দেশের বৈদ্যুতিক ও ইলেকট্রনিক পণ্য রপ্তানি খাতে এসেছে উল্লেখযোগ্য গতি, যদিও একই সঙ্গে ইউরোপীয় বাজারে টিকে থাকতে উৎপাদকদের এখন মোকাবিলা করতে হচ্ছে ক্রমশ কঠোর হয়ে ওঠা মান ও পরিবেশগত শর্তের চাপ। সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান বলছে, একদিকে যেমন রপ্তানি আয়ে রেকর্ড গড়েছে এই খাত, অন্যদিকে তেমনি টেকসই উৎপাদন ও পণ্যের উৎস প্রমাণের নতুন নিয়মকানুন উৎপাদকদের জন্য তৈরি করছে বাড়তি চ্যালেঞ্জ।
রপ্তানি সংক্রান্ত সরকারি সংস্থার হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, সদ্য শেষ হওয়া অর্থবছরে বৈদ্যুতিক পণ্যের রপ্তানি আয় প্রায় চব্বিশ শতাংশ বেড়ে ছাড়িয়ে গেছে বিশ কোটি ডলারের ঘর, যেখানে আগের বছর এই আয় ছিল সাড়ে ষোলো কোটি ডলারের কিছু বেশি। প্রকৌশল পণ্যের মধ্যে বৈদ্যুতিক পণ্যই এখন সবচেয়ে বড় আয়ের উৎস হয়ে উঠেছে। একই সময়ে বাইসাইকেল রপ্তানিও প্রায় ত্রিশ শতাংশ বেড়ে পনেরো কোটি ডলারের কাছাকাছি পৌঁছেছে, যার ফলে সামগ্রিক প্রকৌশল পণ্যের রপ্তানি বেড়েছে প্রায় বাইশ শতাংশ, মোট আয় দাঁড়িয়েছে পঁয়ষট্টি কোটি ডলারের বেশি।
তবে এই প্রবৃদ্ধির পেছনে রয়েছে নতুন এক বাস্তবতা। ইউরোপীয় ইউনিয়ন গত বছরের মাঝামাঝি থেকে কার্যকর করেছে টেকসই পণ্য সংক্রান্ত নতুন নিয়মকানুন, যার আওতায় ধাপে ধাপে বাধ্যতামূলক হচ্ছে ডিজিটাল প্রোডাক্ট পাসপোর্ট ব্যবস্থা। এই নিয়মের আওতায় পড়া পণ্যগুলোর ক্ষেত্রে উৎপাদকদের জানাতে হবে ব্যবহৃত উপকরণ, যন্ত্রাংশের উৎস, পরিবেশগত প্রভাব, স্থায়িত্ব এবং মেরামতযোগ্যতা সংক্রান্ত বিস্তারিত তথ্য। বিক্রি না হওয়া পণ্য ধ্বংস করার ওপরও আরোপ করা হয়েছে নিষেধাজ্ঞা। যদিও এই বিধান একসঙ্গে সব পণ্যের জন্য প্রযোজ্য হচ্ছে না, বরং আলাদা আলাদা নির্দেশিকার মাধ্যমে ক্রমান্বয়ে কার্যকর হচ্ছে।
এই পরিবর্তন বাংলাদেশের উৎপাদকদের জন্য বিশেষভাবে কঠিন হয়ে দাঁড়াচ্ছে, কারণ দেশের অধিকাংশ বৈদ্যুতিক পণ্য প্রস্তুতকারক এখনও আমদানি করা যন্ত্রাংশ ও কাঁচামালের ওপর অনেকাংশে নির্ভরশীল। সরবরাহ শৃঙ্খলের প্রতিটি ধাপের উৎস নির্ভুলভাবে চিহ্নিত করা তাই একটি জটিল কাজ হয়ে উঠেছে। সংশ্লিষ্ট শিল্প সংগঠনের এক শীর্ষ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, যেহেতু বেশিরভাগ কাঁচামাল আসে চীন ও ভিয়েতনাম থেকে, তাই এসব পণ্যের কার্বন নিঃসরণের হিসাব রাখা রীতিমতো কঠিন কাজ। তিনি আরও বলেন, যেসব প্রতিষ্ঠান দীর্ঘদিন কেবল দেশীয় বাজারের জন্য উৎপাদন করে আসছিল, রপ্তানিমুখী হতে গিয়ে তাদের এখন অনেক বেশি প্রস্তুতি ও নতুন জ্ঞান অর্জন করতে হচ্ছে।
এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় শিল্প খাতে চলছে নানামুখী প্রস্তুতি। সংশ্লিষ্ট বাণিজ্য সংগঠন সদস্যদের জন্য আয়োজন করছে কর্মশালা, যেখানে পণ্যের উৎস নির্ধারণ, ওয়ারেন্টি ব্যবস্থাপনা, বিক্রয়োত্তর সেবা ও মেরামতযোগ্যতা সংক্রান্ত বিষয়ে দেওয়া হচ্ছে প্রশিক্ষণ। তবে পরীক্ষাগার অবকাঠামোর ঘাটতি এখনো একটি বড় সীমাবদ্ধতা হয়ে আছে। পশ্চিমা বাজারের মানদণ্ড অনুযায়ী পণ্য পরীক্ষার সক্ষমতা গড়ে তুলতে সরকারের কাছে একাধিকবার সহায়তা চাওয়া হয়েছে, বিশেষ করে বৈদ্যুতিক খাতের জন্য পৃথক একটি সাধারণ পরীক্ষাগার কেন্দ্র স্থাপনের দাবি জানানো হয়েছে, যা ছোট আকারের উৎপাদকদের জন্য বিশেষভাবে সহায়ক হতে পারে।
এই পরিবর্তিত পরিস্থিতির সঙ্গে তুলনামূলকভাবে সহজে খাপ খাইয়ে নিচ্ছে দেশের বড় প্রতিষ্ঠানগুলো। শীর্ষস্থানীয় একটি রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানের নির্বাহী পর্যায়ের এক কর্মকর্তা জানান, আন্তর্জাতিক বাজারের শর্ত বদলানোর সঙ্গে সঙ্গে তাদের প্রতিষ্ঠান বারবার নিজেদের প্রক্রিয়া হালনাগাদ করেছে। ম্যানুয়াল নিবন্ধন থেকে ডিজিটাল ব্যবস্থায় রূপান্তর কিংবা ইউরোপের জ্বালানি-দক্ষতা রেটিং পদ্ধতিতে পরিবর্তন আসার সঙ্গে সঙ্গেই তারা নিজেদের ব্যবস্থা পরিবর্তন করে নিয়েছে। নিজস্ব যন্ত্রাংশ উৎপাদন সক্ষমতা এবং একটি আধুনিক পরীক্ষাগার সুবিধা থাকায় প্রতিষ্ঠানটি এখন সিবি সার্টিফিকেটসহ বিভিন্ন সনদ নিজেরাই দিতে সক্ষম, ফলে আগে যেখানে রেফ্রিজারেটরের মতো পণ্য পরীক্ষার জন্য বিদেশে পাঠাতে হতো, এখন তা আর প্রয়োজন হয় না।
আরেকটি বড় শিল্পগোষ্ঠীর ইলেকট্রনিকস বিভাগ ইউরোপের বাজারে প্রবেশের প্রস্তুতি নিচ্ছে ধাপে ধাপে। বর্তমানে দক্ষিণ এশিয়া, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, ওশেনিয়া ও আফ্রিকার বাজারে সক্রিয় থাকা এই প্রতিষ্ঠান ইউরোপের মান ও নিরাপত্তা শর্ত মাথায় রেখে রেফ্রিজারেটর ও এয়ার কন্ডিশনারের নকশায় পরিবর্তন আনছে। কাঁচামালের উৎস শনাক্তকরণ ও রাসায়নিক