চালুর মাত্র চার মাসের মাথায় আবারও উৎপাদন বন্ধ হয়ে গেল চট্টগ্রামের আনোয়ারায় অবস্থিত বহুজাতিক সার কারখানাটির। একই সময়ে পাশাপাশি অবস্থিত আরও দুটি সার কারখানাও উৎপাদনের বাইরে থাকায় দেশের সার সরবরাহ ব্যবস্থায় নতুন করে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে।
সোমবার বেলা এগারোটা থেকে কারখানাটির উৎপাদন সম্পূর্ণরূপে বন্ধ হয়ে যায়। একই সময় থেকে কারখানায় গ্যাস সরবরাহও উল্লেখযোগ্য হারে কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। বিষয়টি জানাজানি হয় মঙ্গলবার সকালে।
গ্যাস সরবরাহকারী সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, এতদিন কারখানাটিতে দৈনিক প্রায় পঞ্চাশ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হলেও সোমবার থেকে তা কমিয়ে সাড়ে পাঁচ মিলিয়ন ঘনফুটে নামিয়ে আনা হয়েছে। সরকারি নির্দেশনা এবং কারখানার প্রকৃত চাহিদার ভিত্তিতেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলী। তার ভাষ্যমতে, মন্ত্রণালয় ও ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের পরবর্তী নির্দেশনা অনুযায়ী ভবিষ্যতে পূর্ণমাত্রায় সরবরাহ পুনরায় চালু করা হবে।
তবে কারখানা কর্তৃপক্ষের ভাষ্য কিছুটা ভিন্ন। তাদের দাবি, গ্যাস সরবরাহ হ্রাস উৎপাদন বন্ধের মূল কারণ নয়। বরং নিয়ম অনুযায়ী প্রতি তিন বছর অন্তর কারখানায় যে বড় ধরনের রক্ষণাবেক্ষণ কার্যক্রম পরিচালিত হয়, এবারও তারই অংশ হিসেবে উৎপাদন সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে। কারখানার একজন শীর্ষ কর্মকর্তা জানান, প্ল্যান্টের সচলতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এই ওভারহোলিং প্রক্রিয়া চলে সাধারণত এক থেকে দেড় মাস ধরে, এরপর কারখানাটি আবার পূর্ণ উৎপাদনে ফিরে আসবে।
প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এর আগে দীর্ঘ প্রায় দুই মাস গ্যাস সংকটে বন্ধ থাকার পর মে মাসের শুরুতে কারখানাটিতে আবার গ্যাস সরবরাহ শুরু হয়েছিল এবং কিছুদিন পর থেকে উৎপাদনও পুনরায় চালু হয়। তখন দৈনিক প্রায় আঠারোশ মেট্রিক টন ইউরিয়া উৎপাদিত হচ্ছিল। বর্তমানে কারখানাটির দৈনিক পনেরোশ থেকে আঠারোশ মেট্রিক টন ইউরিয়া এবং প্রায় পনেরোশ মেট্রিক টন অ্যামোনিয়া উৎপাদনের সক্ষমতা রয়েছে, যার জন্য দৈনিক বত্রিশ থেকে পঞ্চাশ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের প্রয়োজন হয়।
এই কারখানার উৎপাদন বন্ধ থাকার প্রভাব পড়তে পারে পাশেই অবস্থিত রাষ্ট্রায়ত্ত একটি ডিএপি সার কারখানার ওপরও, কারণ সেই কারখানার উৎপাদন প্রক্রিয়া মূলত এই কারখানা থেকে সরবরাহকৃত অ্যামোনিয়ার ওপর নির্ভরশীল।
এই কারখানার ঠিক পাশেই অবস্থিত আরেকটি রাষ্ট্রায়ত্ত ইউরিয়া সার কারখানা দীর্ঘদিন ধরে উৎপাদনের বাইরে রয়েছে। গ্যাস সংকটের কারণে চলতি বছরের মার্চের শুরুতে এই কারখানার উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায়। আগস্টের শেষ নাগাদ কারখানাটি টানা সাড়ে পাঁচ মাসেরও বেশি সময় ধরে বন্ধ ছিল।
