গ্যাসের সরবরাহ কমে যাওয়ায় শিল্পকারখানা ও বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো ডিজেল ও ফার্নেস অয়েলের ব্যবহার বাড়িয়ে দিয়েছে। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনের (বিপিসি) হিসাব বলছে, আগস্টে দেশে ডিজেল বিক্রি হয়েছে ৩ লাখ ৬০ হাজার টন, দৈনিক গড়ে ১২ হাজার টন, গত বছরের একই মাসের তুলনায় যা ২২ শতাংশ বেশি। গত বৃহস্পতিবার দেশে গ্যাসের চাহিদা ছিল ৩৮০ কোটি ঘনফুট, সরবরাহ মিলেছে মাত্র ২৩২ কোটি ঘনফুট। এর মধ্যে দেশীয় গ্যাস থেকে ১৬২ কোটি এবং এলএনজি থেকে ৭০ কোটি ঘনফুট এসেছে। অথচ মহেশখালীর দুটি ভাসমান টার্মিনাল থেকে সর্বোচ্চ ১০৫ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা সম্ভব। এই ঘাটতিই এখন শিল্প, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি তেলের বাজারে সরাসরি চাপ ফেলছে।
বাংলাদেশের সঙ্গে চার দেশের এলএনজি আমদানির আটটি চুক্তি রয়েছে। এসব চুক্তির আওতায় চলতি বছর ১০৩টি কার্গো দেশে পৌঁছানোর কথা ছিল, কিন্তু প্রথম নয় মাসে সরবরাহ পাওয়া গেছে মাত্র ২১টি। পেট্রোবাংলার তথ্য বলছে, দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির ৮৬টি কার্গোর বিপরীতে আগস্ট পর্যন্ত এসেছে মাত্র ১৩টি, আর স্বল্পমেয়াদি চুক্তির ১৭টির মধ্যে পৌঁছেছে মাত্র চারটি। নভেম্বর পর্যন্ত নির্ধারিত ৪৭টি কার্গোর সরবরাহ বাতিল হয়েছে। কারণ একটাই, হরমুজ প্রণালি দিয়ে জ্বালানি পরিবহন প্রায় বন্ধ। কাতার বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় এলএনজি সরবরাহকারী, গত বছর দেশে আসা মোট এলএনজির প্রায় ৭০ শতাংশ এসেছিল সেখান থেকেই। কাতার এনার্জি ‘ফোর্স মেজর’ ঘোষণা করে নভেম্বর পর্যন্ত সরবরাহ স্থগিত রেখেছে। ফলে চুক্তিভিত্তিক সরবরাহের ঘাটতি মেটাতে স্পট মার্কেট থেকে প্রতি ইউনিটে ২৮ ডলারের বেশি দামে এলএনজি কিনতে হচ্ছে, যেখানে চুক্তিভিত্তিক সরবরাহ এলে দাম পড়ত মাত্র ১১-১২ ডলার।
গ্যাস না পেয়ে শিল্পকারখানাগুলো জেনারেটর ও বয়লারে ডিজেল ব্যবহার করছে। সরকারি তিন তেল বিপণন কোম্পানির তথ্য বলছে, গত বছরের আগস্টের তুলনায় পদ্মা অয়েলের ডিজেল বিক্রি বেড়েছে প্রায় ২৯ শতাংশ, মেঘনা পেট্রোলিয়ামের ২১ শতাংশ এবং যমুনা অয়েলের শিল্প গ্রাহকদের কাছে ৩৩ শতাংশ। বিপিসির তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ৫০ শতাংশ কারখানা গত বছরের চেয়ে বেশি ডিজেল কিনেছে। গাজীপুরের কালিয়াকৈরে স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালসের কারখানায় গ্যাস সংকটের আগে বয়লারে দৈনিক ৫০০ লিটার এবং জেনারেটরে ১০-১২ হাজার লিটার ডিজেল লাগত। এখন বয়লারে দরকার ১০ হাজার লিটার এবং জেনারেটরে ৫০ হাজার লিটার, চাহিদা প্রায় পাঁচ গুণ বেড়েছে। কিন্তু সরবরাহ মিলছে মাত্র ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ। পর্যাপ্ত জ্বালানি না পাওয়ায় জীবন রক্ষাকারী ওষুধের সরবরাহ ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
