দীর্ঘদিনের গ্যাস সংকটের পর সেপ্টেম্বর মাসে কিছুটা স্বস্তি ফেরার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। আমদানি করা তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) বেশি পরিমাণে পুনঃগ্যাসীকরণ করা সম্ভব হলে দেশের সামগ্রিক গ্যাস সরবরাহ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে।
এর পেছনে বড় ভূমিকা রাখছে বঙ্গোপসাগরে থাকা দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল বা এফএসআরইউর পূর্ণ সক্ষমতায় কার্যক্রম চালানো। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, সেপ্টেম্বর মাসে অন্তত আটটি এলএনজি কার্গো দেশে আসার কথা রয়েছে। এর বেশির ভাগই স্পট মার্কেট এবং স্বল্পমেয়াদি চুক্তির আওতায় সরবরাহ করা হবে।
রাষ্ট্রীয় সংস্থা পেট্রোবাংলার এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানান, সেপ্টেম্বরজুড়ে দুটি এফএসআরইউ থেকে গড়ে প্রতিদিন প্রায় ৭৫০ মিলিয়ন ঘনফুট (এমএমসিএফডি) এলএনজি পুনঃগ্যাসীকরণের লক্ষ্য রয়েছে। দৈনিক সরবরাহ ৭০০ থেকে ৮০০ এমএমসিএফডির মধ্যে থাকতে পারে।
সেপ্টেম্বরে আসছে অন্তত ৮ কার্গো
সেপ্টেম্বরে নিশ্চিত হওয়া আটটি এলএনজি কার্গোর মধ্যে দুটি সরবরাহ করবে গানভর সিঙ্গাপুর পিটিই লিমিটেড। এগুলো পেট্রোবাংলার সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় আসবে।
আরামকো ট্রেডিং সিঙ্গাপুর পিটিই লিমিটেড সরবরাহ করবে আরও দুটি কার্গো। এর একটি স্পট মার্কেট থেকে এবং অন্যটি স্বল্পমেয়াদি চুক্তির আওতায় আসবে।
এ ছাড়া পোস্কো ইন্টারন্যাশনাল করপোরেশন এবং টোটালএনার্জিস গ্যাস অ্যান্ড পাওয়ার লিমিটেড স্পট মার্কেট থেকে দুটি করে এলএনজি কার্গো সরবরাহ করবে।
সরকারের সরাসরি ক্রয় পদ্ধতি বা ডিপিএমের আওতায় চুক্তিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানগুলো নির্ধারিত প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী এলএনজি সরবরাহ করতে পারলে সেপ্টেম্বরের মোট পুনঃগ্যাসীকরণ আরও বাড়তে পারে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা।
আগস্টের সংকট কাটিয়ে ঘুরে দাঁড়াচ্ছে সরবরাহ
আগস্টে এলএনজি সরবরাহে বড় ধাক্কা খেয়েছিল বাংলাদেশ। একপর্যায়ে দেশে এলএনজি পুনঃগ্যাসীকরণ নেমে আসে প্রতিদিন মাত্র প্রায় ১৯০ মিলিয়ন ঘনফুটে।
এর অন্যতম কারণ ছিল যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক এক্সিলারেট এনার্জির এফএসআরইউতে দুর্ঘটনা। বঙ্গোপসাগরে থাকা এই ভাসমান টার্মিনালটি জুলাইয়ের শেষ দিক থেকে আগস্টের মাঝামাঝি পর্যন্ত অন্তত ১৫ দিন কার্যত অচল ছিল।
এর ফলে অন্তত দুটি স্পট এলএনজি কার্গোর সরবরাহ ব্যাহত হয়। গানভর ও টোটালএনার্জিসের কার্গো দুটি দুর্ঘটনাকবলিত এফএসআরইউতে পৌঁছাতে না পেরে বঙ্গোপসাগরে কয়েক সপ্তাহ আটকে ছিল।
পরিস্থিতি আরও জটিল করে তোলে বৈরী আবহাওয়া, আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজির সরবরাহ সংকট এবং একটি ত্রুটিপূর্ণ এলএনজি কার্গো।
এক্সিলারেটের এফএসআরইউ ‘এক্সিলেন্স’ ৬ আগস্ট আংশিকভাবে আবার চালু হলেও আগস্টের প্রথম সপ্তাহের পর বঙ্গোপসাগরে খারাপ আবহাওয়ার কারণে নিরাপত্তার স্বার্থে এলএনজি বহনকারী জাহাজগুলোকে টার্মিনালের কাছ থেকে দূরে রাখতে হয়।
মাঝ আগস্টে আরামকো ট্রেডিংয়ের সরবরাহ করা ‘আল হামরা’ নামের একটি মস-টাইপ এলএনজি কার্গো থেকে জাহাজ-থেকে-জাহাজ পদ্ধতিতে গ্যাস নেওয়ার বিষয়েও নিরাপত্তাজনিত আপত্তি দেখা দেয়। ফলে এক্সিলারেটের এফএসআরইউতে থাকা এলএনজি শেষ হয়ে যায়।
