স্থানীয় টেক্সটাইল মিলগুলোকে সুরক্ষা দিতে বন্ড সুবিধার আওতায় ১০ থেকে ৩০ কাউন্টের তুলার সুতা আমদানিতে শূন্য শুল্ক সুবিধা প্রত্যাহার করেছে সরকার। সিদ্ধান্তটিকে স্বাগত জানিয়েছে দেশের টেক্সটাইল মিল মালিকদের সংগঠন। তবে পোশাক রপ্তানিকারকরা বলছেন, এতে উৎপাদন ব্যয় বাড়তে পারে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তাই তারা সিদ্ধান্তটি পুনর্বিবেচনার দাবি জানিয়েছেন।
গত ৭ সেপ্টেম্বর জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) এ বিষয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে। নতুন নিয়ম অনুযায়ী, পোশাক প্রস্তুতকারকরা আগের মতো শূন্য শুল্ক সুবিধায় নয়, ব্যাংক গ্যারান্টির বিপরীতে ১০ থেকে ৩০ কাউন্টের তুলার সুতা আমদানি করতে পারবেন।
শিল্পসংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে বছরে ব্যবহৃত মোট সুতার প্রায় ৮০ শতাংশই ১০ থেকে ৩০ কাউন্টের। এ ধরনের সুতার চাহিদা মূলত নিট পোশাকের কাপড় তৈরিতে বেশি। বর্তমানে রপ্তানিমুখী নিটওয়্যার খাতের প্রয়োজনীয় সুতার ৯০ শতাংশের বেশি স্থানীয় স্পিনিং মিলগুলো সরবরাহ করতে সক্ষম।
টেক্সটাইল মিল মালিকরা দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করে আসছেন, কম দামে আমদানি করা সুতা এবং প্রতিবেশী দেশগুলো থেকে অনানুষ্ঠানিক পথে আসা সুতা দেশের প্রায় ২৫ বিলিয়ন ডলারের টেক্সটাইল শিল্পকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। স্পিনিং, উইভিং, ডাইং, ফিনিশিং ও প্রিন্টিং—এসব খাত মিলেই দেশের এই বৃহৎ শিল্প গড়ে উঠেছে।
মিল মালিকদের আরও অভিযোগ, বন্ড সুবিধার আওতায় আমদানি করা সুতা ও কাপড়ের একটি অংশ অবৈধভাবে স্থানীয় বাজারে চলে আসায় দেশীয় শিল্পের বাজারও সংকুচিত হচ্ছে।
তাদের হিসাবে, চার-পাঁচ বছর আগে স্থানীয় স্পিনিং মিলগুলো দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে প্রায় ১৩ বিলিয়ন ডলার মূল্যের কাপড় সরবরাহ করত। বর্তমানে তা কমে প্রায় ৯ বিলিয়ন ডলারে নেমেছে। অন্যদিকে বন্ড সুবিধার আওতায় আমদানি করা প্রায় ৪ বিলিয়ন ডলার মূল্যের কাপড় স্থানীয় বাজারে বিক্রি হচ্ছে।
আশুলিয়াভিত্তিক লিটল স্টার স্পিনিং মিলসের চেয়ারম্যান মো. খোরশেদ আলম সরকারের সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন। তাঁর মতে, শূন্য শুল্ক সুবিধা প্রত্যাহার করা হলে দেশের প্রাইমারি টেক্সটাইল খাত আরও সম্প্রসারিত হওয়ার সুযোগ পাবে।
বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশন (বিটিএমএ) এক বিবৃতিতে বলেছে, নতুন সিদ্ধান্তের ফলে স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত সুতার চাহিদা বাড়বে। এতে মিলগুলো তাদের উৎপাদন সক্ষমতা আরও কার্যকরভাবে কাজে লাগাতে পারবে। পাশাপাশি নতুন বিনিয়োগ উৎসাহিত হবে এবং ব্যাংকঋণ পরিশোধে মিলগুলোর সক্ষমতাও বাড়বে।
বিটিএমএর মতে, স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত সুতা ব্যবহারের সুযোগ বাড়লে বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে। একই সঙ্গে এলডিসি থেকে উত্তরণের পর পোশাক খাতে স্থানীয় মূল্য সংযোজনের হার ৬০ শতাংশে উন্নীত করতেও এটি সহায়ক হতে পারে। স্থানীয় মিল থেকে সুতা সংগ্রহ করলে পোশাক রপ্তানিকারকদের সরবরাহ পেতেও তুলনামূলক কম সময় লাগবে।
বিটিএমএ সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন বক্তব্যে জানিয়েছেন, চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে ভারত থেকে সুতা আমদানির পরিমাণ ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রায় দ্বিগুণ হয়ে ৩০ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছেছে। আগের অর্থবছরে এর পরিমাণ ছিল প্রায় ১৪ হাজার কোটি টাকা।
