দেশের চলমান জ্বালানি সংকট এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে সরকারের জোরালো উদ্যোগের মধ্যে সৌর বিদ্যুতের সরঞ্জাম উৎপাদনে বড় বিনিয়োগের পথে যাচ্ছে প্রাণ-আরএফএল ও ওয়ালটন। দুই শিল্পগোষ্ঠী দেশে সৌর ইনভার্টার ও লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারি তৈরির কারখানা স্থাপন করছে। পাশাপাশি সৌর প্যানেল তৈরির জন্যও আলাদা কারখানা করার পরিকল্পনা করছে ওয়ালটন।
ব্যবসায়িক দুই গোষ্ঠীর কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এসব উদ্যোগের মূল লক্ষ্য হলো সৌর সরঞ্জামের আমদানিনির্ভরতা কমানো এবং দেশে একটি পূর্ণাঙ্গ সৌরবিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থা গড়ে তোলা।
একই সঙ্গে দেশজুড়ে ছোট, মাঝারি ও বড় আকারের সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পেও বিনিয়োগ করতে চায় প্রাণ-আরএফএল ও ওয়ালটন। ক্যাপেক্স মডেলের এসব প্রকল্পে তারা সরঞ্জাম সরবরাহের পাশাপাশি পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ সেবা দেবে। সরকারি ও বেসরকারি—দুই ধরনের গ্রাহককেই এসব সেবা দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় এবং দুই শিল্পগোষ্ঠীর কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, গত ১ আগস্ট বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তাদের সঙ্গে এক বৈঠকের পর এসব পরিকল্পনা গতি পায়। ওই বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ব্যবসায়ীদের নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বড় বিনিয়োগের আহ্বান জানান।
প্রাণ-আরএফএলের সৌর কারখানা ও বিদ্যুৎ উৎপাদন
প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের মার্কেটিং ডিরেক্টর কামাল কামরুজ্জামান জানিয়েছেন, নরসিংদীর পলাশে ১০ লাখ ডলার বিনিয়োগে সৌর ইনভার্টার তৈরির একটি কারখানার কাজ শুরু হয়েছে।
তিনি বলেন, আগামী তিন থেকে চার মাসের মধ্যে কারখানাটিতে উৎপাদন শুরু হতে পারে। সেখানে মাসে সর্বোচ্চ ১ হাজারটি ইনভার্টার তৈরি করা যাবে। এসব ইনভার্টারের ক্ষমতা হবে ১ কিলোওয়াট থেকে ৫ কিলোওয়াট। পাশাপাশি স্টোরেজ ব্যাটারিও তৈরি করা হবে।
প্রাণ-আরএফএল হবিগঞ্জে আরও একটি ইনভার্টার কারখানা স্থাপনের পরিকল্পনা করছে। এতে প্রায় ৪০ লাখ ডলার বিনিয়োগ হতে পারে।
এ পর্যন্ত সৌর জ্বালানি খাতে প্রাণ-আরএফএলের বিনিয়োগ প্রায় ১০০ কোটি টাকা। প্রতিষ্ঠানটি বর্তমানে ৪০ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন করছে। চলতি বছরের শেষ নাগাদ উৎপাদন সক্ষমতা ১০০ মেগাওয়াটে উন্নীত করার লক্ষ্য রয়েছে।
কামাল কামরুজ্জামান বলেন, ২০২৮ অর্থবছরের মধ্যে প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের বিদ্যুতের পুরো চাহিদা সৌরবিদ্যুৎ দিয়ে পূরণের লক্ষ্য নিয়ে বিনিয়োগ পরিকল্পনা সাজানো হয়েছে। ওই সময় গ্রুপটির মোট বিদ্যুৎ চাহিদা প্রায় ২৫০ মেগাওয়াটে পৌঁছাতে পারে। সেই অনুযায়ী সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতাও ২৫০ মেগাওয়াট বা তার বেশি করার পরিকল্পনা রয়েছে।
দেশে উৎপাদন শুরু হলে প্রাণ-আরএফএল তৃতীয় পক্ষের বাণিজ্যিক ও আবাসিক গ্রাহকদের জন্য সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন ও রক্ষণাবেক্ষণ সেবা আরও বাড়াবে। পাশাপাশি সরকারি প্রকল্পের জন্যও দরপত্রে অংশ নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে প্রতিষ্ঠানটির।
উৎপাদন বাড়াচ্ছে ওয়ালটন
গাজীপুরের চন্দ্রায় সৌর ইনভার্টার তৈরির কারখানা স্থাপনের কাজ শুরু করেছে ওয়ালটন। একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটি লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারি তৈরির কারখানার কাজ শেষ করেছে। আগামী এক মাসের মধ্যে সেখানে বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু হওয়ার কথা রয়েছে।
ওয়ালটন গ্রুপের ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড রিনিউএবল এনার্জি বিভাগের নির্বাহী পরিচালক ও প্রধান মো. নজমুল ইসলাম এ তথ্য জানিয়েছেন।