গ্যাস সংকটে ভুগেছে শিল্প, বিদ্যুৎ ও সাধারণ মানুষ
এলএনজি পুনঃগ্যাসীকরণ কমে যাওয়ার সরাসরি প্রভাব পড়ে জাতীয় গ্যাস সরবরাহে। পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকার শিল্পকারখানার পরিবর্তে বিদ্যুৎকেন্দ্রে কিছু অতিরিক্ত গ্যাস দেওয়ার উদ্যোগ নেয়।
এর ফলে বিভিন্ন এলাকায় গ্যাসের চাপ কমে যায়। শিল্পকারখানার উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনও কমে যায়।
দেশজুড়ে সিএনজি স্টেশনগুলোতে গাড়ির দীর্ঘ সারিও নিয়মিত দৃশ্য হয়ে ওঠে। ঢাকাসহ বিভিন্ন এলাকায় বাসাবাড়িতে রান্নার গ্যাসের চাপ এতটাই কমে যায় যে অনেক পরিবার দিনের বড় একটি সময় গ্যাস না পাওয়ার সমস্যায় পড়ে।
কিছু এলাকায় সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঘটনাও ঘটে। শিল্পাঞ্চলের অনেক কারখানাকে কম চাপের কারণে উৎপাদন কমিয়ে আনতে হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
আন্তর্জাতিক সংকটেও চাপে ছিল এলএনজি সরবরাহ
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ এবং হরমুজ প্রণালিতে সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ার কারণে বাংলাদেশও এলএনজি সংগ্রহে সমস্যায় পড়ে। এর সঙ্গে জুলাইয়ের ২১ তারিখে দেশের দুটি এফএসআরইউর একটির কার্যক্রম হঠাৎ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সংকট আরও তীব্র হয়।
ডিপিএম পদ্ধতিতে চুক্তি পাওয়া কয়েকটি প্রতিষ্ঠান নির্ধারিত এলএনজি সরবরাহ করতে না পারায় পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকারকে অল্প সময়ের মধ্যে স্পট মার্কেট থেকে অতিরিক্ত কার্গো কিনতে হয়।
তবে সেপ্টেম্বরে পরিস্থিতি সামলানোর জন্য প্রস্তুতি আগের তুলনায় ভালো বলে মনে করছেন রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি লিমিটেডের (আরপিজিসিএল) এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা।
তিনি বলেন, দুর্ঘটনা, অক্ষম ডিপিএম ঠিকাদার এবং ত্রুটিপূর্ণ এলএনজি কার্গোর মতো অপ্রত্যাশিত সমস্যার অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে সেপ্টেম্বর মাসে গড়ে ৭৫০ এমএমসিএফডি এলএনজি পুনঃগ্যাসীকরণ বজায় রাখার প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।
স্পট মার্কেটের বাড়তি দাম বড় চ্যালেঞ্জ
তবে এলএনজি সরবরাহ বাড়ানোর পথে সবচেয়ে বড় সমস্যাগুলোর একটি হয়ে দাঁড়িয়েছে আন্তর্জাতিক স্পট মার্কেটের উচ্চ দাম। বেশি দামে এলএনজি কিনলে সরকারের ওপর আমদানি ব্যয়ের চাপ বাড়বে।
তারপরও সেপ্টেম্বরের তুলনামূলক শীতল আবহাওয়া দেশের মোট জ্বালানি চাহিদা কিছুটা কমিয়ে দিতে পারে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা। এতে সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর চাপও কিছুটা কমতে পারে।
পেট্রোবাংলার সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২৮ আগস্ট দেশে মোট প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহ ছিল প্রতিদিন প্রায় ২ হাজার ৩৬০ মিলিয়ন ঘনফুট। বিপরীতে চাহিদা ছিল প্রায় ৪ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট।
অর্থাৎ সরবরাহ ও চাহিদার মধ্যে এখনও বড় ব্যবধান রয়েছে। ফলে সেপ্টেম্বরের বাড়তি এলএনজি সরবরাহ গ্যাস সংকট পুরোপুরি দূর না করলেও শিল্প, বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সাধারণ গ্রাহকদের জন্য অন্তত কিছুটা স্বস্তি আনতে পারে।

