দেশে যখন গ্যাসের ঘাটতি মেটাতে বাড়ছে এলএনজি আমদানির চাপ, তখন বিতরণ ব্যবস্থাতেই প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ গ্যাস হিসাবের বাইরে থেকে যাচ্ছে। দেশের সবচেয়ে বড় গ্যাস বিতরণ কোম্পানি তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন পিএলসির গত পাঁচ বছরের হিসাব বলছে, এ সময়ে সিস্টেম লস হয়েছে ৪০৯ কোটি ঘনমিটার গ্যাস।
বাংলাদেশে আমদানি করা একটি এলএনজি কার্গোতে সাধারণত প্রায় ৩৩ লাখ ৬০ হাজার এমএমবিটিইউ গ্যাস থাকে। সেই হিসাবে তিতাসের পাঁচ বছরের সিস্টেম লস প্রায় ৪৫ থেকে ৪৮ কার্গো এলএনজির সমপরিমাণ। অর্থাৎ গড়ে প্রতি বছর প্রায় ১০ কার্গো এলএনজির সমপরিমাণ গ্যাস বিতরণ ব্যবস্থায় হিসাবের বাইরে চলে যাচ্ছে।
বর্তমান আন্তর্জাতিক বাজারদর বিবেচনায় এই ক্ষতির আর্থিক মূল্যও বিশাল। গত ২ সেপ্টেম্বর সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি সিঙ্গাপুরভিত্তিক বিপি সিঙ্গাপুর পিটিই লিমিটেডের কাছ থেকে প্রতি এমএমবিটিইউ ২৮ দশমিক ০৩ ডলার দরে এক কার্গো এলএনজি কেনার অনুমোদন দেয়। এতে একটি কার্গোর দাম পড়ে প্রায় ১ হাজার ১৫৬ কোটি টাকা। সে হিসাবে ১০ কার্গো এলএনজির মূল্য দাঁড়ায় প্রায় সাড়ে ১১ হাজার কোটি টাকা।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশের গ্যাসের মজুদ কমে যাওয়া, চলমান সরবরাহ সংকট এবং এলএনজি আমদানিতে বাড়তি ব্যয়ের সময়ে এত বিপুল পরিমাণ গ্যাস সিস্টেম লস হওয়া অত্যন্ত উদ্বেগজনক। বিশেষ করে শিল্প ও বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো যেখানে গ্যাসের অভাবে সক্ষমতার নিচে চলছে, সেখানে বিতরণ ব্যবস্থার এই ক্ষতি পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তুলছে।
অনুমোদিত সীমার প্রায় পাঁচ গুণ সিস্টেম লস
বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন বা বিইআরসি গ্যাস বিতরণে সিস্টেম লসের অনুমোদিত হার ২ শতাংশ নির্ধারণ করেছে। কিন্তু তিতাসের ক্ষেত্রে বাস্তব চিত্র এর চেয়ে অনেক খারাপ।
গত তিন অর্থবছরে তিতাসের সিস্টেম লস প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৫ দশমিক ২৮ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ৪৭ শতাংশে। অর্থাৎ বিইআরসির অনুমোদিত সীমার তুলনায় তিতাসের সিস্টেম লস প্রায় পাঁচ গুণ।
গত পাঁচ অর্থবছরে সিস্টেম লসের কারণে তিতাসের হিসাবের বাইরে চলে যাওয়া গ্যাসের আর্থিক মূল্য প্রায় ৮ হাজার ১৫৬ কোটি টাকা। এর মধ্যে শুধু ২০২৪-২৫ অর্থবছরেই ১৪৪ কোটি ঘনমিটার গ্যাস সিস্টেম লস হয়েছে। এর আর্থিক মূল্য প্রায় ৩ হাজার ৩৫৪ কোটি টাকা।
তিতাসের হিসাব অনুযায়ী, ২০২০-২১ ও ২০২১-২২ অর্থবছরে সিস্টেম লস বিইআরসির নির্ধারিত ২ শতাংশের মধ্যেই ছিল। এরপর থেকেই পরিস্থিতির অবনতি শুরু হয়।
