সরকার দেশের ১ হাজার ৪৯৮টি পর্যটন স্পট চিহ্নিত করে একটি সমন্বিত ট্যুরিজম মাস্টার প্ল্যান চূড়ান্ত করছে। পাশাপাশি পরিবেশবান্ধব ও টেকসই পর্যটন উন্নয়নের লক্ষ্যে ‘জাতীয় পর্যটন নীতি ২০২৬’-এর খসড়াও প্রণয়ন করা হচ্ছে। বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত সম্প্রতি জাতীয় সংসদে এক প্রশ্নোত্তর পর্বে এই তথ্য জানিয়েছেন।
পর্যটন খাতকে ঘিরে সরকারের এই উচ্চাকাঙ্ক্ষা নতুন নয়। ২০২৩ সালেই বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ড (বিটিবি) ২০৪১ সালের মধ্যে বার্ষিক ৫৫.৭ লাখ বিদেশি পর্যটক আকর্ষণ এবং এই খাতে ২১.৯৪ মিলিয়ন কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে একটি খসড়া মাস্টার প্ল্যান চূড়ান্ত করেছিল। সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে ১.০৮ বিলিয়ন ডলারের পাবলিক ও প্রাইভেট বিনিয়োগের প্রয়োজন হবে। কিন্তু গত কয়েক বছর ধরে নানা জটিলতায় আটকে থাকা এই পরিকল্পনা অবশেষে বাস্তবায়নের পথে এগোচ্ছে। এই মাস্টার প্ল্যানে ১০টি পর্যটন ক্লাস্টার তৈরি, ৫৩টি ক্লাস্টার চিহ্নিতকরণ এবং ১৪টি থিমের ওপর ভিত্তি করে পর্যটন পণ্য উন্নয়নের প্রস্তাব রয়েছে।
পর্যটন খাতের বর্তমান অবস্থা কিন্তু আশাব্যঞ্জক নয়। জিডিপিতে এই খাতের অবদান বর্তমানে প্রায় ৩ শতাংশ, যা প্রায় ১০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের সমান। তবে সরকারি লক্ষ্য এই অবদান ৬ থেকে ৭ শতাংশে উন্নীত করা। পর্যটনমন্ত্রী আফরোজা খানম সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে বলেছেন, ‘আমরা যেন সোনার খনির ওপর বসে আছি, অথচ চামচ দিয়ে খনন করছি’। এই একটি বাক্যই পর্যটন খাতের অপরিসীম সম্ভাবনা ও তার অব্যবহৃত অবস্থার মধ্যে ফারাকটি স্পষ্ট করে দেয়।
প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে তুলনা করলে এই চিত্র আরও পরিষ্কার হয়। ২০২৩ সালে বাংলাদেশে বিদেশি পর্যটক এসেছিলেন মাত্র ৫.২২ লাখ। অথচ একই বছর ভারত পেয়েছে ৬১.৯ লাখ, শ্রীলঙ্কা ৭.১৯ লাখ এবং নেপাল ৬.১৪ লাখ পর্যটক। দুর্বল পর্যটন অবকাঠামো, জটিল ভিসা নীতি, পর্যাপ্ত সরাসরি ফ্লাইটের অভাব, এই সব কারণেই বাংলাদেশ পিছিয়ে রয়েছে।
এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় মাস্টার প্ল্যানে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে হেলিপোর্ট নির্মাণ, পরিবহন নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ, আবাসন সুবিধা বৃদ্ধি, কার্যকর মার্কেটিং ক্যাম্পেইন, সেবার মানোন্নয়ন এবং পর্যটকদের জন্য নিরাপদ ও অতিথিপরায়ণ পরিবেশ তৈরি। পাশাপাশি ই-ভিসা ব্যবস্থা চালুর কাজও শেষ পর্যায়ে রয়েছে। ট্যাঙ্গুয়ার হাওর, নিজুম দ্বীপ, পাহাড়পুরের সোমপুর মহাবিহার, সুন্দরবনের শরণখোলা এবং মাওয়ায় পাঁচটি পর্যটন উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজ চলছে।
