বাংলাদেশের বস্ত্র ও সুতা শিল্প দীর্ঘদিন ধরে বিদেশি সুতার চাপের মুখে রয়েছে। কম দামে বিপুল পরিমাণ বিদেশি সুতা বাজারে প্রবেশ করায় দেশের অনেক সুতা কারখানা তাদের উৎপাদন সক্ষমতা অনুযায়ী কাজ করতে পারছে না। এর ফলে একদিকে যেমন বিনিয়োগ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, অন্যদিকে কমেছে কর্মসংস্থানের সুযোগ।
তবে সম্প্রতি ১০ কাউন্ট থেকে ৩০ কাউন্ট পর্যন্ত তুলার সুতা আমদানিতে নিয়ন্ত্রণ আরোপের সিদ্ধান্ত দেশের প্রাথমিক বস্ত্র শিল্পে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। কর্মকর্তাদের মতে, এই উদ্যোগ কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে বন্ধ ও আংশিক বন্ধ থাকা অনেক কারখানা আবার চালু হতে পারে। এর মাধ্যমে প্রায় ১৫ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান নিশ্চিত হওয়ার সুযোগ রয়েছে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের কর্মকর্তারা বলছেন, বিদেশি সুতার ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করলে দেশের নিজস্ব সুতা উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার সুযোগ পাবে।
তাদের ধারণা, স্থানীয় উৎপাদন বাড়লে বছরে প্রায় ১৬০ কোটি ডলারের আমদানি ব্যয় কমানো সম্ভব হতে পারে। একই সঙ্গে দেশের বস্ত্র ও তৈরি পোশাক শিল্পের সরবরাহ ব্যবস্থাও আরও শক্তিশালী হবে।
একজন বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা জানান, বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের প্রতিবেদনের ভিত্তিতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে সুতা আমদানিতে নিয়ন্ত্রণ বাড়ানোর পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এর মূল উদ্দেশ্য হলো দেশীয় শিল্পকে সুরক্ষা দেওয়া এবং নতুন কর্মসংস্থান তৈরি করা।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ অর্থবছরে ৫২০৫, ৫২০৬ ও ৫২০৭ নম্বর শ্রেণির আওতায় সুতা আমদানির পরিমাণ ছিল প্রায় ৩৫ কোটি ৮ লাখ কেজি।
কিন্তু মাত্র দুই বছরের ব্যবধানে ২০২৫ অর্থবছরে এই আমদানি বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৬৯ কোটি ৭১ লাখ কেজিতে। এর আর্থিক মূল্য ছিল প্রায় ২৬ হাজার ৭০০ কোটি টাকা।
২০২৬ অর্থবছরে সুতা আমদানির মোট ব্যয় বেড়ে প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছেছে। এর মধ্যে প্রায় ৬৫ শতাংশ ছিল ১০ থেকে ৩০ কাউন্টের সুতা।
দেশীয় সুতা উৎপাদনকারীরা মনে করছেন, বিদেশ থেকে আসা এসব সুতার বড় একটি অংশ যদি দেশের কারখানাগুলো উৎপাদন করতে পারে, তাহলে বছরে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা দেশের অর্থনীতির ভেতরে ধরে রাখা সম্ভব হবে।
বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক পরিচালক প্রকৌশলী রাজীব হায়দার বলেন, দেশের বন্ধ ও আংশিক বন্ধ থাকা বস্ত্র কারখানাগুলো কার্যকরভাবে চালু করা গেলে প্রায় ১৫ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান তৈরি হতে পারে।
