দেশের চলমান গ্যাস সংকট মোকাবিলায় স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি আমদানির ওপর নির্ভরতা বাড়ছে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়িয়ে তুলনামূলক কম দামে জ্বালানি কেনার সুযোগ তৈরি করতে অনুমোদিত এলএনজি সরবরাহকারীর তালিকা বড় করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।
বর্তমানে স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি কেনার জন্য বাংলাদেশে তালিকাভুক্ত আন্তর্জাতিক সরবরাহকারী রয়েছে ২৭টি। তবে তাদের মধ্যে নিয়মিত দরপত্রে অংশ নেয় মাত্র কয়েকটি প্রতিষ্ঠান। সরবরাহকারীর সংখ্যা বাড়ানো গেলে দরপত্রে অংশগ্রহণ বাড়বে এবং এলএনজি কেনার খরচও কমতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান পেট্রোবাংলার পরিচালক (অর্থ) এ কে এম মিজানুর রহমান জানান, স্পট ভিত্তিতে এলএনজি কেনার জন্য সম্ভাব্য নতুন সরবরাহকারীদের তালিকাভুক্ত করতে আবেদন আহ্বান করা হয়েছে। আগামী ১৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত আবেদন জমা দেওয়া যাবে।
বর্তমানে পেট্রোবাংলার সম্পূর্ণ মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি লিমিটেড (আরপিজিসিএল) তালিকাভুক্ত ২৭টি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকেই স্পট এলএনজি কেনার জন্য দরপত্র আহ্বান করে। তবে নিয়মিতভাবে দরপত্রে অংশ নেয় প্রায় ছয়টি প্রতিষ্ঠান।
এর মধ্যে রয়েছে আরামকো ট্রেডিং সিঙ্গাপুর, বিপি সিঙ্গাপুর, টোটালএনার্জিস গ্যাস অ্যান্ড পাওয়ার, গানভর সিঙ্গাপুর, পসকো ইন্টারন্যাশনাল করপোরেশন ও ভিটল এশিয়া।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, সরবরাহকারীর তালিকা বড় করা হলে দরপত্রে প্রতিযোগিতা বাড়বে। এতে জরুরি ভিত্তিতে এলএনজি সংগ্রহের সুযোগ যেমন বাড়বে, তেমনি আন্তর্জাতিক বাজারের দামের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে তুলনামূলক ভালো দামে কার্গো কেনার সম্ভাবনাও তৈরি হবে।
দেশে গ্যাসের চাহিদা মেটাতে সাম্প্রতিক সময়ে স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি কেনা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়েছে পেট্রোবাংলা। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ এবং হরমুজ প্রণালিতে সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ায় দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় এলএনজি সরবরাহ কমে গেছে। ফলে ঘাটতি পূরণে স্পট মার্কেটের দিকে ঝুঁকতে হয়েছে বাংলাদেশকে।
চলতি বছর এখন পর্যন্ত স্পট মার্কেট থেকে ৪৭টি এলএনজি কার্গো কিনেছে বাংলাদেশ। এর মধ্যে ৪৫টি কার্গোই কেনা হয়েছে হরমুজ প্রণালিতে সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার পর। এর আগের বছর ২০২৫ সালে স্পট মার্কেট থেকে মোট ৪৯টি কার্গো আমদানি করা হয়েছিল।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ এবং হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে বিঘ্নের কারণে চুক্তিভিত্তিক এলএনজি সরবরাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। পাশাপাশি সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে নির্ধারিত কয়েকটি এলএনজি কার্গো সময়মতো না পাওয়ায় দেশের গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থায় হঠাৎ বড় ঘাটতি তৈরি হয়।
এই পরিস্থিতিতে আগস্টের শেষ দিকে জরুরি চাহিদা মেটাতে খুব অল্প সময়ের মধ্যে স্পট মার্কেট থেকে কয়েকটি এলএনজি কার্গো কেনার উদ্যোগ নেয় সরকার।
বর্তমানে বাংলাদেশে প্রতিদিন মোট প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহ হচ্ছে প্রায় ২ হাজার ৩৩৬ মিলিয়ন ঘনফুট। এর মধ্যে পুনঃগ্যাসীকৃত এলএনজি থেকে আসছে প্রায় ৭১১ মিলিয়ন ঘনফুট।
পেট্রোবাংলা ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বর থেকে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় আন্তর্জাতিক বাজার থেকে এলএনজি আমদানি শুরু করে। এরপর ২০২০ সালের সেপ্টেম্বর থেকে স্পট মার্কেট থেকেও এলএনজি কেনা শুরু হয়।
স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি সংগ্রহের জন্য এর আগে আগ্রহপত্র আহ্বান করে ২৭টি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানকে সরবরাহকারী হিসেবে বাছাই করেছিল বাংলাদেশ। এসব প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আরপিজিসিএলের মাস্টার সেলস এগ্রিমেন্ট (এমএসএ) রয়েছে।
বাংলাদেশ সাধারণত স্পট মার্কেট থেকে ১ হাজার ২৫ থেকে ১ হাজার ১০০ ব্রিটিশ থার্মাল ইউনিট (বিটিইউ) প্রতি স্ট্যান্ডার্ড ঘনফুট গ্রস হিটিং ভ্যালুর এলএনজি আমদানি করে। দেশে পৌঁছানোর পর এই এলএনজি স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত সালফারমুক্ত প্রাকৃতিক গ্যাসের সঙ্গে মিশিয়ে ব্যবহারকারীদের কাছে সরবরাহ করা হয়।
স্পট সরবরাহকারীরা সাধারণত ডেলিভার্ড এক্স-শিপ (ডিইএস) ভিত্তিতে এলএনজি সরবরাহ করে। এসব কার্গো বহনকারী জাহাজের ধারণক্ষমতা প্রায় ১ লাখ ২৫ হাজার থেকে ২ লাখ ২০ হাজার ঘনমিটার পর্যন্ত হয়ে থাকে।
গ্যাস সংকট এবং আন্তর্জাতিক বাজারের অনিশ্চয়তার মধ্যে সরবরাহকারী বাড়ানোর এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য হলো এলএনজি সংগ্রহের সুযোগ বাড়ানো, দরপত্রে প্রতিযোগিতা সৃষ্টি করা এবং শেষ পর্যন্ত দেশের জন্য জ্বালানি কেনার ব্যয় নিয়ন্ত্রণে রাখা।

