ঢাকার মেট্রোরেল প্রকল্পে নির্মাণ ব্যয় ব্যাপকভাবে বেড়ে যাওয়ার পাশাপাশি এবার জাপান থেকে নেওয়া ঋণের সুদও বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এমআরটি লাইন-১ ও এমআরটি লাইন-৫ নর্দার্ন—এই দুই মেগা প্রকল্পের সংশোধিত প্রস্তাব বিশ্লেষণে দেখা গেছে, জাপানের আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা জাইকার ঋণের সুদ আগের ০ দশমিক ৬ শতাংশের মতো সহজ শর্তের হার থেকে বেড়ে ৩ দশমিক ৫ শতাংশ বা তারও বেশি হতে পারে।
গত ৩০ আগস্ট পরিকল্পনা কমিশনে অনুষ্ঠিত প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভার কার্যবিবরণীতে বিষয়টি উঠে এসেছে। এতে দেখা যায়, ২০১৯ সালে জাপানের সঙ্গে প্রাথমিকভাবে ১৩ হাজার ৬২৫ কোটি ৭৭ লাখ টাকার ঋণচুক্তি হয়েছিল, যার সুদের হার ছিল ০ দশমিক ৬ থেকে ০ দশমিক ৯ শতাংশ। তবে প্রকল্পের বাকি অর্থায়নের ক্ষেত্রে তখন কোনো নির্দিষ্ট ঋণের শর্ত চূড়ান্ত হয়নি।
ঢাকার বিমানবন্দর থেকে কমলাপুর পর্যন্ত এমআরটি লাইন-১ দেশের প্রথম ভূগর্ভস্থ মেট্রোরেল প্রকল্প। অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) তথ্য অনুযায়ী, এ প্রকল্পে জাপানি অর্থায়নের পরিমাণ এখন বেড়ে ৮৫ হাজার ৫৩৫ কোটি ৫৫ লাখ টাকায় দাঁড়িয়েছে। তবে অতিরিক্ত এই অর্থায়ন বর্তমান বাজার পরিস্থিতির ঋণের শর্তে সংগ্রহ করতে হবে।
সম্প্রতি জাইকার ঋণের সুদের হার ৩ দশমিক ৬ শতাংশে পৌঁছেছে। আগামী অক্টোবরে তা ৩ দশমিক ৫০ শতাংশে উঠতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। জাইকা বছরে দুইবার ঋণের সুদের হার পর্যালোচনা করে। ফলে আগামী এপ্রিলের পুনর্নির্ধারণে সুদ আরও বাড়ার সম্ভাবনাও রয়েছে।
হেমায়েতপুর থেকে ভাটারা পর্যন্ত এমআরটি লাইন-৫ নর্দার্ন প্রকল্পেও একই ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। প্রকল্পটির জন্য অনুমোদিত ২৯ হাজার ১১৯ কোটি টাকার জাপানি অর্থায়নের মধ্যে মাত্র ১৩ হাজার ৫০০ কোটি টাকার ঋণ ০ দশমিক ৬ শতাংশ সুদে আনুষ্ঠানিকভাবে চুক্তিবদ্ধ হয়েছে।
এ ছাড়া জাপান নীতিগতভাবে আরও ৩৯ হাজার ৮১৪ কোটি ১৮ লাখ টাকা অর্থায়নে সম্মতি দিয়েছে। তবে এই অতিরিক্ত ঋণের ক্ষেত্রে সুদের হার আগের তুলনায় অনেক বেশি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ইআরডির একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, অতিরিক্ত অর্থায়ন দিতে জাইকা সম্মত হলেও ঋণের কাঠামো নিয়ে আলোচনা এখনো চলছে। ঋণটি নির্দিষ্ট সুদে, পরিবর্তনশীল সুদে নাকি অন্য কোনো কাঠামোয় নেওয়া হবে, তা এখনো চূড়ান্ত হয়নি।
ওই কর্মকর্তা বলেন, সুদের হার আবার কমবে—এমন নিশ্চয়তা এখন নেই। বরং কমার সম্ভাবনা খুবই কম। ভবিষ্যতে সুদ আরও বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি এড়াতে নির্দিষ্ট সুদের হার নির্ধারণ করে ঋণ নেওয়াও কঠিন হতে পারে।
