সর্বশেষ ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের কৃষিপণ্য রফতানি আয় কমেছে ১ দশমিক ৩ শতাংশ। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, এ সময়ে কৃষিপণ্য রফতানি করে আয় হয়েছে ৯৭ কোটি ৮১ লাখ ডলার, যা আগের অর্থবছরে ছিল ৯৯ কোটি ৪ লাখ ডলার। অর্থাৎ এক বছরে রফতানি আয় কমেছে ১ কোটি ২৩ লাখ ডলার। তবে এই সামগ্রিক পতনের মধ্যেও কৃষিপণ্যের প্রধান উপখাত ফল ও ফুল রফতানিতে বড় উত্থান দেখা গেছে। এ খাতে আয় বেড়েছে প্রায় ৮৮ দশমিক ৯ শতাংশ। সামগ্রিকভাবে এই চিত্রটি বাংলাদেশের কৃষি রফতানির এক জটিল বাস্তবতা তুলে ধরে, যেখানে কয়েকটি খাত দ্রুত বাড়ছে, আবার অন্য খাতগুলো পিছিয়ে পড়ছে।
সবচেয়ে বড় সাফল্য এসেছে ফল ও ফুল রফতানিতে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এ খাত থেকে রফতানি আয় হয়েছিল ৬ কোটি ৭৪ লাখ ডলার। সর্বশেষ অর্থবছরে তা বেড়ে হয়েছে ১২ কোটি ৭৩ লাখ ডলার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে আয় বেড়েছে ৫ কোটি ৯৯ লাখ ডলার বা ৮৮ দশমিক ৯ শতাংশ। রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসেই ফল রফতানি করে বাংলাদেশ ১২ কোটি ৩০ লাখ ডলার আয় করেছে, যা দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। এই রেকর্ডের পেছনে প্রধান ভূমিকা রেখেছে প্রবাসী বাংলাদেশিদের ক্রমবর্ধমান চাহিদা এবং দেশীয় ফলের বৈচিত্র্য। পাশাপাশি সবজি রফতানি থেকে আয় বেড়ে ৮ কোটি ৮৩ লাখ ডলারে দাঁড়িয়েছে, যা আগের বছরের চেয়ে ৯ দশমিক ২ শতাংশ বেশি। মসলা রফতানি আয়ও ১৪ দশমিক ৯ শতাংশ বেড়ে ৬ কোটি ৪৭ লাখ ডলারে উঠেছে। ইপিবির তথ্যমতে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসে সবজি, ফল ও মসলা মিলিয়ে রফতানি আয় ১০০ মিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে।
তবে সামগ্রিক কৃষিপণ্য রফতানি আয় কমার পেছনে সবচেয়ে বড় ধাক্কা দিয়েছে তামাকপণ্যের রফতানি হ্রাস। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তামাকপণ্য রফতানি থেকে আয় হয়েছিল ২৫ কোটি ২৭ লাখ ডলার। সর্বশেষ অর্থবছরে তা প্রায় ২২ শতাংশ কমে ১৯ কোটি ৭৪ লাখ ডলারে নেমেছে। বাংলাদেশের প্রধান তামাক কোম্পানি ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো বাংলাদেশের (বিএটিবি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে সিগারেট রফতানি টানা তৃতীয় প্রান্তিকে শূন্যে নেমে এসেছে এবং পাতার রফতানি আয় ২২ দশমিক ৫ শতাংশ কমেছে। উচ্চ করহার ও অবৈধ বাজারের কারণে কোম্পানিটির সামগ্রিক বিক্রি কমেছে, যা তামাক রফতানিতে সরাসরি প্রভাব ফেলেছে। এছাড়া শুকনো খাবার বা ড্রাই ফুডের রফতানি আয়ও কমেছে ২৩ লাখ ডলার। এদিকে তেলবীজ আমদানিতে ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তেলবীজ আমদানিতে ব্যয় হয়েছিল ১০ কোটি ৭৯ লাখ ডলার। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা বেড়ে হয়েছে প্রায় ১৪৫ কোটি ডলার। অর্থাৎ এক বছরে আমদানি ব্যয় বেড়েছে ৩৪ দশমিল ৪ শতাংশ। এই ব্যয় বৃদ্ধি কৃষি খাতের বাণিজ্য ভারসাম্যের ওপর চাপ তৈরি করছে।
কৃষি অর্থনীতিবিদদের মতে, রফতানি আয় কাঙ্ক্ষিত হারে না বাড়ার পেছনে বেশ কয়েকটি কাঠামোগত সংকট রয়েছে। আন্তর্জাতিক মান ও খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে না পারা, পণ্য পরীক্ষার দুর্বল ব্যবস্থা, আধুনিক প্যাকেজিং ও কোল্ডচেইনের ঘাটতি অন্যতম। ঢাকা বিমানবন্দরের কার্গো ভিলেজে শীতলীকরণ সুবিধার অভাব এবং উচ্চ এয়ারফ্রেইট খরচ রফতানিকারকদের ব্যয় বাড়াচ্ছে। পাশাপাশি রফতানি পণ্যে বৈচিত্র্য ও নতুন বাজার তৈরির ঘাটতি এবং ভ্যালু অ্যাডেড পণ্যের বাজার তৈরি করতে না পারাও সমস্যা হিসেবে দেখা দিচ্ছে। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক এএইচএম সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘বাংলাদেশ যেসব কৃষিপণ্য রফতানি করছে, তার ক্রেতা মূলত প্রবাসী বা বাংলাদেশী কমিউনিটি। পণ্য ইউরোপে গেলেও সেখানকার স্থানীয় ক্রেতাদের কাছে যাচ্ছে না; বরং বাংলাদেশী কমিউনিটির সুপারশপে যাচ্ছে। কারণ এসব দেশের মানুষ যে মান বা মূল্যের পণ্য চাচ্ছে, বাংলাদেশ তা উৎপাদন করতে পারছে না।’ তিনি আরও বলেন, ‘অতিরিক্ত উৎপাদন হওয়া পণ্যই রফতানি করতে হবে, এমন ধারণা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।’
সরকার কৃষিপণ্য রফতানি বাড়াতে নগদ প্রণোদনা দিয়ে আসছে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরেও ৪৩টি খাতে রফতানি প্রণোদনা অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। কৃষি ও প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্য, সবজি, ফল, আলু রফতানিতে ১০ শতাংশ হারে প্রণোদনা দেওয়া হচ্ছে। তবে শুধু প্রণোদনা দিলেই হবে না, আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা করতে হলে গুড এগ্রিকালচারাল প্র্যাকটিস (জিএপি) মানতে হবে এবং আধুনিক কোল্ড চেইন ও প্যাকেজিং ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। অধ্যাপক সাইফুল ইসলামের মতে, ‘বিভিন্ন দেশে কৃষিপণ্যের জন্য নিজস্ব কিছু মানদণ্ড রয়েছে, সেগুলোও অনুসরণ করতে হবে। রফতানি আয় বাড়াতে হলে এটি অবশ্যই মানতে হবে। একই সঙ্গে সরকারকে নীতিসহায়তা ও প্রণোদনা দিতে হবে।’ সামগ্রিকভাবে কৃষিপণ্য রফতানির চিত্র বলছে, সম্ভাবনা তৈরি হলেও সেই সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে প্রযুক্তি, (পরিকাঠামো) ও নীতিসহায়তার সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি।

