শহরের চেয়ে গ্রামে এখন মূল্যস্ফীতির চাপ বেশি। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) আগস্টের প্রতিবেদন বলছে, গ্রামে সার্বিক মূল্যস্ফীতি ৮ দশমিক ৩১ শতাংশ, অথচ শহরে তা ৮ দশমিক ২০ শতাংশ। অথচ গ্রামই তো খাদ্যপণ্যের প্রধান উৎপাদন কেন্দ্র। সেখানে উৎপাদিত পণ্য শহরে যায়, আর শহরে সব পণ্যের দাম বেশি হয়, এই স্বাভাবিক চিত্রের উল্টোটা এখন দেখা যাচ্ছে। গ্রামের মানুষ কম আয়ে বেশি দামে পণ্য কিনতে বাধ্য হচ্ছেন।
আগস্টে সার্বিক মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমে ৮ দশমিক ২৬ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। এটি ১০ মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন। খাদ্যপণ্যের দাম কিছুটা কমায় এই পতন হয়েছে। আগস্টে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ছিল ৭ দশমিক ০২ শতাংশ। কিন্তু খাদ্য-বহির্ভূত পণ্য ও সেবার মূল্যস্ফীতি বেড়ে ৯ দশমিক ৩২ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। আর এখানেই লুকিয়ে আছে গ্রামীণ মানুষের আসল সংকট।
গ্রামে খাদ্য-বহির্ভূত খাতে মূল্যস্ফীতি বেড়ে হয়েছে ৯ দশমিক ৫৯ শতাংশ। শহরে এই হার ৮ দশমিক ৯৭ শতাংশ। অর্থাৎ পোশাক, আসবাব, শিক্ষাসামগ্রী, পরিবহন, এসব পণ্য কিনতে গ্রামের মানুষকে শহরের চেয়েও বেশি দাম দিতে হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি উদ্বেগজনক, কারণ গ্রামে আয় ও কর্মসংস্থান যেমন সীমিত, সেখানে খাদ্য-বহির্ভূত পণ্যের দাম বেশি হলে নিম্ন আয়ের মানুষের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি হয়।
বিবিএসের হাউজহোল্ড ইনকাম অ্যান্ড এক্সপেন্ডিচার সার্ভে অনুযায়ী, শহরে মানুষের মাসিক মাথাপিছু গড় আয় ১০ হাজার ৯৫১ টাকা। অন্যদিকে গ্রামে তা মাত্র ৬ হাজার ৯১ টাকা। অর্থাৎ শহরের একজন মানুষ গ্রামের চেয়ে মাসে ৪ হাজার ৮৬০ টাকা বেশি আয় করেন। অথচ গ্রামে দাম বেশি। এই আয়-ব্যয়ের অসমতা দিন দিন বাড়ছে।
শুধু মূল্যস্ফীতি বাড়ছে না, মজুরিও তাল মেলাতে পারছে না। আগস্টে জাতীয় গড় মজুরি হার হয়েছে ৮ দশমিক ০৫ শতাংশ। অর্থাৎ মূল্যস্ফীতি যত কমেছে, তার চেয়ে মজুরি কম বেড়েছে। ফলে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমছে। বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) গবেষণা পরিচালক ড. মোহাম্মদ ইউনূস বলেছেন, ‘গ্রামীণ এলাকায় সাধারণত উৎপাদক ও নিম্ন আয়ের মানুষ বাস করে। সেখানে মূল্যস্ফীতির চাপ বেশি হওয়া উদ্বেগজনক। এটি কমাতে বাজার ব্যবস্থাপনায় জোর দিতে হবে’।
গ্রামে উৎপাদিত পণ্য শহরে পৌঁছাতে গেলে মধ্যবর্তী পর্যায়ে অতিরিক্ত ব্যয় বাড়ে, যা গ্রামের মানুষের ওপর চাপ ফেলে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, খাদ্য-বহির্ভূত পণ্যের দাম গ্রামে বেশি হওয়া স্বাভাবিক নয়। কারণ এসব পণ্য সাধারণত শহর থেকে গ্রামে যায়, ফলে পরিবহন ও মজুত খরচ গ্রামে দাম বাড়িয়ে দেয়। কিন্তু শহরের তুলনায় গ্রামে দাম বেশি হলে তা সীমিত আয়ের মানুষের সংসার চালানোর খরচ আরও বাড়িয়ে দেয়।

