দেশে তীব্র গ্যাস সংকট ও আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজির দাম বাড়ার মধ্যে সরবরাহের উৎস বাড়াতে নতুন স্পট এলএনজি সরবরাহকারীদের জন্য প্রবেশের শর্ত অনেকটাই সহজ করেছে পেট্রোবাংলা।
রাষ্ট্রীয় সংস্থাটি এখন মাত্র একটি সফলভাবে সম্পন্ন এলএনজি সরবরাহ চুক্তির অভিজ্ঞতা এবং ৫ কোটি ডলার আর্থিক সক্ষমতা থাকলেই কোনো প্রতিষ্ঠানকে সরবরাহকারী হিসেবে তালিকাভুক্তির জন্য আবেদন করার সুযোগ দিচ্ছে। গত মার্চে নির্ধারণ করা অভিজ্ঞতা, আর্থিক সক্ষমতা ও পরিচালনাগত যোগ্যতার তুলনায় এটি বড় ধরনের শিথিলতা।
দেশের এলএনজি আমদানির জন্য এমনিতেই কঠিন সময় যাচ্ছে। দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে (এফএসআরইউ) সরবরাহে বিঘ্ন, কার্গো পৌঁছাতে সমস্যা এবং বিশ্ববাজারে সরবরাহ সংকটের কারণে আগস্টে দেশে গড়ে দৈনিক ২ হাজার ২৩৫ মিলিয়ন ঘনফুট (এমএমসিএফডি) গ্যাস সরবরাহ করা হয়েছে। গত এক দশকের মধ্যে আগস্ট মাসে এটিই সর্বনিম্ন সরবরাহ।
অথচ সরকারি হিসাব অনুযায়ী, ওই সময়ে দেশে গ্যাসের চাহিদা ছিল প্রায় ৩ হাজার ৮৬০ এমএমসিএফডি।
গ্যাসের স্বল্প চাপের কারণে শিল্পকারখানাগুলো যখন সমস্যায় পড়েছে এবং জ্বালানির অভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদনও ব্যাহত হয়েছে, তখন সরকারকে জরুরি ভিত্তিতে সরাসরি এলএনজি কিনতে হয়েছে।
এর মধ্যে স্পট এলএনজির দামও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। গত সপ্তাহে বাংলাদেশ প্রতি মিলিয়ন ব্রিটিশ থার্মাল ইউনিট (এমএমবিটিইউ) ২৮ ডলারের বেশি দামে একটি এলএনজি কার্গো কেনার অনুমোদন দিয়েছে, যা ২০২২ সালের পর সর্বোচ্চ। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ বিশ্ববাজারে সরবরাহে প্রভাব ফেলার আগে বাংলাদেশ সাধারণত স্পট এলএনজির জন্য প্রতি এমএমবিটিইউ ১০ থেকে ১২ ডলার পরিশোধ করত।
এই পরিস্থিতিতে গত ২৯ আগস্ট ‘সংশোধিত মানদণ্ডে’ আরও এলএনজি সরবরাহকারী তালিকাভুক্ত করতে নতুন আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করেছে পেট্রোবাংলা।
মার্চে জারি করা নিয়ম অনুযায়ী, আবেদনকারী প্রতিষ্ঠানের অন্তত দুই বছরের এলএনজি সরবরাহের অভিজ্ঞতা থাকতে হতো। পাশাপাশি আগের পাঁচ বছরের মধ্যে অন্তত দুই বছরে প্রতিবার ন্যূনতম ৫ লাখ টন করে এলএনজি সরবরাহের অভিজ্ঞতাও প্রয়োজন ছিল।
নতুন নিয়মে এসব শর্ত অনেকটাই সহজ করা হয়েছে। এখন শুধু একটি সফলভাবে সম্পন্ন এলএনজি সরবরাহ চুক্তির অভিজ্ঞতা থাকলেই আবেদন করা যাবে। কোনো ন্যূনতম সরবরাহের পরিমাণও নির্ধারণ করা হয়নি।
আর্থিক সক্ষমতার ক্ষেত্রেও শর্ত কমানো হয়েছে। আগে আগের তিন অর্থবছরের মধ্যে অন্তত দুই বছর ১০ কোটি ডলার নিট সম্পদের মালিকানা দেখাতে হতো। এখন প্রয়োজন ৫ কোটি ডলার। এ শর্ত পূরণ করা যাবে নগদ বা তরল সম্পদ, কার্যকরী মূলধন, ঋণসুবিধা কিংবা ব্যাংকের আর্থিক সক্ষমতার মাধ্যমে।
এ ছাড়া আরও কয়েকটি যোগ্যতার শর্ত বাদ দেওয়া হয়েছে।
আবেদনকারীকে এখন আর ভাসমান স্টোরেজ ও রিগ্যাসিফিকেশন ইউনিট (এফএসআরইউ) ভিত্তিক টার্মিনালে এলএনজি সরবরাহের অভিজ্ঞতা দেখাতে হবে না। কমপক্ষে ৯১ শতাংশ মিথেনযুক্ত ‘লিন এলএনজি’ সরবরাহের সক্ষমতার প্রমাণও আর প্রয়োজন নেই।
