মধ্যপ্রাচ্যের সংকটের কারণে কিছুদিন ধরে সার আমদানিতে যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছিল, তা কাটিয়ে আবার স্বাভাবিক গতি পেয়েছে নন-ইউরিয়া জাতীয় সারের সরবরাহ প্রক্রিয়া। আসন্ন রবি ও বোরো মৌসুমের চাহিদা মাথায় রেখে সরবরাহ ও মজুদ বাড়াতে চলতি মাসেই ডাই-অ্যামোনিয়াম ফসফেট, মিউরেট অব পটাশ এবং ট্রিপল সুপার ফসফেট নিয়ে মোট সাতটি জাহাজ দেশের বন্দরে পৌঁছানোর কথা রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, পথে থাকা এই সাতটি জাহাজের মধ্যে একটিতে রয়েছে ডাই-অ্যামোনিয়াম ফসফেট, চারটিতে মিউরেট অব পটাশ এবং বাকি দুটিতে ট্রিপল সুপার ফসফেট। এসব জাহাজে মোট আড়াই লাখ টনের কাছাকাছি সার আসছে, যার মধ্যে দেড় লাখ টন মিউরেট অব পটাশ, ষাট হাজার টন ট্রিপল সুপার ফসফেট এবং চল্লিশ হাজার টন ডাই-অ্যামোনিয়াম ফসফেট। এর পরের মাসেই আরও প্রায় দশটি জাহাজ একই তিন ধরনের সার নিয়ে দেশে পৌঁছানোর প্রক্রিয়া প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। কৃষি মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থার সূত্রে এই তথ্য জানা গেছে।
মন্ত্রণালয়ের নথি বলছে, চলতি মাসে ট্রিপল সুপার ফসফেট বহনকারী দুটি জাহাজের একটি আট তারিখ নাগাদ এবং অন্যটি এগারো তারিখ নাগাদ বন্দরে পৌঁছাতে পারে। মরক্কো থেকে আমদানি করা এই দুই চালানে মোট ষাট হাজার টন সার রয়েছে। একই দেশ থেকে চল্লিশ হাজার টন ডাই-অ্যামোনিয়াম ফসফেট নিয়ে আরেকটি জাহাজও আট তারিখ নাগাদ পৌঁছানোর কথা।
মিউরেট অব পটাশের ক্ষেত্রে চলতি মাসে মোট দেড় লাখ টন সার দেশে আসছে, যার একটি বড় অংশ রাশিয়া ও কানাডা থেকে সংগ্রহ করা হচ্ছে। রাশিয়া থেকে দুটি লটে সত্তর হাজার টন এবং কানাডা থেকে দুটি লটে আশি হাজার টন সার আমদানি হচ্ছে। এই চারটি চালানের মধ্যে দুটি চলতি সপ্তাহেই এবং বাকি দুটি মাসের মাঝামাঝি সময়ে দেশে পৌঁছানোর কথা রয়েছে।
কৃষি উন্নয়ন সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, চলতি সেপ্টেম্বর থেকে আগামী ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি চাহিদার সময়ে ডাই-অ্যামোনিয়াম ফসফেটের প্রয়োজন হবে প্রায় সাড়ে এগারো লাখ টন। এর বিপরীতে বর্তমানে পথে থাকা এবং আগামী জানুয়ারির মধ্যে আমদানি প্রক্রিয়াধীন সারের পরিমাণ প্রায় সাড়ে ছয় লাখ আশি হাজার টন। একই সময়ে মিউরেট অব পটাশের চাহিদা ধরা হয়েছে প্রায় সাড়ে ছয় লাখ বাহাত্তর হাজার টন, যার বিপরীতে সরবরাহ প্রক্রিয়াধীন রয়েছে প্রায় একই পরিমাণ। তবে ট্রিপল সুপার ফসফেটের ক্ষেত্রে চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কিছুটা কম—চাহিদা যেখানে প্রায় সাড়ে পাঁচ লাখ টন, সেখানে প্রক্রিয়াধীন আমদানির পরিমাণ সাড়ে তিন লাখ ষাট হাজার টনের মতো।
