দেশের ইস্পাত শিল্প এখন একসঙ্গে দুই ধরনের চাপের মুখে পড়েছে। একদিকে বেড়েছে বিদ্যুৎ, গ্যাস, জ্বালানি ও পরিবহন ব্যয়, অন্যদিকে নির্মাণ খাতের দুর্বল কর্মকাণ্ডের কারণে কমেছে ইস্পাতের চাহিদা। ফলে উৎপাদন খরচ বাড়লেও সেই বাড়তি ব্যয় পুরোপুরি ক্রেতার ওপর চাপিয়ে দিতে পারছেন না নির্মাতারা। বিক্রি ধরে রাখতে অনেক প্রতিষ্ঠানকে দিতে হচ্ছে অতিরিক্ত ছাড়।
ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) তথ্য অনুযায়ী, নির্মাণকাজে বহুল ব্যবহৃত ৬০ গ্রেডের মাইল্ড স্টিল (এমএস) রডের দাম এখন প্রতি টনে ৯২ হাজার ৫০০ থেকে ৯৪ হাজার ৫০০ টাকা। এক মাস আগেও এই দাম ছিল ৮৮ হাজার থেকে ৯২ হাজার টাকা।
তবে বাজারে ঘোষিত দাম বাড়লেও প্রকৃত বিক্রয়মূল্যে তার পুরো প্রতিফলন ঘটছে না। অর্ডার ধরে রাখতে নির্মাতারা বিভিন্ন ধরনের ছাড় দেওয়ায় বাড়তি দামের বড় অংশই কার্যত তাদের মুনাফা থেকে সমন্বয় করতে হচ্ছে।
গত জুনে শিল্প খাতের গ্রাহকদের জন্য বিদ্যুতের দাম ১৭ দশমিক ৮৬ শতাংশ বাড়ানোর পর পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়েছে। ইস্পাত উৎপাদনকারীরা বলছেন, বিদ্যুতের বাড়তি দাম, গ্যাসের সংকট, ঘন ঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাট এবং জ্বালানি ও পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধির কারণে উৎপাদন খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
বাংলাদেশ স্টিল মিল অ্যাসোসিয়েশনের (বিএসএমএ) মহাসচিব সুমন চৌধুরী বলেন, বিদ্যুতের দাম বাড়ার কারণে ইস্পাত উৎপাদনকারীদের প্রতি টনে প্রায় ২ হাজার ৫০০ থেকে ৩ হাজার টাকা পর্যন্ত দাম বাড়াতে হয়েছে। কিন্তু পর্যাপ্ত গ্যাস না পাওয়া এবং ঘন ঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে উৎপাদন চালানো ক্রমেই কঠিন হয়ে পড়ছে।
বিএসএমএর সভাপতি মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম জানান, শুধু বিদ্যুতের দাম বাড়ার কারণেই প্রতি টন ইস্পাত উৎপাদনে খরচ প্রায় ১ হাজার ৭৮৫ টাকা বেড়েছে। এর সঙ্গে ভ্যাট, বন্দর ব্যয়, জ্বালানি, পরিবহনসহ অন্যান্য খরচ যোগ করলে অতিরিক্ত ব্যয়ের পরিমাণ প্রায় ৩ হাজার ৫৬০ টাকা পর্যন্ত হতে পারে।
তিনি বলেন, বাড়তি খরচ সামাল দিতে দাম বাড়ানো হলেও ক্রেতারা সেই বাড়তি দাম সহজে গ্রহণ করেননি। ফলে বেশি দামে পণ্য বিক্রি না হওয়ায় বাজারে টিকে থাকতে উৎপাদনকারীদের বাড়তি খরচের একটি অংশ নিজেদেরই বহন করতে হচ্ছে।
আনোয়ার গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের চেয়ারম্যান এবং আনোয়ার ইস্পাতের উদ্যোক্তা মনোয়ার হোসেন বলেন, বর্তমানে বাজারে মূল সমস্যা হলো চাহিদা তৈরি না হওয়া। বাজারে প্রায় কোনো চাহিদাই নেই এবং অত্যন্ত কঠিন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে পণ্য বিক্রি করতে হচ্ছে।
তার হিসাবে, বিদ্যুতের দাম বাড়ার পর ইস্পাতের দাম প্রতি টনে প্রায় ১ হাজার টাকা বেড়েছে। কিন্তু বিক্রি নিশ্চিত করতে নির্মাতারা কার্যত প্রায় ১ হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত ছাড় দিচ্ছেন।
মনোয়ার হোসেন বলেন, বাজারে দাম বাড়ার বিষয়টি সবাই দেখতে পাচ্ছে, কিন্তু প্রতিষ্ঠানগুলো যে অভ্যন্তরীণভাবে ছাড় দিচ্ছে, সেটি বাইরে থেকে বোঝা যাচ্ছে না।
তিনি জানান, বর্তমানে বাজারের কার্যক্রম স্বাভাবিক সময়ের মাত্র ৫০ থেকে ৬০ শতাংশে নেমে এসেছে। এতে বাজারে ঘোষিত মূল্য আর প্রকৃত বিক্রয়মূল্যের মধ্যে বড় ধরনের পার্থক্য তৈরি হয়েছে।
