আপনার পকেটে থাকা ৫০০ টাকার নোটটি হয়তো এখনো পুরোপুরি ছেঁড়া নয়, কিন্তু একটি দোকানে গিয়ে সেটি নিতে অস্বীকৃতি জানানো হলো। ব্যাংকের যন্ত্রে ঢোকানোর পর নোটটি ফেরত এল। কোথাও আবার পুরোনো নোট দেখে বিক্রেতা বললেন, ‘অন্য টাকা দেন।’ এই ঘটনাটা বিচ্ছিন্ন কোনো দুর্ঘটনা নয়; এটা বাংলাদেশের বর্তমান মুদ্রা-ব্যবস্থাপনার একটা কাঠামোগত সমস্যার প্রতিচ্ছবি, যার শিকার হচ্ছেন দোকানদার থেকে শুরু করে মেট্রোরেলের যাত্রী পর্যন্ত প্রায় সবাই। প্রশ্নটা হলো, বাজারে হঠাৎ এত ছেঁড়া, পুরোনো নোট এল কোথা থেকে, আর এটা কি আসলেই “হঠাৎ” ঘটা কোনো সমস্যা, নাকি এর পেছনে একটা স্পষ্ট প্রশাসনিক ও আইনগত ব্যাখ্যা আছে?
প্রথমেই একটা আইনি সত্য জেনে রাখা দরকার
বাংলাদেশ ব্যাংক অর্ডার, ১৯৭২-এর ২৩ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, নোট ছাপানো ও বাজারে ছাড়ার একচ্ছত্র অধিকার একমাত্র বাংলাদেশ ব্যাংকের। কিন্তু এই একই আইনের ২৮ নম্বর অনুচ্ছেদে স্পষ্ট করে বলা আছে, ছেঁড়া, বিকৃত বা অতিরিক্ত ময়লা নোট পুনরায় বাজারে ছাড়া যাবে না। অর্থাৎ বাজারে এখন যে পরিমাণ জীর্ণ নোট ঘুরছে, তার একটা বড় অংশ আইনি দৃষ্টিতে আসলে সঞ্চালনযোগ্যই নয়; এগুলো তুলে নিয়ে ধ্বংস করে নতুন নোট দিয়ে প্রতিস্থাপন করার কথা। বাস্তবে এটা না হওয়ার কারণ আইনের ফাঁক নয়, বরং সরবরাহ-শৃঙ্খলের একটা বাস্তব সংকট। নতুন নোট তৈরি করার গতি পুরোনো নোট প্রত্যাহারের প্রয়োজনের সঙ্গে তাল মেলাতে পারছে না।
কেন হঠাৎ এই ঘাটতি তৈরি হলো
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ছবিসংবলিত পুরোনো নকশার নোট ছাপানো বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু নতুন নকশা তৈরি, তার অনুমোদন এবং বাস্তবে ছাপার কাজ শুরু করতে যে সময়টা লেগেছে, সেই ফাঁকটাই এখনকার সংকটের মূল কারণ। বাংলাদেশ ব্যাংক অর্ডার, ১৯৭২-এর ২৭ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, নোটের নকশা ও আকৃতি ঠিক হয় সরকারের অনুমোদনক্রমে বোর্ডের সুপারিশের ভিত্তিতে অর্থাৎ এটা নিছক একটা ছাপাখানার প্রক্রিয়া নয়, একটা বহু-স্তরের প্রশাসনিক অনুমোদনের প্রক্রিয়াও। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে কাঁচামালের সমস্যা; নিরাপত্তা কাগজ, বিশেষ কালি ও নিরাপত্তা সুতার প্রায় পুরোটাই আমদানি করতে হয় ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য, জার্মানিসহ আটটি নির্দিষ্ট বিদেশি সরবরাহকারীর কাছ থেকে, আর কাঁচামাল হাতে আসার পরও ছাপার কাজ শেষ করতে টাঁকশালের লেগে যায় প্রায় তিন মাস। ফলে ২০ ও ৫০ টাকার মতো নিত্যব্যবহার্য নোট ছাপানোই পিছিয়ে গেছে কাঁচামাল সময়মতো না পৌঁছানোর কারণে।
সংখ্যাগুলো যা বলছে
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, গত জুন পর্যন্ত মোট ছাপানো টাকার (রিজার্ভ মানি) পরিমাণ ছিল প্রায় ৪ লাখ ৭৬ হাজার কোটি টাকা, যার মধ্যে জনগণের হাতে ছিল প্রায় ৩ লাখ ৩৬ হাজার কোটি টাকা। কিন্তু ছাপানোর খরচের চিত্রটা আরও চমকপ্রদ। ২০২০-২১ অর্থবছরে একটা ২০ টাকার নোট ছাপাতে খরচ হতো ১ টাকা ৫৮ পয়সা, যা ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫ টাকা ২০ পয়সায় অর্থাৎ প্রায় ২২৯ শতাংশ বৃদ্ধি। ৫০ টাকার নোটের ছাপার খরচ একইভাবে বেড়েছে প্রায় ২২২ শতাংশ। এই লাফের পেছনে বড় কারণ ডলারের বিনিময় হার। ২০২২ সালে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর সময় যেখানে ডলারের দাম ছিল ৮৫ টাকা, তা এখন ১২৪ টাকায় উঠেছে। প্রতিটি কাঁচামাল ডলারে কিনতে হওয়ায় বিনিময় হারের এই লাফ সরাসরি প্রতিটি নোটের উৎপাদন-খরচে যোগ হয়েছে। তবে আশ্চর্যজনকভাবে বাংলাদেশ ব্যাংকের মোট মুদ্রণ-ব্যয় এই সময়ে সেভাবে বাড়েনি। ২০২০-২১ অর্থবছরে যেখানে খরচ হয়েছিল ৩৪০ কোটি টাকা, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা কমে দাঁড়িয়েছে ২৩৫ কোটিতে। এই পার্থক্যটাই সমস্যার মূল সূত্র বলে দেয়, নোটপ্রতি খরচ বাড়লেও মোট খরচ কমেছে মূলত কম পরিমাণে নোট ছাপানোর কারণে, আর কম নোট ছাপানোর সরাসরি ফল হলো বাজারে পুরোনো নোটের আধিক্য।