মান পরিপালনের জন্য ডিজিটাল ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থা হালনাগাদ করা হচ্ছে, পাশাপাশি কারখানাগুলোতে কার্বন নিঃসরণের পরিমাণ নির্ণয়ে বিশেষজ্ঞদের সহায়তা নেওয়া হচ্ছে। পণ্য সহজে মেরামতযোগ্য করে তুলতে নকশায়ও আনা হচ্ছে পরিবর্তন, আর একক ধরনের প্লাস্টিক ব্যবহারের দিকে ঝুঁকছে প্রতিষ্ঠানটি, যাতে পুনর্ব্যবহারযোগ্যতা বাড়ানো যায়।
শিল্প সংশ্লিষ্টদের মতে, এই খাতের দীর্ঘমেয়াদি সম্ভাবনা কাজে লাগাতে হলে সরকারি নীতিগত সহায়তা অপরিহার্য। তৈরি পোশাক খাতের মতো এখানেও প্রণোদনা, সহজ ঋণপত্র সুবিধা এবং আমদানি করা কাঁচামালে শুল্ক ছাড়ের দাবি জানিয়েছেন উদ্যোক্তারা। তাদের ভাষ্য, উপযুক্ত সহায়তা পেলে আগামী এক দশকে এই খাত হয়ে উঠতে পারে দেশের সবচেয়ে সম্ভাবনাময় রপ্তানি খাতগুলোর একটি, এমনকি তৈরি পোশাক খাতের চেয়েও এগিয়ে যেতে পারে বলে তাদের প্রত্যাশা।
এদিকে সামনে অপেক্ষা করছে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সময়সীমা। ইউরোপীয় ইউনিয়নের নতুন ব্যাটারি বিধিমালা অনুযায়ী, ২০২৭ সালের শুরুর দিক থেকে ইইউ বাজারে বিক্রি হওয়া বৈদ্যুতিক গাড়ির ব্যাটারি, নির্দিষ্ট ক্ষমতার বেশি শিল্প ব্যাটারি এবং হালকা যানবাহনের ব্যাটারির জন্য ডিজিটাল ব্যাটারি পাসপোর্ট বাধ্যতামূলক হয়ে যাবে। ফলে আগামী দিনগুলোতে শুধু প্রতিযোগিতামূলক দামে পণ্য তৈরি করাই যথেষ্ট হবে না, বরং সেই পণ্য কীভাবে তৈরি হচ্ছে, কীভাবে পরীক্ষিত হচ্ছে এবং প্রয়োজনে কতটা সহজে মেরামত করা যাচ্ছে, তারও স্পষ্ট প্রমাণ দিতে হবে উৎপাদকদের।
বর্তমানে দেশ থেকে টেলিভিশন, রেফ্রিজারেটর, ফ্রিজার, এয়ার কন্ডিশনারের মতো গৃহস্থালি পণ্যের পাশাপাশি পাওয়ার ট্রান্সফরমার, বৈদ্যুতিক তার, সুইচ, সকেট, সার্কিট ব্রেকার ও এলইডি বাতির মতো পণ্যও রপ্তানি হচ্ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে রিচার্জেবল ব্যাটারি, ট্রানজিস্টর, সেমিকন্ডাক্টর যন্ত্র এবং পরিবেশবান্ধব বাইসাইকেলও। সব মিলিয়ে বিশ্লেষকদের অভিমত, বৈদ্যুতিক পণ্য রপ্তানিতে দুই অঙ্কের প্রবৃদ্ধি অব্যাহত থাকলেও যেসব প্রতিষ্ঠান মান পরিপালন, উৎস শনাক্তকরণ, পরীক্ষার সক্ষমতা ও মেরামতযোগ্যতায় আগেভাগে বিনিয়োগ করবে, তারাই শেষ পর্যন্ত বৈশ্বিক বাজারে দীর্ঘমেয়াদি অবস্থান তৈরিতে এগিয়ে থাকবে।

