দেশের শিল্প খাতে জ্বালানি সংকট এখন শুধু উৎপাদন ব্যাহত করছে না, বাড়িয়ে দিচ্ছে ব্যবসার খরচও। গ্যাসের কম চাপ, বিদ্যুতের অনিয়মিত সরবরাহ এবং লোডশেডিং সামাল দিতে শিল্পকারখানাগুলোকে বিকল্প জ্বালানির ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। এতে উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে, যার প্রভাব শেষ পর্যন্ত ভোক্তাদের কিনতে হচ্ছে এমন পণ্যের দামেও পড়তে পারে।
দেশের অন্যতম প্রধান রপ্তানি খাত তৈরি পোশাকের পাশাপাশি ইস্পাত, সিমেন্ট, সিরামিক ও প্রক্রিয়াজাত খাদ্যশিল্পের উদ্যোক্তারাও জ্বালানি পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বিগ্ন। গাজীপুর, সাভার, নারায়ণগঞ্জ, চট্টগ্রাম ও ময়মনসিংহের মতো শিল্পাঞ্চলে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
শিল্প উদ্যোক্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বিদ্যুৎ সরবরাহে হঠাৎ ভোল্টেজ কমে যাওয়া বা লোডশেডিংয়ের কারণে কারখানার আধুনিক ও সংবেদনশীল যন্ত্রপাতি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। অন্যদিকে, গ্যাসের চাপ কম থাকায় অনেক কারখানা পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন চালাতে পারছে না।
পরিস্থিতি সামাল দিতে কেউ ডিজেল, কেউ অন্য ব্যয়বহুল বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার করছেন। এতে সরাসরি উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে টেক্সটাইল ও ডাইং কারখানায় গ্যাসের চাপ কম থাকায় উৎপাদন প্রক্রিয়া ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি কাঁচামাল ও তৈরি পণ্য নষ্ট হওয়ার ঝুঁকিও বাড়ছে।
সমস্যার আরেকটি দিক হলো, উৎপাদন কমলেও কারখানার নিয়মিত ব্যয় কমছে না। শ্রমিকদের বেতন, কারখানা ও ভবনের ভাড়া, ব্যাংক ঋণের কিস্তিসহ অন্যান্য নির্দিষ্ট খরচ আগের মতোই বহন করতে হচ্ছে উদ্যোক্তাদের। ফলে উৎপাদিত প্রতিটি পণ্যের গড় খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাচ্ছে।
এ পরিস্থিতি বাংলাদেশের রপ্তানি সক্ষমতার ওপরও চাপ তৈরি করছে। উদ্যোক্তাদের আশঙ্কা, উৎপাদন ব্যয় বেড়ে গেলে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের পোশাকসহ অন্যান্য পণ্য প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়তে পারে। একই সঙ্গে সময়মতো পণ্য সরবরাহ করতে না পারায় বিদেশি ক্রেতাদের কাছ থেকে ভবিষ্যতে অর্ডার পাওয়ার ক্ষেত্রেও ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) নির্বাহী সভাপতি ও বাংলাদেশ এমপ্লয়ার্স ফেডারেশনের সভাপতি ফজলে শামীম এহসান বলেন, চলমান গ্যাস সংকটের কারণে বিদ্যমান রপ্তানি আদেশও নির্ধারিত সময়ে পাঠানো কঠিন হয়ে পড়েছে।
গ্যাস সংকটের তাৎক্ষণিক ক্ষতির পাশাপাশি ভবিষ্যৎ রপ্তানি আদেশ নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে। কারখানায় উৎপাদন কমে গেলেও শ্রমিকের বেতন, ঋণের কিস্তি ও অন্যান্য পরিচালন ব্যয় চালিয়ে যেতে হচ্ছে। ফলে দীর্ঘস্থায়ী সংকট উদ্যোক্তাদের আর্থিক চাপ আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।
এ অবস্থায় সরকারকে বেশ কিছু পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে বিকেএমইএ। সংগঠনটির দাবি, জুন ও জুলাই মাসের গ্যাস ও বিদ্যুৎ বিল আগামী ১২ মাসে কিস্তিতে পরিশোধের সুযোগ দিতে হবে। শুধু বিল পরিশোধে ব্যর্থ হওয়ার কারণে সংকটকালীন সময়ে কোনো কারখানার গ্যাস বা বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন না করারও দাবি জানানো হয়েছে।
এ ছাড়া দেশের গ্যাস পরিস্থিতি সম্পর্কে সরকার বা পেট্রোবাংলার পক্ষ থেকে প্রতি সপ্তাহে নিয়মিত ব্রিফিং করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। অবৈধ গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার পাশাপাশি গণপরিবহন ছাড়া অন্যান্য খাতে সিএনজির পরিবর্তে এলপিজি ব্যবহারে উৎসাহ দেওয়ার কথাও বলেছে সংগঠনটি।
জ্বালানি সংকটের কারণে যেসব প্রতিষ্ঠান সময়মতো ঋণের কিস্তি পরিশোধ করতে পারবে না, তাদের ক্ষেত্রে অন্তত ছয় মাস খেলাপি বা শ্রেণীকৃত ঋণ হিসেবে বিবেচনা না করার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে অনুরোধ জানিয়েছে বিকেএমইএ।
শিল্প উদ্যোক্তাদের মতে, উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার কারণে আয় কমে গেলে একই সময়ে ঋণের কিস্তি পরিশোধের চাপ বহন করা অনেক প্রতিষ্ঠানের জন্য কঠিন হয়ে পড়বে। তাই সংকটকালীন সময়ে ব্যাংকঋণের ক্ষেত্রে বিশেষ সুবিধা প্রয়োজন।
শুধু তাৎক্ষণিক সংকট মোকাবিলা নয়, ভবিষ্যতের জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়েও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার প্রয়োজন বলে মনে করছেন শিল্প উদ্যোক্তারা।
ফজলে শামীম এহসান ভবিষ্যতে গ্যাসের আমদানিনির্ভরতা বিবেচনায় স্থলভিত্তিক এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। একই সঙ্গে শিল্প খাতকে গ্যাসনির্ভরতা থেকে ধীরে ধীরে বের করে বিকল্প জ্বালানি, সৌরবিদ্যুৎ কিংবা অন্য কোনো উৎসে নেওয়া হবে কি না, সে বিষয়ে সরকারের স্পষ্ট নীতিগত সিদ্ধান্তের প্রয়োজন রয়েছে।
কারণ, বর্তমান জ্বালানি সংকট শুধু কারখানার উৎপাদন কমাচ্ছে না—এটি বাড়িয়ে দিচ্ছে উৎপাদন ব্যয়, চাপ তৈরি করছে রপ্তানিতে এবং শেষ পর্যন্ত দেশের বাজারে পণ্যের দাম বাড়ার ঝুঁকিও তৈরি করছে।