আন্তর্জাতিক তুলনায় বাংলাদেশ কোথায় দাঁড়িয়ে
এই সংকটটাকে বিচ্ছিন্নভাবে না দেখে বিশ্বের অন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর অভিজ্ঞতার সঙ্গে মিলিয়ে দেখলে একটা গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য চোখে পড়ে। ভারতের কেন্দ্রীয় ব্যাংক রিজার্ভ ব্যাংক অব ইন্ডিয়া ১৯৮৮ সাল থেকে একটা প্রাতিষ্ঠানিক “ক্লিন নোট পলিসি” বা পরিচ্ছন্ন নোট নীতি অনুসরণ করে আসছে, যার আওতায় উচ্চ-গতির নোট যাচাই ও প্রক্রিয়াকরণ যন্ত্রের মাধ্যমে জীর্ণ নোট নিয়মিতভাবে চিহ্নিত করে ধ্বংস করা হয় এবং তার জায়গায় নতুন নোট সরবরাহ করা হয়। এটা কোনো সাময়িক সংকট মোকাবিলার ব্যবস্থা নয়, বরং একটা চলমান, পূর্বপরিকল্পিত প্রক্রিয়া। আমার নিজস্ব পর্যবেক্ষণ হলো, বাংলাদেশ ব্যাংক অর্ডার ১৯৭২-এর ২৮ নম্বর অনুচ্ছেদে জীর্ণ নোট পুনঃসঞ্চালন না করার আইনি বাধ্যবাধকতা থাকলেও, সেটাকে বাস্তবায়নের জন্য ভারতের মতো একটা ধারাবাহিক, প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়ার অভাবই এই সংকটকে বারবার ফিরিয়ে আনার মূল কারণ। এটা রাজনৈতিক কোনো ব্যর্থতা নয় বলেই মনে হয়। বরং মুদ্রা-ব্যবস্থাপনাকে একটা জরুরি-ভিত্তিক সমস্যা হিসেবে না দেখে দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত পরিকল্পনার আওতায় আনার ঘাটতি।
যাদের কাঁধে চাপছে এই সংকটের বোঝা
এই সংকটের সবচেয়ে বড় শিকার তারাই, যাদের হাতে বিকল্প কম। ঢাকার একজন ভ্রাম্যমাণ সবজি বিক্রেতার ভাষায়, ছেঁড়া টাকা অনেক সময় পাইকারি বিক্রেতারা নিতে চান না, আর এসব নোট পাল্টে নেওয়ার সরকারি প্রক্রিয়া সম্পর্কেও তার কোনো স্পষ্ট ধারণা নেই। এখানেই বোঝা যায়, একটা প্রশাসনিক-কারিগরি সংকট কীভাবে সবচেয়ে বেশি আঘাত করে তাদের, যারা ব্যাংকিং ব্যবস্থার সঙ্গে কম পরিচিত এবং নগদ টাকার ওপর সবচেয়ে বেশি নির্ভরশীল। ভাসমান বিক্রেতা, দিনমজুর কিংবা প্রান্তিক ব্যবসায়ী। যাদের ব্যাংক হিসাব আছে, তারা হয়তো ডিজিটাল লেনদেনে সাময়িকভাবে সমস্যা এড়াতে পারছেন, কিন্তু যে অর্থনীতির বড় অংশ এখনো নগদনির্ভর, তাদের জন্য এই সংকট নিছক বিরক্তিকর নয়, বরং প্রাত্যহিক জীবিকার সঙ্গে সরাসরি সংযুক্ত একটা বাস্তব বাধা।
সমাধানের পথ কোথায়
বাংলাদেশ ব্যাংক ডিজিটাল লেনদেন বাড়ানোর মাধ্যমে খুচরা নোটের চাহিদা কমানোর একটা কৌশল নিয়েছে, যেমন বাংলাকিউআরের মতো উদ্যোগ। এটা দীর্ঘমেয়াদে সহায়ক হতে পারে, কিন্তু এটা মূল সমস্যার সমাধান নয়, কারণ বাংলাদেশের একটা বিশাল অংশ মানুষ এখনো ডিজিটাল অবকাঠামোর বাইরে বা তার নাগালের বাইরে থেকে যান। প্রকৃত সমাধান নির্ভর করে দুটো জায়গায়। এক, কাঁচামাল আমদানির পরিকল্পনা এমনভাবে করা, যাতে বৈদেশিক মুদ্রার হার ও সরবরাহ-শৃঙ্খলের ধাক্কা প্রতিবার নতুন করে সংকট তৈরি না করে; আর দুই, বাংলাদেশ ব্যাংক অর্ডার ১৯৭২-এর ২৮ নম্বর অনুচ্ছেদের বাধ্যবাধকতাকে কাগজে-কলমের আইন না রেখে, ভারতের ক্লিন নোট পলিসির মতো একটা ধারাবাহিক, প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়ায় রূপান্তর করা। যতক্ষণ না এই দুটো কাঠামোগত ব্যবস্থা তৈরি হচ্ছে, ততক্ষণ পকেটে থাকা প্রতিটি পুরোনো নোটই থেকে যাবে একেকটা ছোট অনিশ্চয়তার উৎস; কখনো ব্যাংকের মেশিনে, কখনো বাজারের দোকানে।

