪ শতাংশ বেড়েছে।
২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের মোট পোশাক রপ্তানি আয় দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ৮৯৭ কোটি ডলার। আগের অর্থবছরের তুলনায় এই আয় বেড়েছে মাত্র শূন্য দশমিক ৯৬ শতাংশ।
দেশের মোট পণ্য রপ্তানি আয়ের ৮০ শতাংশের বেশি আসে তৈরি পোশাক থেকে। ফলে বৈদেশিক বাণিজ্যে এ খাতের গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি।
তবে এই খাতের উৎপাদনব্যবস্থা এখনো আমদানিনির্ভর। বিশেষ করে ম্যান-মেড ফাইবার বা এমএমএফভিত্তিক পোশাক তৈরিতে বিদেশি কাঁচামালের ওপর নির্ভরতা বেশি। ওভেন পোশাকেও স্থানীয়ভাবে প্রয়োজনীয় কাঁচামাল সরবরাহের সক্ষমতা এখনো সীমিত।
ফলে পোশাক রপ্তানি যত বাড়ছে, তার সঙ্গে কাঁচামাল আমদানির ব্যয়ও বাড়ছে। এতে রপ্তানি আয় বাড়লেও দেশের ভেতরে তৈরি হওয়া প্রকৃত মূল্য সংযোজন প্রত্যাশিত হারে বাড়ছে না।
তৈরি পোশাক খাতের উদ্যোক্তা কিউট ডেস ইন্ডাস্ট্রি লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শেখ এইচ এম মোস্তাফিজের মতে, মোট রপ্তানি আয়ের পাশাপাশি দেশের হাতে কত বৈদেশিক মুদ্রা থাকছে, সেটিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি বলেন, স্থানীয় কাঁচামাল, ফ্যাব্রিক ও ম্যান-মেড ফাইবার শিল্পে বিনিয়োগ না বাড়ালে রপ্তানি বাড়লেও দেশের মূল্য সংযোজন একই গতিতে বাড়বে না।
তাঁর মতে, নিট পোশাকের ক্ষেত্রে স্থানীয় সংযোগ শিল্প প্রায় ৯০ শতাংশ পর্যন্ত সহায়তা দিতে পারে। বিপরীতে ওভেন পোশাকে এই সক্ষমতা প্রায় ৪০ শতাংশ। ফলে ওভেন পোশাকে স্থানীয় মূল্য সংযোজন বাড়ানোর বড় সুযোগ রয়েছে।
এ জন্য চীনসহ বিভিন্ন দেশ থেকে বাংলাদেশে স্থানান্তরিত হতে চাওয়া শিল্প ও বিনিয়োগ আকর্ষণের ওপর জোর দেন তিনি। তাঁর মতে, এ ধরনের বিনিয়োগ আনতে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও গ্যাস, উন্নত অবকাঠামো এবং সহজ লজিস্টিক ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
একই সঙ্গে দক্ষ শ্রমিক তৈরির বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। দক্ষ জনবল ছাড়া স্থানীয় সম্পদ ও শিল্প সক্ষমতার সর্বোচ্চ ব্যবহার সম্ভব নয় বলেও তিনি মনে করেন।
তৈরি পোশাক খাতের শীর্ষ সংগঠন বিজিএমইএর জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি ইনামুল হক খান বাবলুর মতে, পোশাক তৈরিতে প্রয়োজনীয় পণ্য স্থানীয়ভাবে উৎপাদন করা গেলে দেশের নিট বৈদেশিক মুদ্রা আয় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো সম্ভব।
তিনি বলেন, কাপড়, সুতা, বিভিন্ন কাঁচামাল ও অ্যাকসেসরিজের বড় একটি অংশ এখনো বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। স্থানীয় শিল্পের সক্ষমতা বাড়ানো গেলে এসব পণ্যের আমদানি ব্যয় কমবে এবং সেই অর্থের একটি অংশ দেশের অর্থনীতির ভেতরেই থাকবে।
