২০২৩-২৪ অর্থবছরে বড় ধাক্কার পর আবারও ঘুরে দাঁড়িয়েছে বাংলাদেশের সাইকেল রপ্তানি খাত। স্থানীয় উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানো, আন্তর্জাতিক বাজারে চাহিদা বৃদ্ধি এবং পরিবেশবান্ধব চলাচলের জনপ্রিয়তার কারণে গত দুই অর্থবছরে রপ্তানি আয় ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে।
খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, আন্তর্জাতিক পণ্য পরিবহনের ভাড়া কমে আসা, দেশে যন্ত্রাংশ উৎপাদনে বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং বিভিন্ন দেশে তুলনামূলক কম খরচের পরিবেশবান্ধব যানবাহনের চাহিদা বাড়ার কারণে সাইকেল রপ্তানিতে নতুন গতি এসেছে।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২১-২২ অর্থবছরে বাংলাদেশ সাইকেল রপ্তানি করে সর্বোচ্চ ১৬৭.৯৫ মিলিয়ন ডলার আয় করেছিল। পরের অর্থবছরে আয় কমে দাঁড়ায় ১৪২.২২ মিলিয়ন ডলারে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে তা আরও কমে মাত্র ৮২.৫০ মিলিয়ন ডলারে নেমে যায়।
তবে এরপর থেকেই পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে সাইকেল রপ্তানি থেকে আয় বেড়ে ১১৬.৪৪ মিলিয়ন ডলারে দাঁড়ায়। সর্বশেষ ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা আরও বেড়ে হয়েছে ১৫১.৪০ মিলিয়ন ডলার।
চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম দুই মাসেও এই প্রবৃদ্ধির ধারা অব্যাহত রয়েছে। এ সময়ে সাইকেল রপ্তানি থেকে আয় হয়েছে ২৯.৩৯ মিলিয়ন ডলার, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ে অর্জিত ২৪.১৯ মিলিয়ন ডলারের তুলনায় বেশি।
শিল্পসংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা জানান, দীর্ঘদিনের মূল্যস্ফীতির চাপ এবং ইউরোপের বড় বড় বাজারে অতিরিক্ত পণ্যের মজুতের কারণে একসময় রপ্তানি আদেশ কমে গিয়েছিল। তবে এখন আবার নতুন করে রপ্তানি আদেশ বাড়ছে।
বিশেষ করে মাঝারি দামের উন্নত কর্মক্ষমতার সাইকেল এবং শহরে দৈনন্দিন যাতায়াতের জন্য ব্যবহৃত সাইকেলের চাহিদা বাড়ছে বলে জানান তিনি।
তার মতে, সরকার সহায়ক বাণিজ্যনীতি অব্যাহত রাখলে, শুল্ক ও কাস্টমস কার্যক্রম দ্রুত সম্পন্ন করলে এবং উচ্চমূল্যের যন্ত্রাংশ উৎপাদনে বিশেষ প্রণোদনা দিলে দেশের নির্মাতারা রপ্তানি আরও বাড়াতে পারবেন।
এতে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের সাইকেল শিল্পের অবস্থানও আরও শক্তিশালী হবে বলে মনে করেন খাতসংশ্লিষ্টরা।
গত দুই দশকে বাংলাদেশ সাইকেল উৎপাদন ও রপ্তানির একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে নিজেদের অবস্থান তৈরি করেছে। বর্তমানে দেশে সংযোজিত দুই চাকার যান বিশ্বের ৪০টির বেশি দেশে রপ্তানি হচ্ছে।
রপ্তানির প্রধান গন্তব্য এখনো ইউরোপীয় ইউনিয়ন। জার্মানি, যুক্তরাজ্য, নেদারল্যান্ডস, অস্ট্রিয়া, ডেনমার্ক ও পোল্যান্ডের ক্রেতারা বাংলাদেশের সাইকেলের অন্যতম বড় বাজার। এসব বাজারে অগ্রাধিকারমূলক শুল্ক সুবিধা পাওয়ায় বাংলাদেশের রপ্তানিকারকেরা তুলনামূলক সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছেন।
তবে ইউরোপের ওপর নির্ভরতা কমাতে এখন উত্তর আমেরিকা এবং এশিয়ার বিভিন্ন অপ্রচলিত বাজারেও প্রবেশের চেষ্টা করছেন রপ্তানিকারকেরা।
বাংলাদেশ থেকে বর্তমানে বিভিন্ন ধরনের সাইকেল রপ্তানি হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে সাধারণ শহুরে যাতায়াতের সাইকেল, পাহাড়ি সাইকেল, রোড ক্রুজার, শিশুদের সাইকেল এবং দ্রুত সম্প্রসারিত বৈদ্যুতিক সহায়ক সাইকেল।
একই সঙ্গে স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলো সাইকেলের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশ দেশে উৎপাদনের সক্ষমতা বাড়াচ্ছে। অ্যালয় ফ্রেম, কাঁটা, চাকা, স্পোক, টিউব, টায়ার ও আসনের মতো কাঠামোগত উপাদান উৎপাদনে বিনিয়োগ বাড়ছে।
এর ফলে বিদেশি সরবরাহকারীদের ওপর নির্ভরতা কমার পাশাপাশি দেশে সাইকেল উৎপাদনে স্থানীয় মূল্য সংযোজনও বাড়ছে।
বাংলাদেশের সাইকেল রপ্তানি খাতে মেঘনা গ্রুপ শীর্ষস্থানীয় অবস্থানে রয়েছে। এ ছাড়া রংপুর মেটাল ইন্ডাস্ট্রিজ, পানাম গ্রুপ এবং আলিতা (বিডি) লিমিটেডও এ খাতের উল্লেখযোগ্য প্রতিষ্ঠান।
খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, রপ্তানির বর্তমান ঊর্ধ্বমুখী ধারা ধরে রাখতে হলে অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা, বন্দরে পণ্যজট এবং বিশেষায়িত পরীক্ষার সুযোগের ঘাটতি দ্রুত দূর করতে হবে।
আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সনদপ্রাপ্ত পরীক্ষাগার স্থাপন এবং প্রযুক্তি আধুনিকায়নে কম সুদের অর্থায়ন নিশ্চিত করা গেলে দেশের সাইকেল শিল্প আরও প্রতিযোগিতামূলক হয়ে উঠবে। একই সঙ্গে রপ্তানি পণ্যে বৈচিত্র্য আনার জাতীয় লক্ষ্য অর্জনেও খাতটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবে।