কারখানা কর্মকর্তাদের ভাষ্যমতে, গ্যাস সংকট ও যান্ত্রিক ত্রুটি—এই দুই কারণেই বিভিন্ন সময়ে কারখানাটির উৎপাদন বারবার ব্যাহত হয়েছে। পূর্ণমাত্রায় উৎপাদন চালাতে দৈনিক আটচল্লিশ থেকে বায়ান্ন মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের প্রয়োজন হয়। একসময় দৈনিক প্রায় সতেরোশ মেট্রিক টন ইউরিয়া উৎপাদনের সক্ষমতা থাকলেও বর্তমানে এই কার্যকর সক্ষমতা কমে এসেছে।
কারখানাটির উৎপাদন বন্ধের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে এটি মাত্র পাঁচ দিন সচল ছিল। এরপর একাধিকবার চালু ও বন্ধের ঘটনা ঘটেছে—কখনো গ্যাস সংকটে, কখনো যান্ত্রিক ত্রুটিতে। সবশেষ আগস্টের শেষ সপ্তাহে গ্যাস সরবরাহ পুনরায় শুরু হলেও প্রায় তেরো দিন পেরিয়ে গেলেও কারখানাটি এখনো উৎপাদনে ফিরতে পারেনি।
আনোয়ারার রাঙ্গাদিয়ায় অবস্থিত দেশের একমাত্র রাষ্ট্রায়ত্ত ডাই-অ্যামোনিয়াম ফসফেট সার কারখানাটিও দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ রয়েছে। এপ্রিল মাসের মাঝামাঝি সময়ে কারখানায় মজুত থাকা অ্যামোনিয়া শেষ হয়ে যাওয়ায় প্রথম দফায় এর উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায়। এরপর প্রতিবেশী কারখানা থেকে অ্যামোনিয়া সরবরাহ পাওয়ায় মে মাসের শুরুতে কারখানাটি আবার উৎপাদনে ফেরে। কিন্তু জর্ডান থেকে আমদানিকৃত ফসফরিক অ্যাসিডের সরবরাহে সংকট দেখা দেওয়ায় জুন মাসের শেষভাগ থেকে কারখানাটির উৎপাদন আবার সম্পূর্ণরূপে বন্ধ হয়ে যায়। কারখানাটিতে দৈনিক প্রায় ছয়শ টন ফসফরিক অ্যাসিডের প্রয়োজন হয় এবং সর্বোচ্চ প্রায় বিশ হাজার মেট্রিক টন মজুত রাখার সক্ষমতা রয়েছে, তবে সরবরাহ স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত উৎপাদন পুনরায় চালুর কোনো সুযোগ নেই বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ। কারখানাটির দুটি ইউনিট মিলিয়ে দৈনিক মোট ষোলোশ টন ডিএপি সার উৎপাদনের সক্ষমতা রয়েছে।
চট্টগ্রামের এই তিন গুরুত্বপূর্ণ সার কারখানার উৎপাদন বারবার ব্যাহত হওয়ায় দেশের সামগ্রিক সার সরবরাহ ব্যবস্থায় এর প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। গ্যাস সংকট, যান্ত্রিক ত্রুটি এবং আমদানিনির্ভর কাঁচামালের অনিশ্চয়তা—এই তিন কারণেই কারখানাগুলো দীর্ঘ সময় ধরে বন্ধ থাকছে।
চলতি অর্থবছরে দেশে ইউরিয়া সারের চাহিদা প্রায় ছাব্বিশ লাখ বিশ হাজার মেট্রিক টন বলে সংসদে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী। এর মধ্যে রাষ্ট্রীয় শিল্প সংস্থার কারখানাগুলো থেকে প্রায় দশ লাখ টন উৎপাদনের বিপরীতে বাকি প্রায় ষোলো লাখ টন আমদানি করতে হতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে।
বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, দেশীয় উৎপাদন এভাবে বারবার ব্যাহত হতে থাকলে আমদানিনির্ভরতা আরও বাড়বে। কারখানার নির্ধারিত রক্ষণাবেক্ষণ কার্যক্রম দ্রুত সম্পন্ন করে উৎপাদনে ফেরানো এবং অন্য দুই কারখানায় প্রয়োজনীয় গ্যাস ও কাঁচামালের সরবরাহ নিশ্চিত করা না গেলে আসন্ন কৃষি মৌসুমে দেশে সার সরবরাহে বাড়তি চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে বলে মত দিয়েছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।