দুর্বল চাহিদার পাশাপাশি গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকটও ইস্পাত কারখানাগুলোর উৎপাদন সক্ষমতাকে সীমিত করে দিচ্ছে। বিএসএমএর তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে প্রায় ৪০টি আধুনিক ইস্পাত কারখানা এবং ১৫০টির বেশি রি-রোলিং মিল রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের সম্মিলিত বার্ষিক উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ১ কোটি ২২ লাখ টন। বিপরীতে দেশে বছরে ইস্পাতের চাহিদা প্রায় ৫০ লাখ টন।
বিএসএমএর মহাসচিব সুমন চৌধুরী জানান, লোডশেডিং ও গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় কিছু কারখানা তাদের সক্ষমতার মাত্র ৫০ থেকে ৬০ শতাংশে উৎপাদন করছে। কখনো কখনো গ্যাসের চাপ সাময়িকভাবে বাড়লেও কিছু সময় পর আবার কমে যায়। এতে টানা উৎপাদন চালিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে।
তিনি বলেন, তার একটি কারখানায় ১৩ দিন ধরে গ্যাসের বার্নার বন্ধ রয়েছে। একই কারণে ফার্নেসও চালু করা যাচ্ছে না।
বিশেষ করে যেসব ইস্পাত কারখানা উৎপাদনের জন্য রিহিটিং ফার্নেসের ওপর নির্ভরশীল, তাদের জন্য গ্যাস সংকট বড় ধরনের সমস্যা তৈরি করছে। গলিত ইস্পাত ঢালাইয়ের আগে ল্যাডল বা পাত্রকে প্রায় ৬০০ থেকে ৭০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় গরম করে নিতে হয়। পর্যাপ্ত তাপ না থাকলে ঢালাইয়ের সময় গলিত ইস্পাতের একটি অংশ জমে যেতে পারে। এতে বড় ধরনের অপচয় হয়।
সুমন চৌধুরী বলেন, একটি ল্যাডলে ২০ টন উপকরণ নেওয়া হলে তা জমে গিয়ে প্রায় ৩ থেকে ৪ টন পর্যন্ত নষ্ট হতে পারে। গ্যাস সংকটের কারণে বর্তমানে এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হচ্ছে অনেক কারখানাকে।
যেসব কারখানায় সরাসরি হট-রোলিংয়ের ব্যবস্থা রয়েছে, তারা তুলনামূলকভাবে কিছুটা সুবিধাজনক অবস্থানে আছে। কারণ এসব কারখানায় রিহিটিং ফার্নেসের ওপর নির্ভর না করেও রড উৎপাদন করা যায়। তবে এসব কারখানার উৎপাদনও বর্তমানে সক্ষমতার প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে।
বিদ্যুৎ বিভ্রাটও ইস্পাত শিল্পের জন্য বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। মনোয়ার হোসেন বলেন, বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার কারণে কারখানাগুলোকে অনেক ধরনের ‘অদৃশ্য খরচ’ বহন করতে হচ্ছে।
তার কারখানায় হঠাৎ বিদ্যুৎ চলে গেলে উৎপাদনরত উপকরণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে তাৎক্ষণিকভাবে প্রায় ৬০ হাজার টাকা পর্যন্ত ক্ষতি হতে পারে। ইস্পাত শিল্প মূলধননির্ভর এবং এখানে উৎপাদন প্রক্রিয়া নিরবচ্ছিন্ন রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় এ ধরনের ক্ষতি সহজে সামাল দেওয়া সম্ভব হয় না।
সব মিলিয়ে ইস্পাত নির্মাতারা এখন এক কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে পড়েছেন। একদিকে উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে, অন্যদিকে বাজারে ক্রেতা কমে যাওয়ায় দাম বাড়িয়ে সেই ব্যয় সমন্বয় করা যাচ্ছে না। ফলে বিক্রি ধরে রাখতে ছাড় দিতে হচ্ছে, আর উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় বাড়ছে ক্ষতির পরিমাণ।
মনোয়ার হোসেন সরকারের প্রতি বেসরকারি খাতের চাহিদা বাড়াতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তার মতে, বেসরকারি বিনিয়োগ ও ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ড বাড়লে শুধু ইস্পাত শিল্পই নয়, নির্মাণ খাতের পাশাপাশি এর সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন ব্যবসা ও সেবাখাতও উপকৃত হবে।