পর্যটন খাতের তথ্যগত ফাঁক দূর করতে ‘ট্যুরিজম স্যাটেলাইট অ্যাকাউন্ট’ (টিএসএ) প্রস্তুতের কাজও চলছে। এই উদ্যোগের মাধ্যমে পর্যটন খাতের প্রকৃত অর্থনৈতিক অবদান পরিমাপ করা সম্ভব হবে, যা আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
শুধু পরিকল্পনা নয়, বাস্তবায়নও গুরুত্ব পাচ্ছে। পর্যটন স্পটগুলোর উন্নয়নে ‘কমিউনিটি বেজড ট্যুরিজম’ মডেল গ্রহণ করা হচ্ছে, যাতে স্থানীয় জনগোষ্ঠী পর্যটনের সুফল পায়। পর্যটকদের নিরাপত্তায় ট্যুরিস্ট পুলিশের জনবল বৃদ্ধির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সাংস্কৃতিক পর্যটন প্রচারে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয় এবং সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষরের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক পর্যটন গন্তব্য হিসেবে প্রচারে ‘বিউটিফুল বাংলাদেশ’ ব্র্যান্ডিং উদ্যোগ চালু করা হয়েছে।
পর্যটন খাতের সম্ভাবনা কিন্তু শুধু বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে সীমাবদ্ধ নয়। এই খাতে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় ২৮ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান এবং প্রায় ৫০ লাখ মানুষ ভ্রমণ ও আতিথেয়তা খাতে নিয়োজিত। পর্যটন খাতের উন্নয়ন মানে গ্রামীণ অর্থনীতির চাঙা হওয়া, স্থানীয় হস্তশিল্প ও সংস্কৃতির পুনর্জাগরণ, এবং নতুন কর্মসংস্থানের সৃষ্টি।
তবে এই স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথ মসৃণ নয়। দীর্ঘদিন ধরে পরিকল্পনা আটকে থাকার কারণে বেসরকারি খাতে বিনিয়োগের আগ্রহ কম ছিল। পর্যটন অবকাঠামো উন্নয়নে প্রায় ১০৫.৫ মিলিয়ন ডলার সরকারি বিনিয়োগের প্রয়োজন, কিন্তু বাজেটের সীমাবদ্ধতা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। এ ছাড়া ভিসা নীতির জটিলতা, নিরাপত্তা উদ্বেগ, এবং আন্তর্জাতিক ফ্লাইটের অপ্রতুলতা এখনো বড় বাধা।
পর্যটন খাতকে ঘিরে সরকারের এই উদ্যোগগুলো সময়োপযোগী। বিশেষ করে কমিউনিটি-ভিত্তিক পর্যটন, ট্যুরিজম স্যাটেলাইট অ্যাকাউন্ট এবং ‘বিউটিফুল বাংলাদেশ’ ব্র্যান্ডিং, এই তিনটি উদ্যোগ দীর্ঘমেয়াদি টেকসই উন্নয়নের ভিত্তি তৈরি করতে পারে। তবে পরিকল্পনা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনই গুরুত্বপূর্ণ তার বাস্তবায়ন। ২০১৬ সালের পর থেকে পর্যটন মাস্টার প্ল্যান নিয়ে আলোচনা চললেও তা বাস্তবায়নে ধীরগতি ছিল। এবার যেন সেই ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি না হয়, সেদিকে নজর দিতে হবে। পর্যটন খাতের বিকাশ মানে শুধু অর্থনৈতিক লাভ নয়, এটি বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ও আন্তর্জাতিক অবস্থানকেও শক্তিশালী করবে। এই ‘সোনার খনি’ থেকে পূর্ণ মাত্রায় সম্পদ আহরণের সময় এখনই।