এই মাসের সাতটি জাহাজের পর আগামী মাসেও আরও প্রায় দশটি জাহাজ তিন ধরনের সার নিয়ে দেশে আসার কথা রয়েছে, যেসবের আমদানি প্রক্রিয়া এখন শেষ পর্যায়ে। সার আমদানি প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, আগামী জানুয়ারি পর্যন্ত প্রতি মাসেই গড়ে দশ থেকে বারোটি করে জাহাজ সার নিয়ে দেশে পৌঁছাবে। তাঁর ভাষায়, চলতি মাসের চালানগুলো ইতিমধ্যে পথে রয়েছে, আগামী মাসের কয়েকটি চালানের পণ্য বোঝাই শেষ হয়েছে আর বাকিগুলোর বোঝাইকরণ চলছে। পরবর্তী মাসগুলোর জন্যও দ্রুত ঋণপত্র খোলার কাজ এগিয়ে চলছে বলে তিনি জানান।
কৃষি অর্থনীতি বিশ্লেষকদের মতে, বছরের মধ্যে অক্টোবরের শেষভাগ থেকে ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত সারের চাহিদা সবচেয়ে বেশি থাকে। এই সময়ে শীতকালীন সবজি, আলু, পেঁয়াজ ও ভুট্টার মতো ফসলের পাশাপাশি দেশের প্রধান খাদ্যশস্য বোরো ধানের চাষও শুরু হয়ে যায়। ফলে সারা বছরের মোট চাহিদার প্রায় চল্লিশ শতাংশই এই একটি মৌসুমে ব্যবহৃত হয়।
একজন কৃষি অর্থনীতিবিদ এ প্রসঙ্গে বলেন, সামনে রবি ও বোরো মৌসুম আসছে বলে বর্তমান আমদানির পরিমাণ চাহিদার সঙ্গে মোটামুটি সামঞ্জস্যপূর্ণ হলেও আগামী দিনগুলোতে চাহিদা সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছাবে। তাই এখন থেকেই সরবরাহ ও মজুদ বাড়ানোর পাশাপাশি শুধু আমদানির ওপর নির্ভরশীল না থেকে দেশীয় কারখানায় উৎপাদন বাড়ানোরও পরামর্শ দেন তিনি। তাঁর মতে, অন্যান্য সার না হলেও অন্তত ইউরিয়া উৎপাদনে দেশ স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে পারে, আর এ জন্য আমদানি স্বাভাবিক রাখার পাশাপাশি স্থানীয় উৎপাদন বাড়ানোও জরুরি।
উল্লেখ্য, আমন মৌসুমকে ঘিরে বিভিন্ন জেলার কৃষকেরা বেশ কিছুদিন ধরে সার-সংকটের অভিযোগ করে আসছিলেন। ডিলারের কাছে সার না পাওয়া কিংবা বাড়তি দামে কিনতে বাধ্য হওয়ার মতো অভিযোগও উঠেছিল। এমনকি কুড়িগ্রামে এক ডিলারের গুদাম ভেঙে কৃষকদের সার নিয়ে যাওয়ার একটি ঘটনা দেশজুড়ে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। এরপরই কঠোর অবস্থান নেয় কৃষি মন্ত্রণালয় এবং দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে বেশ কয়েকজন কৃষি কর্মকর্তাকে বদলি করা হয়। মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে বরাবরই বলা হচ্ছে, দেশে সারের কোনো প্রকৃত সংকট নেই।
এ বিষয়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী বলেন, সার আমদানি একটি চলমান ও ধারাবাহিক প্রক্রিয়া, যেখানে মাসভিত্তিক চাহিদার হিসাব অনুযায়ী কখনো বেশি, কখনো কম পরিমাণে সার আনা হয়। বছরে দেশের মোট চাহিদা প্রায় পঞ্চাশ থেকে পঞ্চান্ন লাখ টনের মতো, যা একবারে আমদানি করা সম্ভব নয়, আবার এত বিপুল পরিমাণ সার সংরক্ষণের মতো পর্যাপ্ত গুদামও নেই। দীর্ঘদিন গুদামে রাখলে সারের মান নষ্ট হওয়ার শঙ্কাও থাকে বলে তিনি জানান।
তিনি আরও বলেন, ঝুঁকি কমাতে প্রতিটি সার অন্তত তিনটি ভিন্ন উৎস থেকে আমদানি করা হয়, যাতে কোনো একটি উৎস থেকে সরবরাহে সমস্যা দেখা দিলে অন্য উৎস থেকে তা পূরণ করা যায়। মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে কিছুদিন নির্দিষ্ট দুটি দেশ থেকে সার আমদানি বন্ধ ছিল, তবে পরে বিকল্প নৌপথ ব্যবহার করে সরবরাহ আবার শুরু হয়েছে। ফলে সার আমদানি নিয়ে বর্তমানে কোনো অনিশ্চয়তা নেই বলে তিনি নিশ্চিত করেন।