গ্যাস সংকটে শিল্পে ডিজেলের বাড়তি ব্যবহার যখন জ্বালানি বাজারে চাপ তৈরি করেছে, তখন সামনে যুক্ত হচ্ছে বোরো মৌসুমের সেচ চাহিদা। নভেম্বর-ডিসেম্বর থেকে জমি প্রস্তুত ও সেচ শুরু হওয়ায় ডিজেলের ব্যবহার দ্রুত বাড়তে থাকে। দেশে সচল সেচ পাম্পের বড় অংশ ডিজেলচালিত, বোরো মৌসুমে কৃষিই হয়ে ওঠে জ্বালানি তেলের অন্যতম বড় ভোক্তা। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, সেচের জন্য ১০ লাখ ৩৯ হাজার ৩৩৭টি শ্যালো টিউবওয়েল ও ১ লাখ ৮৪ হাজার ৩৮৪টি লো-লিফট পাম্প ব্যবহৃত হয়। বছরের অন্যান্য সময়ে মাসে গড়ে প্রায় সাড়ে তিন লাখ টন ডিজেল ব্যবহৃত হলেও বোরো মৌসুমের সর্বোচ্চ সময়ে তা চার থেকে সাড়ে চার লাখ টনে উঠতে পারে। অর্থাৎ, শিল্পে বাড়তি ব্যবহার ও বোরো সেচের চাহিদা একসঙ্গে যোগ হলে সামনের মাসগুলোতে ডিজেলের মোট চাহিদায় বড় ধরনের চাপ তৈরি হবে।
এলএনজি সংকটের কারণে পেট্রোবাংলার ওপর বড় আর্থিক চাপ তৈরি হয়েছে। স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি কিনতে প্রতি ইউনিটে ২৮ ডলারের বেশি খরচ হচ্ছে, আর প্রতি মাসে গড়ে প্রায় ৫০০ কোটি টাকা লোকসান করছে সংস্থাটি। মার্চ থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সাত মাসে অতিরিক্ত লোকসান হয়েছে প্রায় ২০ হাজার ৬০০ কোটি টাকা। অন্যদিকে আন্তর্জাতিক বাজারে বেশি দামে তেল কিনে দেশে কম দামে বিক্রি করায় বিপিসিও বড় লোকসানে পড়েছে। মার্চ থেকে জুন, এই চার মাসে সংস্থাটির লোকসান হয়েছে ১৮ হাজার ৬৯৯ কোটি ৩১ লাখ টাকা, যা ভর্তুকি হিসেবে সরকারের কাছে চাওয়া হয়েছে। গত অর্থবছরে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকি ৪০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বেশি থাকলে এবং গ্যাস সংকট দীর্ঘায়িত হলে এই আর্থিক চাপ আরও বাড়বে, যা শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের ওপরই পড়বে।