গত পাঁচ বছরে কোনো এলএনজি কার্গো সরবরাহ ব্যর্থ হয়নি—এমন তথ্য দেওয়ার শর্তও তুলে দেওয়া হয়েছে। একইভাবে নিজস্ব বা চার্টার করা এলএনজি পরিবহনকারী জাহাজ থাকার শর্তও আর প্রযোজ্য নয়।
আগের নিয়মে আবেদনকারী প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে গত পাঁচ বছরে সর্বোচ্চ তিনটির বেশি সালিশি রায় থাকা যাবে না বলে শর্ত ছিল। নতুন নিয়মে সালিশি-সংক্রান্ত ইতিহাস জমা দেওয়ার প্রয়োজনও রাখা হয়নি।
যৌথ উদ্যোগের ক্ষেত্রেও শর্ত শিথিল করা হয়েছে। এখন প্রধান অংশীদারের একটি সফলভাবে সম্পন্ন এলএনজি সরবরাহ চুক্তির অভিজ্ঞতা থাকলেই হবে। ৫ কোটি ডলারের আর্থিক সক্ষমতার শর্তও অংশীদারদের মধ্যে ভাগ করা যাবে। প্রধান অংশীদারকে এর ৭৫ শতাংশ এবং অন্য অংশীদার বা অংশীদারদের বাকি ২৫ শতাংশ পূরণ করতে হবে।
নতুন এসব শর্তের ফলে তুলনামূলক কম সময় ধরে ব্যবসা করা এলএনজি ব্যবসায়ী, কম আর্থিক সক্ষমতার প্রতিষ্ঠান এবং নিজস্ব বা চার্টার করা এলএনজি জাহাজ নেই—এমন প্রতিষ্ঠানও পেট্রোবাংলার সরবরাহকারী তালিকায় ঢোকার সুযোগ পেতে পারে।
তবে মাত্র কয়েক মাস আগে চালু করা কঠোর শর্তগুলো কেন এত দ্রুত শিথিল করা হলো, সে বিষয়ে পেট্রোবাংলা কোনো ব্যাখ্যা দেয়নি।
পেট্রোবাংলার পরিচালক (অপারেশনস অ্যান্ড মাইনস) মো. শোয়েব, যিনি তালিকাভুক্তি প্রক্রিয়ার যোগাযোগের দায়িত্বে রয়েছেন, দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, আরও বেশি সরবরাহকারী আকৃষ্ট করতেই এই পরিবর্তন আনা হয়েছে।
তিনি বলেন, স্পট এলএনজি বাজারে আরও বেশি অংশগ্রহণকারী চায় পেট্রোবাংলা।
সম্ভাব্য সরবরাহকারীদের নিয়ে আজ একটি ভার্চুয়াল প্রি-অ্যাপ্লিকেশন সভা হওয়ার কথা রয়েছে। আবেদন জমা দেওয়ার শেষ সময় ১৫ সেপ্টেম্বর।
তবে নতুন এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বর্তমান সরবরাহকারীদের বাদ দেওয়া হবে না। ইতোমধ্যে স্পট এলএনজি সরবরাহের জন্য তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোকেও নতুন করে আবেদন করতে হবে না।
পেট্রোবাংলার সর্বশেষ স্পট এলএনজি দরপত্রের তালিকায় বর্তমানে ৩০টি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। নতুন উদ্যোগের ফলে এই সরবরাহকারী তালিকা আরও বড় হতে পারে। বিশেষ করে ২০২৪ সালের আগস্টে সরকার পরিবর্তনের পর তালিকাটি উল্লেখযোগ্যভাবে সম্প্রসারিত হয়েছে।
এর আগে পেট্রোবাংলার ২৩টি সরবরাহকারীর সঙ্গে মাস্টার সেল অ্যান্ড পারচেজ অ্যাগ্রিমেন্ট (এমএসপিএ) থাকলেও স্পট এলএনজি কেনাকাটা মূলত চার-পাঁচটি প্রতিষ্ঠানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল।
পরবর্তী সময়ে অন্তর্বর্তী সরকার কুইক এনহ্যান্সমেন্ট অব ইলেকট্রিসিটি অ্যান্ড এনার্জি সাপ্লাই (স্পেশাল প্রভিশনস) অ্যাক্ট, ২০১০-এর আওতায় এলএনজি কেনাকাটা স্থগিত করে সরকারি ক্রয় কাঠামোর অধীনে স্পট এলএনজি সংগ্রহ শুরু করে।
সর্বশেষ এই সরবরাহকারী তালিকাভুক্তির কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে পাবলিক প্রকিউরমেন্ট রুলস (পিপিআর) ২০২৫-এর আওতায়।

