ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম হলো এমন একটি সফটওয়্যার- ভিত্তিক অনলাইন সিস্টেম যা ব্যবহারকারীদের যোগাযোগ এবং লেনদেন সহজ করে তোলে। কিন্তু এক সময় অনলাইনে কেনাকাটার অগ্রযাত্রা আজকের মতো এতো সহজ ও জনপ্রিয় ছিল না বরং শুরুটা ছিল নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষার মধ্য দিয়ে। প্রথম বড় পদক্ষেপ হিসেবে-১৯৯৪ সালে ড্যানিয়েল এম কোহন নামে ২১ বছরের এক তরুণ কম্পিউটার বিজ্ঞানী “নেটমার্কেট” নামে একটি অনলাইন বাজার গড়ে তোলেন। এই নেটমার্কেট ছিল এমন এক যুগান্তকারী উদ্যোগ যা সাইবার জগতে প্রথমবারের মতো একটি ডিজিটাল শপিং মল ধারণা নিয়ে এসেছে।
এই সাইবার শপিং মল তৈরির পেছনে ছিল সময়, দূরত্ব ও ঝামেলাহীন কেনাকাটার সুবিধা মানুষের হাতের মুঠোয় এনে দেওয়ার স্বপ্ন। নেটমার্কেটের মাধ্যমে প্রথমবারের মতো গ্রাহকরা ঘরে বসেই ইন্টারনেটের সাহায্যে পছন্দের পণ্য কিনতে পারছিলেন। যা ভবিষ্যতে ই-কমার্সের ভিত্তি স্থাপন করে। ধীরে ধীরে এই ধারণার বিস্তৃতি ঘটে, আর প্রযুক্তির উন্নয়নের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বিশ্বজুড়ে অনলাইন কেনাকাটা সহজলভ্য ও জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।
যাই হোক বিশ্ব এখন একবিংশ শতাব্দীর ডিজিটাল বিপ্লবের যুগে প্রবেশ করেছে। আর এর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে ডিজিটাল কেনাকাটা বা ই-কমার্স। ঘরে বসেই আমাদের প্রয়োজনীয় সবকিছু কেনাকাটা করার সুবিধা এনে দিয়েছে এই অনলাইন প্ল্যাটফর্মগুলো। সুপারমার্কেটে লাইন ধরার প্রয়োজন নেই, দরকার নেই যানজটের ঝামেলাও। হাতের মুঠোয় স্মার্টফোন, ল্যাপটপ কিংবা ট্যাবলেট থাকলেই এখন ঘরে বসে পছন্দের পোশাক, খাবার, গৃহস্থালি পণ্য এমনকি আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডের বিলাসবহুল সামগ্রীও কেনা সম্ভব। একদিকে যেমন সময়, শ্রম ও অর্থ সাশ্রয়ের সুযোগ এনে দিয়েছে এই মাধ্যমটি তেমনি অন্যদিকে কিছু লুকানো ঝুঁকির কথাও মনে করিয়ে দিচ্ছে।
ডিজিটাল কেনাকাটার সুবিধা: আগে যেখানে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বাজারে বা শপিং মলে গিয়ে কেনাকাটা করতে হতো, এখন সেটা করা যায় মুহূর্তের মধ্যেই। ফলে সময় ও শ্রম দুটোই সাশ্রয় হয়। তাছাড়া ডিজিটাল প্লাটফর্মের মাধ্যমে শপিং করার সময়ের কোনো বাধা নেই। আপনি ২৪ ঘণ্টা যেকোনো সময় এবং যেকোনো জায়গা থেকে আপনার পছন্দসই পণ্য কিনতে পারেন- এটি হতে পারে রাতের মধ্যেই অথবা ভোরে। আরও আকর্ষণীয় বিষয় হল-আপনি অনলাইনে সহজেই যাচাই-বাছাই করে তুলনামূলক কম দামে পণ্য কেনার সুযোগ পাবেন এবং এটি খুবই সহজ।
সাধারণ দোকানে সীমিত পরিমাণ পণ্য মজুদ থাকে বা একটা নির্দিষ্ট ব্যান্ডের পণ্য মজুত থাকে। কিন্তু অনলাইনে বিভিন্ন ধরনের ব্র্যান্ড, পণ্যের বৈচিত্র্য এবং দামের তুলনা করা যায়। ফলে গ্রাহক সাশ্রয়ী মূল্যে সহজেই তার পছন্দমতো পণ্য কিনতে পারে।
বিভিন্ন অনলাইন সাইট প্রায়ই বিশেষ ছাড় এবং অফার দিয়ে থাকে। ফলে তুলনামূলক কম দামে ভালো পণ্য কেনার সুযোগ থাকে। বিভিন্ন উৎসব উপলক্ষে ই-কমার্স সাইটগুলোতে আকর্ষণীয় ডিসকাউন্ট অফার, ক্যাশব্যাক এবং ফ্রি শপিংয়ের সুযোগ পাওয়া যায়। ডিজিটাল কেনাকাটায় মোবাইল ব্যাংকিং, ডেবিট বা ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে ক্যাশলেস লেনদেনের সুবিধা রয়েছে। এতে ক্যাশ ব্যবহারের ঝামেলা কমে যায় এবং পেমেন্ট প্রক্রিয়াটি দ্রুত ও সুরক্ষিত হয়।