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জ্বালানি পরিবহন প্রায় বন্ধ, আর লোহিত সাগরের বাব আল-মান্দেব এখন হুতিদের নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ১০০ ডলারের ওপরে উঠেছে—ব্রেন্ট ক্রুডের দাম সর্বশেষ ১০৪ ডলারের কাছাকাছি। স্বাভাবিক সময়ে হরমুজ দিয়ে বিশ্বের বিপুল পরিমাণ জ্বালানি ও এলএনজি পরিবহন হয়, আর বাব আল-মান্দেব ও সুয়েজ খাল বৈশ্বিক বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ রুট। এসব নৌপথে দীর্ঘস্থায়ী বিঘ্ন তৈরি হলে সরবরাহের পাশাপাশি পরিবহন ব্যয়, বীমা খরচ এবং আন্তর্জাতিক জ্বালানির দাম আরও বাড়বে। বাংলাদেশের জন্য এর প্রভাব শুধু জ্বালানি আমদানিতে সীমাবদ্ধ নয়, ইউরোপমুখী তৈরি পোশাকসহ বিভিন্ন রপ্তানি পণ্য পরিবহনে লোহিত সাগর ও সুয়েজ রুট গুরুত্বপূর্ণ। জাহাজগুলোকে আফ্রিকা ঘুরে দীর্ঘ পথে চলতে হলে ফ্রেইট খরচ ও যুদ্ধঝুঁকির বীমা ব্যয় বাড়বে।
আপাতত সরবরাহ সংকটের আশঙ্কা দেখছে না জ্বালানি বিভাগ। যুগ্ম সচিব মনির হোসেন চৌধুরী বলেছেন, অক্টোবর পর্যন্ত এলএনজি কার্গোর নিশ্চয়তা পাওয়া গেছে এবং গ্যাসের সংকট ধীরে ধীরে কেটে যাবে। তাঁর ভাষায়, “গ্যাসের সংকটের কারণে ডিজেলের চাহিদা বাড়লেও দেশে ডিজেলের সরবরাহে সমস্যা হবে না। বাংলাদেশ আগাম পরিকল্পনার ভিত্তিতে প্রায় ছয় মাসের চাহিদা বিবেচনায় নিয়ে জ্বালানি তেল আমদানির চুক্তি করে থাকে।” তিনি জানান, ডিজেল আমদানি করা হয় মূলত মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর ও চীনের মতো এশীয় উৎস থেকে, তাই হরমুজকেন্দ্রিক অস্থিরতার প্রভাব সরাসরি ডিজেল সরবরাহে পড়বে না। বিপিসি চেয়ারম্যান ড. মো. রফিকুল ইসলামও জানিয়েছেন, ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রয়োজনীয় জ্বালানি তেল আমদানি নিশ্চিত করা হয়েছে এবং সরবরাহকারীরা বিকল্প উৎস থেকে তেল সরবরাহের আশ্বাস দিয়েছে। তবে তিনি স্বীকার করেছেন, পরিস্থিতি আরও জটিল ও দীর্ঘস্থায়ী হলে নতুন করে পরিকল্পনা করতে হবে। সরকার ইতিমধ্যে এলএনজি উৎস বহুমুখী করতে যুক্তরাষ্ট্রের গানভর ইউএসএ এলএলসির সঙ্গে ২০২৬ থেকে ২০৩৮ সাল পর্যন্ত ১১৭ কার্গোর চুক্তি করেছে এবং মহেশখালীতে আরও দুটি টার্মিনাল স্থাপনের কাজ চলছে।
সব মিলিয়ে, বাংলাদেশের জ্বালানি ব্যবস্থা এখন একইসঙ্গে দুই দিক থেকে চাপের মুখে, একদিকে গ্যাসের সরবরাহ কমে যাওয়ায় বিকল্প জ্বালানির ওপর নির্ভরতা বাড়ছে, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়ায় আমদানি ব্যয়ও বাড়ছে। বোরো মৌসুম শুরু হলে ডিজেলের চাহিদা আরও বাড়বে, আর সেই চাহিদা মেটাতে সরকারকে হয় ভর্তুকি বাড়াতে হবে, নয়তো দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিতে হবে, দুই ক্ষেত্রেই সাধারণ মানুষের ওপর বাড়তি বোঝা আসবে। আপাতত সরবরাহ নিয়ে সরকার স্বস্তিতে থাকলেও, দাম আর চাহিদার এই দ্বিমুখী চাপ আগামী মাসগুলোতে অর্থনীতির ওপর কতটা প্রভাব ফেলবে, সেটাই এখন দেখার বিষয়।

