দেশে ক্যাশলেস লেনদেনের পরিধি বাড়াতে ট্রেড লাইসেন্সধারী ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের জন্য বাংলা কিউআর ব্যবহার বাধ্যতামূলক করার পথে এগোচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক। একই সঙ্গে অর্থনীতির গতি বাড়াতে বন্ধ শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকে সহায়তা এবং শিল্প উৎপাদনশীলতা বাড়াতে প্রায় ৬০০ বিলিয়ন টাকা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
বৃহস্পতিবার রাজধানীতে ইনস্টিটিউট অব কস্ট অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট অ্যাকাউন্ট্যান্টস অব বাংলাদেশের (আইসিএমএবি) আয়োজিত ‘Meet the Flag Bearers of CMA Profession and CPD Programme on a Cashless Ecosystem for Financial Inclusion’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান এসব তথ্য জানান।
গভর্নর বলেন, ক্যাশলেস লেনদেনের পরিবেশ গড়ে তুলতে ট্রেড লাইসেন্সধারী ব্যবসায়ীদের বাংলা কিউআর ব্যবহারের আওতায় আনার কাজ চলছে। বর্তমানে প্রায় ৩২ লাখ ব্যবসায়ী বাংলা কিউআরের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন। প্রতি সপ্তাহে আরও প্রায় ২ লাখ নতুন ব্যবসায়ী এই ব্যবস্থায় যুক্ত হচ্ছেন।
তিনি বলেন, প্রতিটি ব্যাংককে বাংলা কিউআরের সঙ্গে যুক্ত করা হবে। এ উদ্যোগ বাস্তবায়নে আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও পেমেন্ট সার্ভিস প্রোভাইডারগুলোকে নিয়ন্ত্রক সংস্থার নির্দেশনা মেনে চলতে হবে। কেউ তা মানতে না চাইলে তাদের কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়ারও হুঁশিয়ারি দেন তিনি।
গভর্নর জানান, বাংলা কিউআর চালুর ক্ষেত্রে শুরুতে বাজারের কয়েকজন বড় খেলোয়াড়ের কাছ থেকে আপত্তি এসেছিল। একটি বড় প্রতিষ্ঠান প্রথমে কিউআর চালুর কথা জানালেও পরে তিন মাস সময় বাড়ানোর অনুরোধ করে। তবে বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়ে দেয়, আর সময় নেই এবং জুনের মধ্যেই প্রক্রিয়াটি শেষ করতে হবে।
বাংলা কিউআরের প্রচার কার্যক্রম আগামী ১ অক্টোবর থেকে শুরু হবে বলেও জানান মোস্তাকুর রহমান। তাঁর মতে, ক্যাশলেস লেনদেনের পরিধি বাড়ানোর মাধ্যমে ডিজিটাল আর্থিক ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর ও প্রাণবন্ত করা সম্ভব।
তিনি বলেন, বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায় ১৪ কোটি ব্যাংক হিসাব রয়েছে। এর বিপরীতে অ্যাপভিত্তিক আর্থিক সেবা ব্যবহারকারীর সংখ্যা প্রায় ৩ কোটি। উন্নত প্রযুক্তির সুবিধা কাজে লাগিয়ে লাখ লাখ মানুষকে আনুষ্ঠানিক ডিজিটাল অর্থনীতির আওতায় আনার চেষ্টা চলছে। এ ক্ষেত্রে এস্তোনিয়ার মডেলও বিবেচনা করা হচ্ছে।
গভর্নর বলেন, ক্যাশলেস অর্থনীতি শুধু লেনদেনের খরচ কমাবে না, বরং ব্যবসায়িক কার্যক্রমে স্বচ্ছতা বাড়ানোর পাশাপাশি সরকারের রাজস্ব আদায়েও সহায়তা করবে। কোনো দোকানদারকে কিছু সময়ের জন্য দোকানের বাইরে যেতে হলে কর্মচারীরাও ডিজিটাল লেনদেনের মাধ্যমে ব্যবসা চালিয়ে যেতে পারবেন। ফলে নগদ অর্থ ব্যবস্থাপনার ঝামেলাও কমবে।
তবে ক্যাশলেস সমাজ গড়ে তোলার পথে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হলো উপযুক্ত মোবাইল ডিভাইসে মানুষের প্রবেশাধিকার। বিশেষ করে নিম্নআয়ের মানুষের মধ্যে স্মার্টফোন ব্যবহারের সুযোগ সীমিত। বাংলাদেশে এখনো প্রায় ৬ কোটি মানুষ ফিচার ফোন ব্যবহার করেন।
গভর্নর বলেন, একটি মোবাইল ফোনের দাম যদি ৮ হাজার টাকা হয়, তাহলে ৬ কোটি মানুষকে স্মার্টফোন দিতে প্রায় ৩০০ বিলিয়ন টাকা প্রয়োজন হবে। কিস্তির মাধ্যমে এসব স্মার্টফোন দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে বলেও জানান তিনি।
ডিজিটাল করব্যবস্থা ও রাজস্ব সংগ্রহের ক্ষেত্রেও বিভিন্ন দেশের অভিজ্ঞতা পর্যালোচনা করছে বাংলাদেশ। এস্তোনিয়ার উদাহরণ উল্লেখ করে গভর্নর বলেন, স্বাস্থ্য, কর ও শিক্ষাসংক্রান্ত তথ্যকে একটি একক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে যুক্ত করে একটি জনসংখ্যা ডিরেক্টরি তৈরির কাজও এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। এতে একজন ব্যক্তির বিভিন্ন তথ্য একই প্ল্যাটফর্মে পাওয়া সম্ভব হবে।