বাবলুর হিসাব অনুযায়ী, প্রতি ১০০ ডলারের পোশাক রপ্তানিতে প্রায় ৪০ ডলার পর্যন্ত কাঁচামাল ও আনুষঙ্গিক পণ্য আমদানিতে ব্যয় হতে পারে। দেশে উৎপাদন বাড়ানো গেলে এই অর্থের বড় অংশ স্থানীয় অর্থনীতিতে ধরে রাখা সম্ভব।
তবে এ ক্ষেত্রে বড় বাধা জ্বালানি সংকট। তাঁর ভাষায়, গ্যাস ও বিদ্যুতের অনিশ্চয়তার কারণে কারখানা সচল রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে। উৎপাদন ব্যাহত হলে খরচ বাড়ার পাশাপাশি নির্ধারিত সময়ে বিদেশি ক্রেতাদের কাছে পণ্য পৌঁছানো নিয়েও ঝুঁকি তৈরি হয়।
২০২৫-২৬ অর্থবছরের শেষ তিন মাসে পোশাক রপ্তানিতে কিছুটা গতি দেখা গেছে। এপ্রিল-জুন সময়ে রপ্তানি হয়েছে ১ হাজার ১০ কোটি ডলারের পোশাক। এর আগের প্রান্তিকে রপ্তানি হয়েছিল ৯২০ কোটি ডলার।
এক বছরের ব্যবধানে এই সময়ের পোশাক রপ্তানি বেড়েছে ১০ দশমিক ৭৮ শতাংশ।
এপ্রিল-জুন সময়ে নিটওয়্যার রপ্তানি হয়েছে ৫৫০ কোটি ডলার। আর ওভেন পোশাক থেকে এসেছে ৪৬০ কোটি ডলার।
বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানির প্রায় ৭২ শতাংশ যায় ৯টি প্রধান বাজারে। বাজারগুলো হলো—যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানি, যুক্তরাজ্য, স্পেন, নেদারল্যান্ডস, ফ্রান্স, ইতালি, কানাডা ও বেলজিয়াম।
এপ্রিল-জুন সময়ে এসব দেশে মোট ৭২৪ কোটি ডলারের পোশাক রপ্তানি হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় একক বাজার যুক্তরাষ্ট্র। ওই তিন মাসে দেশটিতে ২১৫ কোটি ডলারের পোশাক রপ্তানি করেছে বাংলাদেশ।
কয়েকটি বাজারের ওপর এত বেশি নির্ভরতা থাকায় নতুন বাজার খোঁজার প্রয়োজনীয়তাও বাড়ছে। একই সঙ্গে উদ্যোক্তারা তুলনামূলক বেশি দামের ও উচ্চমূল্য সংযোজনের পোশাক উৎপাদনের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন।
এলডিসি থেকে উত্তরণের পর বাংলাদেশের পোশাক খাতকে আন্তর্জাতিক বাজারে আরও কঠিন প্রতিযোগিতার মুখে পড়তে হবে। তখন শুধু কম দামে পোশাক উৎপাদনের ওপর নির্ভর করে বাজার ধরে রাখা সহজ হবে না।
এই পরিস্থিতিতে পোশাক খাতের ভবিষ্যৎ সাফল্য অনেকটাই নির্ভর করবে স্থানীয় শিল্প কতটা শক্তিশালী করা যায় তার ওপর। কাঁচামাল, ফ্যাব্রিক, সুতা ও ম্যান-মেড ফাইবার উৎপাদনে বিনিয়োগ বাড়ানোর পাশাপাশি টেক্সটাইল শিল্পের সক্ষমতা বাড়াতে হবে।
এর সঙ্গে দক্ষ শ্রমিক তৈরি, নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ এবং উন্নত লজিস্টিক সুবিধা নিশ্চিত করাও জরুরি।
কারণ শুধু রপ্তানির পরিমাণ বাড়লেই হবে না—রপ্তানি করা প্রতি ১০০ ডলারের মধ্যে কতটা বৈদেশিক মুদ্রা বাংলাদেশের অর্থনীতিতে ধরে রাখা যাচ্ছে, ভবিষ্যতে সেই হিসাবটিই আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

