চলমান গ্যাস ও জ্বালানি সংকটের মধ্যে দেশের বিদ্যুৎ ঘাটতি কমাতে চলতি সপ্তাহেই জাতীয় গ্রিডে প্রায় ১ হাজার ২১০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ যুক্ত হতে যাচ্ছে। চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়া পাঁচটি বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে ৫৫০ মেগাওয়াট এবং ৬৬০ মেগাওয়াটের রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি ইউনিট থেকে আরও ৬৬০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়ার আশা করছে সরকার।
সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) জাতীয় সংসদে দেশের চলমান জ্বালানি সংকট নিয়ে বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমানের উত্থাপিত আলোচনায় অংশ নিয়ে এ তথ্য জানান বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম আমিত।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় সরকারের স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা রয়েছে। আগামী বছর পরিস্থিতির উন্নতি হবে বলে আশা প্রকাশ করে তিনি বলেন, ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশ জ্বালানি সংকট কাটিয়ে উঠতে পারবে।
তিনি জানান, চুক্তির মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়া পাঁচটি বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে চলতি সপ্তাহে প্রায় ৫০০ থেকে ৫৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হবে। এসব কেন্দ্র থেকে উৎপাদিত বিদ্যুতের জন্য কোনো ক্যাপাসিটি চার্জ দিতে হবে না।
এ ছাড়া এইচএফওচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রের মাধ্যমে সর্বোচ্চ ৪ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য সরকার ৬ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ করেছে। একই সঙ্গে ৬৬০ মেগাওয়াটের রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি ইউনিটও এক সপ্তাহের মধ্যে পুনরায় উৎপাদনে ফেরার কথা রয়েছে।
জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় সমুদ্রসীমায় তেল ও গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য অফশোর বিডিং রাউন্ড শুরু হয়েছে বলে জানান প্রতিমন্ত্রী। পাশাপাশি ১০৬টি নতুন গ্যাসকূপ খননের কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ৩০টি কূপের খননকাজ ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে।
তিনি আরও জানান, চলতি বছরের শেষ নাগাদ অন্তত দুটি নতুন ফ্লোটিং স্টোরেজ অ্যান্ড রিগ্যাসিফিকেশন ইউনিট (এফএসআরইউ) স্থাপনের জন্য চুক্তি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। মাতারবাড়ীতে স্থলভিত্তিক এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের প্রস্তুতিও এগিয়ে চলছে।
প্রতিমন্ত্রীর তথ্য অনুযায়ী, বৈশ্বিক জ্বালানির দাম বৃদ্ধি এবং মধ্যপ্রাচ্যের সংকটের কারণে স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি কেনার ব্যয় ১৫ হাজার ৩৫০ কোটি টাকা বেড়েছে।
এদিকে ইস্টার্ন রিফাইনারির দ্বিতীয় ইউনিট চালু হলে দেশের বার্ষিক অপরিশোধিত জ্বালানি তেল পরিশোধন ক্ষমতা ১৫ লাখ টন থেকে বেড়ে ৪৫ লাখ টনে উন্নীত হবে।
ইস্টার্ন রিফাইনারি আধুনিকায়ন প্রকল্পে ১ বিলিয়ন ডলারের বেশি অর্থায়ন করবে জেদ্দাভিত্তিক ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (আইএসডিবি)। গত ৩ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ সরকার ও আইএসডিবির মধ্যে এ বিষয়ে অর্থায়ন চুক্তি হয়েছে।
বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়াতে ছাদ ও জমিভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প সম্প্রসারণের জন্যও একটি টেকসই পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে বলে জানান প্রতিমন্ত্রী। সরকারের শুল্কমুক্ত সুবিধা নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বড় পরিবর্তন আনবে বলেও তিনি আশা প্রকাশ করেন।
মধ্যপ্রাচ্যের সংকটের পর অস্ট্রেলিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রসহ উন্নত দেশগুলোতেও জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হয়েছে বলে সংসদে জানান আমিত। তবে প্রতিবেশী দেশগুলোতে জ্বালানি পাচার ঠেকাতে বাংলাদেশে দাম সমন্বয় করা হয়েছে বলে তিনি জানান।
১৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত সমন্বিত জ্বালানি মূল্য কার্যকরের সময়ে সরকারকে ২৫ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দিতে হয়েছে বলেও জানান তিনি।
আলোচনায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, আগের সরকারের আমলে নেওয়া আমদানিনির্ভর নীতির পরিবর্তে জ্বালানি খাতকে স্বয়ংসম্পূর্ণ করার চেষ্টা করছে বর্তমান সরকার।
সংসদে আলোচনার সূত্রপাত করে বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান বলেন, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় সরকারকে বাস্তবভিত্তিক ও টেকসই নীতি গ্রহণ করতে হবে।
তিনি রাজনৈতিক দল ও কারিগরি বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে একটি বিশেষ টাস্কফোর্স গঠনের প্রস্তাব দেন। একই সঙ্গে দেশের বিদ্যুৎ ঘাটতির প্রকৃত চিত্র জনগণের সামনে স্পষ্টভাবে তুলে ধরার আহ্বান জানান তিনি।
শফিকুর রহমান বলেন, একে অন্যকে দোষারোপ করে এই সংকটের সমাধান হবে না। বড় বড় জ্বালানি প্রকল্পে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করারও দাবি জানান তিনি।
এ ছাড়া সংসদে দেওয়া প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী মিটার ভাড়া ও ডিমান্ড চার্জ বন্ধের দাবি জানান বিরোধীদলীয় নেতা। জবাবে প্রতিমন্ত্রী বলেন, পুরোপুরি মিটার ভাড়া তুলে দিতে সরকারের প্রায় ২৯ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন হবে।
তিনি জানান, ২০৩০ সালের মধ্যে অধিকাংশ গ্রাহককে স্মার্ট প্রিপেইড মিটারের আওতায় আনার লক্ষ্য রয়েছে সরকারের। এর মাধ্যমে বিলিং ব্যবস্থার অনিয়ম দূর করার চেষ্টা করা হবে।