তিনি বলেন, বস্ত্র খাত শুধু কারখানার শ্রমিকদের ওপর নির্ভরশীল নয়। এই শিল্পের সঙ্গে তুলা পরিবহন, গুদামজাতকরণ, প্যাকেজিং, যন্ত্রপাতি রক্ষণাবেক্ষণ, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ, ব্যাংকিং, বিমা, বয়ন, নিটিং ও রং করার মতো বহু খাত জড়িত।অর্থাৎ বস্ত্র শিল্পের উন্নতি হলে এর প্রভাব ছড়িয়ে পড়বে পুরো অর্থনীতিতে।
সাম্প্রতিক সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, নির্দিষ্ট কিছু সুতার ক্ষেত্রে প্রচলিত শুল্কমুক্ত বন্ড সুবিধার পরিবর্তে নতুন নিয়ম চালু করা হয়েছে।এখন থেকে ব্যাংক গ্যারান্টি, রপ্তানির প্রমাণ যাচাই এবং কঠোর নজরদারির মাধ্যমে আমদানি কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে। এর মাধ্যমে বন্ড সুবিধার অপব্যবহার কমানো এবং স্থানীয় শিল্পকে অযাচিত প্রতিযোগিতা থেকে রক্ষা করাই লক্ষ্য।
ব্যবসায়ীদের মতে, এতদিন কম দামের বিদেশি সুতা বাজার দখল করায় দেশের সুতা কারখানাগুলো উৎপাদন কমাতে বাধ্য হয়েছে। ফলে অনেক বিনিয়োগ ঝুঁকির মুখে পড়েছে।
বাদশা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের প্রতিষ্ঠাতা মো. বাদশা মিয়া বলেন, বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশন সব ধরনের আমদানি তথ্য বিশ্লেষণ করে ১০ থেকে ৩০ কাউন্টের সুতা বন্ড সুবিধার বাইরে রাখার সুপারিশ করেছে। এর মাধ্যমে স্থানীয় সুতা শিল্পকে অসম প্রতিযোগিতা থেকে রক্ষা করা সম্ভব হবে।
তিনি বলেন, শিল্পের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামাল আমদানি এবং দেশীয় উৎপাদনের সক্ষমতার মধ্যে ভারসাম্য রাখা জরুরি। স্থানীয় উৎপাদন ব্যবস্থাকে সুরক্ষা না দিলে বড় বিনিয়োগ ঝুঁকির মধ্যে পড়ে যাবে।
সালমা গ্রুপের পরিচালক ও বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের পরিচালক চৌধুরী মোহাম্মদ হানিফ বলেন, দীর্ঘদিন ধরে সস্তা বিদেশি সুতার কারণে দেশের অনেক মিল তাদের পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করতে পারেনি।
তিনি বলেন, যখন স্থানীয় কারখানার উৎপাদন লাইন বন্ধ থাকে, তখন শুধু একটি প্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয় না, পুরো বস্ত্র সরবরাহ ব্যবস্থাই দুর্বল হয়ে পড়ে।
তার মতে, নতুন নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা দেশের ৩২ বিলিয়ন ডলারের বেশি বিনিয়োগ সুরক্ষায় সহায়তা করবে। একই সঙ্গে সরকারের রাজস্ব আদায় বাড়বে এবং দেশের ভেতরে মূল্য সংযোজনের পরিমাণও বৃদ্ধি পাবে।
বাংলাদেশ বর্তমানে স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণের পর নতুন বাণিজ্যিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে দেশের নিজস্ব বস্ত্র শিল্পকে শক্তিশালী করা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
সুতা আমদানিতে নিয়ন্ত্রণ শুধু আমদানি কমানোর বিষয় নয়, বরং স্থানীয় শিল্পকে টিকিয়ে রাখা, বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় করা এবং লাখো মানুষের কর্মসংস্থান তৈরির একটি কৌশল।
তবে এই উদ্যোগ সফল করতে হলে শুধু আমদানি নিয়ন্ত্রণ নয়, একই সঙ্গে উৎপাদন খরচ কমানো, জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং শিল্পবান্ধব পরিবেশ তৈরি করাও জরুরি। তাহলেই বাংলাদেশের বস্ত্র খাত আবারও শক্ত অবস্থানে ফিরতে পারবে।