বিটিএমএ বলছে, ব্যাংক গ্যারান্টির শর্ত চালু হওয়ায় বন্ড সুবিধার আওতায় আমদানি করা সুতা স্থানীয় বাজারে চলে যাওয়ার প্রবণতাও কমবে। একই সঙ্গে রপ্তানি আয় দেশে ফেরত আনার ক্ষেত্রে রপ্তানিকারকদের ওপর জবাবদিহি বাড়বে। সংগঠনটির দাবি, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে প্রায় ৭ বিলিয়ন ডলারের রপ্তানি আয় দেশে ফেরত আসেনি।
তবে সরকারের সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেছে পোশাক রপ্তানিকারকদের সংগঠনগুলো। বাংলাদেশ গার্মেন্ট ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিজিএমইএ) এবং বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিকেএমইএ) ৭ সেপ্টেম্বর বাণিজ্যমন্ত্রীর কাছে চিঠি দিয়ে সিদ্ধান্তটি পুনর্বিবেচনার দাবি জানিয়েছে।
তিন বাণিজ্য সংগঠনের মধ্যে বৈঠক করে এ বিষয়ে একটি সমঝোতায় পৌঁছানোরও আহ্বান জানিয়েছে তারা।
রপ্তানিকারকদের দাবি, গত ২০ আগস্ট টেক্সটাইল ও পোশাক খাতের সমস্যা সমাধানে প্রধানমন্ত্রীর উদ্যোগে অনুষ্ঠিত প্রথম সমন্বয় সভায় সুতা আমদানিতে বন্ড সুবিধা প্রত্যাহারের বিষয়টি আলোচনা করা হয়নি।
তাদের আশঙ্কা, আগের বন্ড সুবিধা পুনর্বহাল না করা হলে রপ্তানিমুখী পোশাক কারখানাগুলোর উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাবে। এর ফলে বৈশ্বিক বাজারে বাংলাদেশের পোশাকের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা কমতে পারে।
ঢাকাভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি ইন্টিগ্রেশন ফর ডেভেলপমেন্ট (র্যাপিড)-এর চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আবদুর রাজ্জাক বলেন, সিদ্ধান্তটির প্রভাব পোশাক রপ্তানিকারকদের ওপর কীভাবে পড়ে, তা সতর্কতার সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
তিনি বলেন, এ সিদ্ধান্তের কারণে রপ্তানি প্রতিযোগিতা ক্ষতিগ্রস্ত হলে স্থানীয় স্পিনিং মিলগুলোর জন্যও তা নেতিবাচক হতে পারে। কারণ তাদের ব্যবসা অনেকাংশেই পোশাক রপ্তানিকারকদের কাছ থেকে আসা সুতার চাহিদার ওপর নির্ভরশীল।
তাই তাঁর পরামর্শ, সিদ্ধান্তটি স্থায়ী না করে নির্দিষ্ট সময় পর এর প্রভাব মূল্যায়ন করা উচিত। প্রয়োজন হলে পরবর্তী সময়ে নীতিতে পরিবর্তন আনার সুযোগও রাখা যেতে পারে।
সুতা আমদানি সীমিত করতে সরকারের নেওয়া ধারাবাহিক বিভিন্ন পদক্ষেপের অংশ হিসেবেই সর্বশেষ সিদ্ধান্তটি এসেছে। বিশেষ করে ভারত থেকে সুতা আমদানির ওপর বিধিনিষেধ আরোপে গত বছর থেকে বেশ কিছু উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
২০২৫ সালের মার্চে স্থানীয় টেক্সটাইল ও স্পিনিং খাতকে সুরক্ষা দিতে স্থলবন্দর দিয়ে সুতা আমদানি সীমিত করার জন্য এনবিআরকে ব্যবস্থা নিতে বলেছিল বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। এরপর এনবিআর ভারত থেকে স্থলবন্দর দিয়ে সুতা আমদানিতে বিধিনিষেধ আরোপ করে। বর্তমানে ভারত থেকে সুতা আমদানির অনুমতি শুধু চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে দেওয়া হচ্ছে।
এর আগে ২০২৫ সালের এপ্রিলের শুরুতে ভারত বাংলাদেশি পণ্য তৃতীয় দেশে পাঠানোর ক্ষেত্রে ভারতীয় বিমানবন্দর ব্যবহারের ট্রান্সশিপমেন্ট সুবিধা স্থগিত করেছিল। এর পরপরই ভারত থেকে সুতা আমদানি নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশ নতুন পদক্ষেপ নিতে শুরু করে।