২০২২-২৩ অর্থবছরে ৮১ কোটি ঘনমিটার গ্যাস হিসাবের বাইরে চলে যায়, যার মূল্য ছিল প্রায় ১ হাজার ৩৯১ কোটি টাকা। পরের অর্থবছরে সিস্টেম লস বেড়ে দাঁড়ায় ৭ দশমিক ৬৭ শতাংশে। সে বছর ১২০ কোটি ঘনমিটার গ্যাসের সিস্টেম লস হয়, যার মূল্য প্রায় ২ হাজার ৭১১ কোটি টাকা। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এই পরিমাণ আরও বেড়ে ১৪৪ কোটি ঘনমিটারে পৌঁছায়।
গ্যাস সংকটের মধ্যেই বিপুল ক্ষতি
বাংলাদেশে প্রতিদিন গ্যাসের গড় চাহিদা প্রায় ৩৮০ কোটি ঘনফুট। স্থানীয় উৎপাদন ও দুটি এলএনজি টার্মিনাল মিলিয়ে গড়ে প্রায় ২৬০ কোটি ঘনফুট সরবরাহ করা সম্ভব। তবে সাম্প্রতিক সময়ে সরবরাহ আরও কমেছে।
পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, গত ৬ ও ৭ সেপ্টেম্বর দেশে দৈনিক গড়ে ২৩৩ কোটি ঘনফুট গ্যাস উৎপাদন হয়েছে।
এই বাস্তবতায় ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তিতাসের ১৪৪ কোটি ঘনমিটার সিস্টেম লসের পরিমাণকে দৈনিক সরবরাহের হিসাবে ধরলে প্রায় ১৪ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা সম্ভব হতো। অর্থাৎ ওই পরিমাণ গ্যাস দিয়ে দেশের দৈনিক গ্যাস সরবরাহের প্রায় ৬ শতাংশ চাহিদা পূরণ করা যেত।
তিতাস বর্তমানে ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, নরসিংদী, মুন্সিগঞ্জ, মানিকগঞ্জ, গাজীপুর, টাঙ্গাইল, ময়মনসিংহ, জামালপুর, শেরপুর, নেত্রকোনা ও কিশোরগঞ্জ—এই ১২ জেলায় গ্যাস সরবরাহ করছে।
কোম্পানিটির পাইপলাইন নেটওয়ার্কের দৈর্ঘ্য ১৩ হাজার ৪৩৮ কিলোমিটারের বেশি। ২০২৪-২৫ অর্থবছর শেষে গ্রাহক সংখ্যা ছিল প্রায় ২৭ লাখ ৭৯ হাজার। এর মধ্যে আবাসিক গ্রাহকই ২৭ লাখ ৫৯ হাজারের বেশি।
দেশের মোট গ্যাস বিক্রির প্রায় ৫৫ শতাংশ তিতাসের মাধ্যমে হয়ে থাকে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে কোম্পানিটি প্রায় ১৩ হাজার ৭১৮ মিলিয়ন ঘনমিটার বা ১ হাজার ৩৭২ কোটি ঘনমিটার গ্যাস বিক্রি করেছে। একই সময়ে কোম্পানির আয় ছিল ৩৫ হাজার কোটি টাকার বেশি।
লিকেজ ও চুরি বড় কারণ
তিতাসের বার্ষিক প্রতিবেদনে সিস্টেম লসকে কোম্পানিটির আর্থিক দুরবস্থার অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। কারণ নির্ধারিত পরিমাণ গ্যাস সরবরাহের পরও যে গ্যাসের হিসাব পাওয়া যাচ্ছে না, তার আর্থিক দায় শেষ পর্যন্ত কোম্পানির ওপরই পড়ছে।
তিতাসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শাহনেওয়াজ পারভেজের ভাষ্য, সিস্টেম লসের দুটি প্রধান কারণ—লিকেজ ও গ্যাস চুরি।
তিনি জানান, পুরনো পাইপলাইনের কারণে প্রায় সাড়ে ৩ শতাংশ গ্যাস লস হচ্ছে। তিতাসের নেটওয়ার্কের কিছু পাইপলাইন প্রায় পাঁচ দশক আগে স্থাপন করা হয়েছিল। এসব পাইপলাইন নতুন করে স্থাপন করা অত্যন্ত কঠিন ও ব্যয়বহুল।