বর্তমানে ওয়ালটন চীন থেকে অরিজিনাল ইকুইপমেন্ট ম্যানুফ্যাকচারার বা OEM হিসেবে ARC ইনভার্টার আমদানি করে এবং সেগুলো স্থানীয়ভাবে ওয়ালটনের ব্র্যান্ডে বাজারজাত করে।
ওয়ালটন জানিয়েছে, দেশে লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারি, সৌর ইনভার্টার এবং সৌর প্যানেল তৈরির কারখানা স্থাপনের লক্ষ্য হলো স্থানীয় উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানো, আমদানিনির্ভরতা কমানো, কার্বন নিঃসরণ হ্রাস করা এবং শিল্প খাতে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা।
বছরে প্রায় ১৫ মিলিয়ন ডলারের ইনভার্টার আমদানি
সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থায় সৌর প্যানেলের ফটোভোলটাইক সেল সূর্যের আলোকে সরাসরি বিদ্যুৎ বা DC বিদ্যুতে রূপান্তর করে। এরপর ইনভার্টার সেই DC বিদ্যুৎকে AC বিদ্যুতে রূপান্তর করে, যা বাসাবাড়ির বিভিন্ন যন্ত্র চালাতে এবং অতিরিক্ত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করতে ব্যবহার করা যায়।
বাংলাদেশে বর্তমানে সৌর ইনভার্টার তৈরির কোনো স্থানীয় কারখানা নেই। চীন, জাপান ও ভারত থেকে বেশির ভাগ ইনভার্টার আমদানি করা হয়। বছরে এসব ইনভার্টার আমদানিতে প্রায় ১৫ মিলিয়ন ডলার ব্যয় হয়।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, গত ডিসেম্বর থেকে মে পর্যন্ত বাংলাদেশে ৪২৯ দশমিক ৪ টন সৌর ইনভার্টার আমদানি হয়েছে।
অন্যদিকে লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারি সৌর প্যানেল থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎ সংরক্ষণ করে রাখে। ফলে সূর্যের আলো না থাকলেও, বিশেষ করে রাতে বা বিদ্যুতের চাহিদা বেশি থাকা সময়ে সেই বিদ্যুৎ ব্যবহার করা যায়। বাসাবাড়ির ছাদে ছোট সৌর ব্যবস্থা থেকে শুরু করে বড় সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্রেও এসব ব্যাটারি ব্যবহার করা যায়।
দেশীয় উৎপাদনে কর সুবিধা
দেশে সৌর সরঞ্জাম উৎপাদনে উৎসাহ দিতে সরকার ইনভার্টার, ব্যাটারি ও সৌর প্যানেল তৈরির কাঁচামাল আমদানিতে শুল্ক কমিয়ে ১ শতাংশ করেছে।
অন্যদিকে বাণিজ্যিকভাবে তৈরি পণ্য আমদানিতে ইনভার্টারের ওপর প্রায় ২৮ শতাংশ, সৌর প্যানেলের ওপর ৬৩ শতাংশ এবং ব্যাটারির ওপর ২৯ শতাংশ শুল্ক দিতে হয়।
সরকার চলতি বছরের শেষ নাগাদ ৪ হাজার মেগাওয়াট এবং ২০৩০ সালের মধ্যে ১০ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে।
সম্প্রতি নেট মিটারিং ব্যবস্থাও চালু করা হয়েছে। এর আওতায় সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনকারীরা নিজেদের প্রয়োজনের অতিরিক্ত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে প্রতি ইউনিট ১০ টাকা ৫০ পয়সা দরে বিক্রি করতে পারবেন। এর সঙ্গে অতিরিক্ত মুনাফার প্রণোদনাও রয়েছে।
সরঞ্জাম থেকে বিদ্যুৎকেন্দ্র—পুরো সেবা দিতে চায় দুই প্রতিষ্ঠান
বিদ্যুৎ সংকট, সরকারি প্রণোদনা এবং শুল্ক সুবিধার কারণে দেশে সৌর প্যানেল, ইনভার্টার ও লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারির চাহিদা আরও বাড়বে বলে মনে করছেন শিল্পসংশ্লিষ্টরা।
দেশের বিভিন্ন বাসাবাড়িতে বহু বছর ধরে সৌর প্যানেল ব্যবহৃত হলেও পর্যাপ্ত রক্ষণাবেক্ষণ ও বিক্রয়-পরবর্তী সেবার অভাবে অনেকেই বড় পরিসরে বিনিয়োগে আগ্রহী হন না।
এই পরিস্থিতি বদলাতে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থার জন্য শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সেবা দেওয়ার পরিকল্পনা করছে প্রাণ-আরএফএল ও ওয়ালটন। এ ব্যবস্থায় গ্রাহক নিজে বিনিয়োগ করবেন, আর প্রতিষ্ঠানগুলো চুক্তি অনুযায়ী সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব নেবে। চাইলে গ্রাহক নিজেও ব্যবস্থাটির রক্ষণাবেক্ষণ করতে পারবেন।
সরকারি সংস্থাগুলোর জন্য সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের সুযোগও খুঁজছে দুই শিল্পগোষ্ঠী। এসব প্রকল্প পেতে তাদের সরকারি দরপত্রে প্রতিযোগিতা করতে হবে।