ইআরডির কর্মকর্তারা জানান, ২০২২ সালেও জাইকার ঋণের সুদের হার ১ শতাংশের নিচে ছিল। ২০২৫ সালে তা বেড়ে প্রায় ২ শতাংশে ওঠে এবং ২০২৬ সালে ৩ শতাংশ ছাড়িয়ে যায়। চলতি বছরের জুনে ৩১৪ মিলিয়ন ডলারের একটি জাপানি ঋণের সুদের হার ছিল ৩ দশমিক ৫ শতাংশ।
জাইকার ঢাকা কার্যালয় জানিয়েছে, প্রতিটি ঋণের কিস্তির শর্ত চূড়ান্ত করার সময় সে সময়কার বৈশ্বিক সুদের হার, অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, ঋণদাতার নীতি এবং প্রকল্পের ঝুঁকি বিবেচনা করা হয়। ফলে আগের কিস্তির তুলনায় পরবর্তী কিস্তিতে সুদের হার বেশি হতে পারে।ঋণের সুদের পাশাপাশি মেট্রোরেল প্রকল্প দুটির মূল ব্যয়ও ব্যাপকভাবে বেড়ে গেছে।
এমআরটি লাইন-১ প্রকল্পের ব্যয় ১২৯ দশমিক ৮২ শতাংশ বাড়িয়ে ১ লাখ ২০ হাজার ৭৯৪ কোটি ১৩ লাখ টাকা করার প্রস্তাব দিয়েছে ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেড (ডিএমটিসিএল)। ২০১৯ সালের ১৫ অক্টোবর জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় প্রকল্পটি অনুমোদনের সময় এর ব্যয় ধরা হয়েছিল ৫২ হাজার ৫৬১ কোটি ৪৩ লাখ টাকা।
অন্যদিকে এমআরটি লাইন-৫ নর্দার্ন প্রকল্পের ব্যয় ১২৫ দশমিক ৯৮ শতাংশ বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। এতে প্রকল্পটির ব্যয় ৪১ হাজার ২৩৮ কোটি ৫৪ লাখ টাকা থেকে বেড়ে ৯৩ হাজার ১৯০ কোটি ৯৬ লাখ টাকায় দাঁড়াবে। এই প্রকল্পটিও ২০১৯ সালে অনুমোদন করা হয়েছিল।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন বলেন, জাপানি ঋণের সুদ ৩ দশমিক ৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়লেও আন্তর্জাতিক দীর্ঘমেয়াদি ঋণের বাজারের তুলনায় তা এখনো তুলনামূলক কম। উদাহরণ হিসেবে তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের ৩০ বছর মেয়াদি ট্রেজারি বন্ডের সুদের হার ৫ শতাংশের বেশি।
তবে তার মতে, প্রকল্পগুলোর অর্থনৈতিক যৌক্তিকতাই এখন বড় প্রশ্ন। কারণ দুই প্রকল্পের ব্যয় দ্বিগুণের বেশি বেড়ে যাওয়ায় একই হারে প্রকল্পের সুফল না বাড়লে স্বাভাবিকভাবেই লাভ-ব্যয় অনুপাত কমে যাবে।
এ ছাড়া প্রকল্প দুটির অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্ভাব্যতা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। ব্যয় যখন দ্বিগুণের বেশি হয়ে যাচ্ছে, তখন প্রকল্পগুলোর বেনিফিট-কস্ট রেশিও এবং অভ্যন্তরীণ রিটার্নের হার এখনো গ্রহণযোগ্য পর্যায়ে আছে কি না, সেটিও যাচাই করা জরুরি।
তবে সবচেয়ে বড় উদ্বেগ সরকারের অর্থায়ন সক্ষমতা নিয়ে। প্রকল্প দুটিতে সরকারকে নিজস্ব তহবিল থেকে কয়েক হাজার কোটি নয়, সম্ভাব্যভাবে কয়েক দশ হাজার কোটি টাকা পর্যন্ত জোগান দিতে হতে পারে।
জাহিদ হোসেন বলেন, বর্তমান রাজস্ব আদায়ের পরিস্থিতি, সরকারের বিদ্যমান ব্যয়ের দায় এবং অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ঋণ নেওয়ার সীমাবদ্ধতার মধ্যে এই অতিরিক্ত আর্থিক চাপ সামাল দেওয়া সরকারের জন্য কঠিন হতে পারে।