অন্যদিকে নারায়ণগঞ্জ ও গাজীপুরে গ্যাস চুরির ঘটনা বেশি বলে জানান তিনি। চুরি বন্ধে তিতাস নিয়মিত ম্যাজিস্ট্রেটের মাধ্যমে অভিযান চালাচ্ছে। অবৈধভাবে গ্যাস ব্যবহারের অভিযোগে অন্তত ৩৬টি চুন কারখানার বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।
তবে শুধু অভিযান চালিয়ে এ সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয় বলে মনে করেন তিতাসের কর্মকর্তারা। তাদের মতে, প্রশাসনের পাশাপাশি স্থানীয় জনগণ ও গ্রাহকদের সহযোগিতাও প্রয়োজন।
তিতাসের প্রায় সাড়ে ১৩ হাজার কিলোমিটার নেটওয়ার্কের বিভিন্ন অংশে পুরনো অবকাঠামো, মিটারিং সমস্যা, লিকেজ এবং অবৈধ ব্যবহারের মতো সমস্যা রয়েছে। দীর্ঘদিনের ক্ষয়, মাটির নিচে পাইপলাইনের অবস্থান এবং বিভিন্ন উন্নয়নকাজের সময় পাইপলাইন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঘটনাও সিস্টেম লস বাড়াতে ভূমিকা রাখছে।
তবে জ্বালানি খাতের বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু পুরনো পাইপলাইন দিয়ে ৯ দশমিক ৪৭ শতাংশ সিস্টেম লসের পুরো ব্যাখ্যা দেওয়া যায় না। গ্যাস চুরিও এর অন্যতম বড় কারণ।
প্রতিদিন ১৫–২০ কোটি ঘনফুট গ্যাস চুরি?
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের (আইইউবি) উপাচার্য ড. ম তামিমের মতে, দেশে গড়ে প্রতিদিন ১৫ থেকে ২০ কোটি ঘনফুট গ্যাস লস হয়, যার বড় অংশই চুরি।
তার মতে, এই ক্ষতি অত্যন্ত ব্যয়বহুল। গ্যাসের অপচয় ও অনিয়ম কমানো গেলে একই পরিমাণ গ্যাস দিয়ে দেশের শিল্প ও অন্যান্য খাতে সরবরাহ বাড়ানো সম্ভব হতো।
তবে তিনি মনে করেন, শুধু অভিযান চালিয়ে সিস্টেম লসের স্থায়ী সমাধান করা কঠিন। কারণ পুরো বিতরণ নেটওয়ার্কে সমস্যাটি ছড়িয়ে আছে। এক জায়গায় চুরি বন্ধ করলে অন্য জায়গায় তা শুরু হওয়ার ঝুঁকি থাকে।
গ্যাস চুরির পেছনে থাকা অর্থনৈতিক প্রণোদনা কমানোর ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।
প্রাকৃতিক গ্যাস ও এলপিজির দামের বড় পার্থক্যকে অবৈধ গ্যাস ব্যবহারের অন্যতম কারণ হিসেবে দেখছেন এ বিশেষজ্ঞ। তার মতে, এলপিজির তুলনায় পাইপলাইনের গ্যাস সস্তা হওয়ায় অবৈধ সংযোগের প্রতি গ্রাহকদের একটি অর্থনৈতিক আকর্ষণ তৈরি হয়।
এ কারণে বাসাবাড়িতে মিটারভিত্তিক গ্যাস সংযোগ বাড়ানোর পাশাপাশি ধীরে ধীরে গ্যাসের দামকে বাজার পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি। এতে গ্রাহকের সামনে পাইপলাইনের গ্যাস, এলপিজি ও বিদ্যুতের মধ্যে তুলনামূলকভাবে সবচেয়ে কার্যকর জ্বালানি বেছে নেওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।
ভারত-পাকিস্তানের তুলনায় বাংলাদেশ পিছিয়ে
দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশের গ্যাস সিস্টেম লস উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। বিভিন্ন তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের সিস্টেম লস ভারতের প্রায় তিন গুণ এবং পাকিস্তানের প্রায় দ্বিগুণ।
পাকিস্তান টাউন বর্ডার স্টেশন বা টিবিএস প্রযুক্তি ব্যবহার করে পুরনো পাইপলাইনে লিকেজ শনাক্ত, চুরি বন্ধ, লিকেজ মেরামত এবং গ্যাস সরবরাহের পরিমাণ নির্ধারণের মাধ্যমে পাঁচ বছরে সিস্টেম লস ৯ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫ দশমিক ১৫ শতাংশে নামিয়ে এনেছে।
ভারতেও আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের কারণে প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহে সিস্টেম লস তুলনামূলক কম। বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত অনুযায়ী, সেখানে গ্যাস সরবরাহে সিস্টেম লস গড়ে ৩ থেকে ৪ শতাংশের বেশি নয়। দেশটিতে গত এক দশকেরও বেশি সময়ে এই হার সর্বোচ্চ প্রায় ৪ শতাংশ ছিল। ভারতের ক্ষেত্রে এই ক্ষতির বড় অংশ কারিগরি ত্রুটিজনিত, চুরি নয়।
বাংলাদেশে একইভাবে সিস্টেম লস কমানো যাচ্ছে না কেন—এমন প্রশ্নের জবাবে অধ্যাপক ড. ম তামিম বলেন, প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা। অন্য দেশগুলো যদি এটি করতে পারে, বাংলাদেশেও তা সম্ভব।
১ শতাংশে নামানোর লক্ষ্য
গ্যাসের সিস্টেম লস কমাতে সরকারেরও বিভিন্ন পরিকল্পনা রয়েছে। জ্বালানি বিভাগের রোডম্যাপ অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে দেশের গ্যাস বিতরণ কোম্পানিগুলোর সিস্টেম লস ১ শতাংশের নিচে নামিয়ে আনার পরিকল্পনা রয়েছে।
তবে পুরনো পাইপলাইন ও অবৈধ সংযোগের বাস্তবতা বিবেচনায় তিতাস ও বাখরাবাদ গ্যাস বিতরণ কোম্পানির সিস্টেম লস সর্বনিম্ন ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
এ ছাড়া তিতাসের কার্যক্রম শুধু ঢাকাকেন্দ্রিক না রেখে ২০৩০ সালের মধ্যে চারটি অঞ্চলে ভাগ করার পরিকল্পনাও রয়েছে সরকারের।
বিইআরসি চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ জানিয়েছেন, সিস্টেম লস নিয়ে তিতাসের সঙ্গে কমিশনের আলোচনা হয়েছে এবং শিগগিরই এ বিষয়ে আবার বৈঠক হবে। তিতাসের বেশ কিছু বিরোধ বা ‘ডিসপিউট’ও কমিশনের কাছে এসেছে, যেগুলো নিয়েও কোম্পানিটির সঙ্গে আলোচনা করা হবে।
জ্বালানি খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, গ্যাসের সিস্টেম লস কমানো গেলে একই সঙ্গে এলএনজি আমদানির চাপ কমবে, শিল্প ও বিদ্যুৎ খাতে সরবরাহ বাড়বে এবং সরকারের জ্বালানি ব্যয়ও কমানো সম্ভব হবে। এ জন্য পুরনো পাইপলাইন সংস্কার, আধুনিক মিটারিং ও ডিজিটাল নজরদারি, অবৈধ সংযোগ বন্ধ এবং গ্যাস ব্যবহারের অর্থনৈতিক কাঠামোয় প্রয়োজনীয় সংস্কার—সবগুলো পদক্ষেপ একসঙ্গে নিতে হবে।