অনলাইনে অর্ডার করলে পণ্যটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে বাসায় পৌঁছে যায়। ফলে ক্রেতার বাইরে গিয়ে পণ্য আনার প্রয়োজন পড়ে না। যা সময় ও শ্রমের অপচয় কমায়।
বাংলাদেশে নির্ভরযোগ্য ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের সাইট সমূহ হচ্ছে- দারাজ , আজকের ডিল, ফুডপান্ডা, চালডাল, রকমারি, বিক্রয় ডট কম, স্টারটেক ও পিকাবু ইত্যাদি।
ডিজিটাল কেনাকাটায় লুকিয়ে থাকা সতর্ক সংকেত:
বর্তমান ডিজিটাল যুগে সোশ্যাল মিডিয়া ও অনলাইন প্ল্যাটফর্মগুলো আমাদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে। ডিজিটাল কেনাকাটার সুবিধাগুলো যেমন আকর্ষণীয়, তেমনই কিছু সতর্কতার বিষয় রয়েছে। গ্রাহককে সাবধান না হলে প্রতারণার শিকার হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
অনলাইনে কিছু অসাধু প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তি ভুয়া ওয়েবসাইট চালিয়ে প্রতারণা করে থাকে। তাই কেনার আগে ওয়েবসাইট বা অ্যাপটির বিশ্বাসযোগ্যতা যাচাই করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। অনেক গ্রাহকই পণ্য কেনার আগে সাইটটির রিভিউ পড়েন না। তবে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। রিভিউ দেখলে পণ্যের মান, সাইটের সেবার মান এবং গ্রাহকদের অভিজ্ঞতা সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। ভালো রিভিউযুক্ত ওয়েবসাইটগুলো থেকে কেনাকাটা করা নিরাপদ।
অনেক সময় দেখা যায়, পণ্যটি প্রত্যাশার মতো হয় না। তাই ওয়েবসাইটটির রিটার্ন পলিসি বা ফেরত দেওয়ার সুবিধা রয়েছে কিনা তা দেখে নেওয়া উচিত। বিশেষতঃ পোশাক বা ইলেকট্রনিক পণ্য কেনার ক্ষেত্রে এই বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।
ডিজিটাল কেনাকাটার সময় নিরাপদ পেমেন্ট গেটওয়ে ব্যবহার করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে কোন কোন ওয়েবসাইটে সন্দেহজনক লেনদেনের কারণে তথ্য ফাঁসের ঝুঁকি থাকে তা জেনে নেওয়া উচিত। তাই লেনদেনের সময় বিশ্বাসযোগ্য গেটওয়ে যেমন SSL (Secure Sockets Layer) সুরক্ষিত ওয়েবসাইট ব্যবহার করা গুরুত্বপূর্ণ। এটি আপনার তথ্য সুরক্ষিত রাখে এবং সম্ভাব্য প্রতারণা থেকে রক্ষা করে।
বাংলাদেশে ডিজিটাল প্লাটফর্মের বর্তমান অবস্থা:
বাংলাদেশে ই-কমার্স ইন্ডাস্ট্রি সাম্প্রতিক সময়ে অভূতপূর্ব প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। বিশেষ করে কোভিড-১৯ মহামারির সময়ে অনেকেই এই প্ল্যাটফর্মে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছেন। বাংলাদেশের ই-কমার্স ব্যবসার চিত্র দিন দিন আরও ব্যাপক আকার নিচ্ছে। বর্তমানে দেশে প্রায় আড়াই হাজারের বেশি ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এদের মধ্যে ১ শতাংশ প্রতিষ্ঠান বড় পরিসরে পরিচালিত হচ্ছে, যেখানে প্রায় ৪ শতাংশ মাঝারি পরিসরে এবং বাকি ৯৫ শতাংশ ছোট আকারে পরিচালিত হচ্ছে। এর পাশাপাশি সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে ব্যবসা পরিচালনা করা এফ-কমার্স পেজের সংখ্যাও প্রায় ৫০ হাজার। যেগুলো সক্রিয়ভাবে কেনাবেচার কাজে নিয়োজিত।
এই তথ্য থেকে বোঝা যায় যে, ই-কমার্স ও এফ-কমার্স উভয় ক্ষেত্রেই দেশে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের অংশগ্রহণ বেশি। প্রযুক্তি ও ইন্টারনেট সহজলভ্য হওয়ার ফলে ছোট উদ্যোক্তারাও এখন অনলাইন ব্যবসার মাধ্যমে তাদের পণ্য সহজেই গ্রাহকের কাছে পৌঁছে দিতে পারছেন।
সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, লেনদেনের পরিমাণের ভিত্তিতে বাংলাদেশ ই-কমার্স বিশ্বের ৪৬তম স্থানে রয়েছে। স্ট্যাটিস্টা’র তথ্য বলছে, ২০২৩ সালের মধ্যে এ দেশে ই-কমার্স লেনদেনের পরিমাণ তিন বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বর্তমানে ই-কমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ই-ক্যাব) অন্তর্ভুক্ত সদস্য প্রতিষ্ঠান প্রায় ১ হাজার ৮০০। যা প্রতিদিনই দেশের লাখো মানুষের কাছে ই-কমার্স সেবা পৌঁছে দিচ্ছে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ জনশুমারি অনুযায়ী- ১৫ বছরের বেশি বয়সী মানুষের সংখ্যা ১১ কোটি ৮৯ লাখ ১৬ হাজার। এর মধ্যে, বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী- ৫ লাখ ৩৫ হাজার মানুষ ডিজিটাল লেনদেন করেন। বিশ্বের শীর্ষ ১০টি দেশের ৯৯ থেকে ১০০ শতাংশ মানুষই ডিজিটাল লেনদেনে অংশ নিচ্ছেন।
বাংলাদেশের ই-কমার্স বাজারের এই অগ্রগতির পেছনে রয়েছে ইন্টারনেট ব্যবহারের সহজলভ্যতা, ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থার সম্প্রসারণ এবং মানুষজনের কেনাকাটায় অনলাইন নির্ভরশীলতার ক্রমবৃদ্ধি। গ্রাহকরা এখন ঘরে বসেই ফ্যাশন, ইলেকট্রনিক এবং গ্রোসারী থেকে শুরু করে নিত্যপ্রয়োজনীয় সব কিছু কেনার সুযোগ পাচ্ছেন। দেশের তরুণ উদ্যোক্তারা ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে ব্যবসা শুরু করে গ্রাহকদের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিচ্ছেন পণ্য ও সেবা।
চলতি অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাসে বাংলাদেশের ই-কমার্স খাতে ব্যাংক কার্ডের মাধ্যমে মোট ৭ হাজার ৫৬৩ কোটি টাকার লেনদেন হয়েছে। যা আগের অর্থবছরের একই সময়ে এ পরিমাণ ছিল ৫ হাজার ৪১৭ কোটি টাকা। এ থেকে বোঝা যায়, ই-কমার্স লেনদেনের পরিমাণ গত বছরের তুলনায় ২ হাজার ১৪৬ কোটি টাকা বেড়েছে। সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ হালনাগাদ প্রতিবেদনে এই তথ্য প্রকাশিত হয়েছে। এই বৃদ্ধি ডিজিটাল প্লাটফর্মের খাতের ক্রমবর্ধমান জনপ্রিয়তা, ডিজিটাল লেনদেনের প্রতি মানুষের আস্থার প্রতিফলন- যা দেশজুড়ে অনলাইন কেনাকাটার চাহিদা আরও বাড়িয়ে তুলেছে।
বিটিআরসি চেয়ারম্যান বলেছেন, ইন্টারনেটের দাম যেন পানির মতো সস্তা হয়। ডিজিটাল সেবা বাড়ানোর জন্য ইন্টারনেটের দাম কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে এবং বিটিআরসি এই বিষয়ে কাজ করে যাচ্ছে। তাঁর মতে- সাশ্রয়ী ইন্টারনেট সেবার মাধ্যমে আরও বেশি মানুষ ডিজিটাল সুবিধা উপভোগ করতে পারবে, যা দেশের ডিজিটাল উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করবে। সরকারও এই সেক্টরের উন্নয়নে আগ্রহী এবং নতুন নীতিমালা প্রণয়ন করছে। এর ফলে ব্যবসা আরো উন্নত হবে, আর গ্রাহকদের জন্য নিরাপত্তার বিষয়টি আরো সুনিশ্চিত হবে। ভবিষ্যতে অনলাইন কেনাকাটার সুবিধা ও সেবার মান আরও উন্নত হবে বলে আশা করা যাচ্ছে।
ডিজিটাল কেনাকাটা আমাদের জীবনে সহজলভ্যতা এবং সুবিধা এনে দিয়েছে। তবে আরো সচেতনতার সঙ্গে এটি ব্যবহার করা প্রয়োজন। ডিজিটাল প্লাটফর্মের এই সুবিধাকে পুরোপুরি উপভোগ করতে হলে এবং প্রতারণার হাত থেকে বাঁচতে হলে সঠিক জ্ঞান ও সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। ডিজিটাল কেনাকাটা যেমন সম্ভাবনাময়, তেমনি আমাদের সাবধান হওয়ারও প্রয়োজন। সচেতনতা এবং সাবধানতার মাধ্যমে আমরা ডিজিটাল কেনাকাটাকে একটি নিরাপদ ও কার্যকর উপায়ে উপভোগ করতে পারি।