অর্থনীতিকে চাঙা করতে প্রায় ৬০০ বিলিয়ন টাকা বন্ধ শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকে সহায়তা এবং শিল্পের উৎপাদনশীলতা বাড়াতে বরাদ্দ করা হয়েছে বলেও জানান মোস্তাকুর রহমান। ডিসেম্বরের মধ্যে শিল্প খাত ও তরুণদের জন্য অর্থ প্রবাহ বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
জুলাই অভ্যুত্থানের পর দেশের তরুণদের উৎপাদনশীল অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে জানিয়ে তিনি বলেন, বিপুলসংখ্যক তরুণ দেশের জন্য কিছু করতে আগ্রহী। তাদের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত করা হবে। এ জন্য প্রত্যেকে ১০ লাখ টাকা ঋণ এবং ১০ লাখ টাকা অনুদান পাবে বলেও জানান তিনি।
গভর্নর আরও বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক সুদের হার কমানোর চেষ্টা করছে। কারণ ঋণের সুদ বাড়লে শেষ পর্যন্ত নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামও বেড়ে যায়। বাংলাদেশ প্রতিবছর প্রায় ২৬ লাখ টন ভোজ্যতেল এবং ২০ লাখ টন চিনি আমদানি করে। এসব পণ্যের আমদানি ও ব্যবসায়িক খরচ কমাতে সুদের হার কমানো প্রয়োজন বলে তিনি উল্লেখ করেন।
অনুষ্ঠানে আইসিএমএবির সভাপতি মো. কাওসার আলম বলেন, নগদ অর্থ ব্যবস্থাপনায় সরকার বছরে প্রায় ২০০ বিলিয়ন টাকা ব্যয় করে। দেশের অর্থনীতি ব্যাপকভাবে ক্যাশলেস করা গেলে এই ব্যয় অন্তত ১০০ বিলিয়ন টাকায় নামিয়ে আনা সম্ভব।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ নতুন প্রযুক্তি খুব দ্রুত গ্রহণ করে। ফলে ডিজিটাল আর্থিক সেবার বিস্তারে দেশে বড় সম্ভাবনা রয়েছে।
অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ড. তৌহিদুল আলম খান। বক্তব্য দেন বেসিক ব্যাংকের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক শুভাশ চন্দ্র দাস। তিনি ক্যাশলেস সমাজ গঠনে বাংলা কিউআরকে জাতীয় পর্যায়ের ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থা গড়ে তোলার গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প হিসেবে উল্লেখ করেন।
শুভাশ চন্দ্র দাস বলেন, সুইডেনের মতো নর্ডিক দেশগুলোর কাছ থেকে বাংলাদেশ শিক্ষা নিতে পারে। এসব দেশে দৈনন্দিন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে ক্যাশলেস লেনদেন ব্যাপকভাবে যুক্ত হয়েছে। একই সঙ্গে প্রায় ১০০টি দেশ ডিজিটাল মুদ্রা নিয়েও কাজ করছে, যা বিশ্বজুড়ে ডিজিটাল আর্থিক ব্যবস্থার দিকে অগ্রসর হওয়ার ইঙ্গিত দেয়।
অনুষ্ঠানে উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায় ৩২ দশমিক ৬৭ শতাংশ লেনদেন ক্যাশলেস পদ্ধতিতে হচ্ছে। তবে আর্থিক ব্যবস্থাকে আরও ডিজিটাল করার বড় সুযোগ এখনো রয়েছে। দেশের ৮৪ শতাংশ অনানুষ্ঠানিক কর্মসংস্থান ক্যাশলেস অর্থনীতি গড়ে তোলার অন্যতম বড় বাধা। নেটওয়ার্ক কাভারেজের ঘাটতি এবং উপযুক্ত মোবাইল ডিভাইসের সীমিত প্রবেশাধিকারও বড় সমস্যা।
দেশের ডিজিটাল আর্থিক ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করতে বিদ্যমান জটিলতা দূর করার পাশাপাশি ব্যাংক ও বিভিন্ন পেমেন্ট প্ল্যাটফর্মের মধ্যে আন্তঃসংযোগ নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। তাঁর বক্তব্য, দেশে যত বেশি ক্যাশলেস লেনদেন বাড়বে, দুর্নীতিও তত কমবে।
সাবেক জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান ও বর্তমানে বিশ্বব্যাংকের অলটারনেট এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর আবদুর রহমান খান বলেন, দেশের ব্যাংকিং খাত বর্তমানে বড় ধরনের চাপের মধ্যে রয়েছে। প্রায় ৫ ট্রিলিয়ন টাকা জালিয়াতি বা অনিয়মের সঙ্গে জড়িত বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। তবে চলমান সংস্কারের মাধ্যমে ব্যাংকিং খাতে আবারও স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা সম্ভব বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
অনুষ্ঠানে আইসিএমএবির সচিব মঞ্জুর মো. শায়ফুল আজম ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন। এ ছাড়া শানতা অ্যাসেট ম্যানেজমেন্টের ভাইস চেয়ারম্যান আরিফ খান এবং আইসিএমএবির ভাইস প্রেসিডেন্ট এস এম জহির উদ্দিন হায়দারও বক্তব্য দেন।

