২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশের অর্থনীতিকে ১ ট্রিলিয়ন বা এক লাখ কোটি ডলারে উন্নীত করার লক্ষ্য নিয়ে নতুন করে পরিকল্পনা সাজাচ্ছে সরকার। এ জন্য স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি কৌশলের পাশাপাশি একটি হালনাগাদ পাঁচ বছর মেয়াদি পরিকল্পনাও নেওয়া হচ্ছে।
শনিবার সাভারে ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতে বিশ্ববিদ্যালয়টির নতুন ‘সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ’ উদ্বোধন অনুষ্ঠানে এসব কথা বলেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা বিষয়ক উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর।
তিনি বলেন, টেকসই অর্থনৈতিক ভিত্তি গড়ে তুলতে উৎপাদন ও বিনিয়োগের সুযোগ বাড়ানো জরুরি। ঋণনির্ভরতা ও সুবিধাভিত্তিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা থেকে বেরিয়ে এসে উৎপাদনমুখী বিনিয়োগ এবং শিল্পের বিকাশকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
তিতুমীর বলেন, অর্থনীতিতে টেকসই প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করতে শুধু প্রবৃদ্ধির হার বাড়ালেই হবে না; এর সুফল যেন সমাজের বৃহত্তর অংশের মানুষ পায়, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে। এজন্য বৈষম্য কমানো, সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা এবং মানুষের অংশগ্রহণের সুযোগ বাড়াতে শক্তিশালী ও জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠান প্রয়োজন।
তিনি বলেন, দেশের বিভিন্ন খাতে দীর্ঘদিন ধরে পক্ষপাত, বৈষম্য ও সুবিধাভিত্তিক সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে। জ্বালানি খাতসহ প্রায় সব ক্ষেত্রেই এর প্রভাব দেখা গেছে। এর ফলে একদিকে বেকারত্ব বেড়েছে, অন্যদিকে আয় ও সুযোগের বৈষম্যও গভীর হয়েছে। জুলাইয়ের আন্দোলনের মধ্যেও মানুষের সমতা ও ন্যায্যতার আকাঙ্ক্ষা প্রতিফলিত হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী করাই বড় চ্যালেঞ্জ
তিতুমীরের মতে, একটি দেশের সুশাসন নিশ্চিত করতে ক্ষমতা প্রয়োগ, নীতি প্রণয়ন এবং নীতি বাস্তবায়ন—এই তিনটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। তবে প্রতিষ্ঠানগুলো দক্ষ হলেও যদি সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ ও ন্যায্যতা নিশ্চিত না হয়, তাহলে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া সম্ভব নয়।
তিনি বলেন, প্রতিষ্ঠান বলতে শুধু আইন, বিধিবিধান বা সরকারি কাঠামোকে বোঝায় না। মানুষের প্রচলিত রীতি, আচরণ ও মূল্যবোধও এর অংশ। তাই দেশের আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক প্রতিষ্ঠান—দুই ক্ষেত্রেই গবেষণা প্রয়োজন।
আগের কর্তৃত্ববাদী সময়ের বৈশিষ্ট্যগুলোও গবেষণার মাধ্যমে বিশ্লেষণ করা দরকার বলে মনে করেন তিনি। এসব গবেষণা থেকে এমন একটি বাংলাদেশ গড়ে তোলার পথ বের করতে হবে, যেখানে সমতা, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার নিশ্চিত হবে এবং মুক্তিযুদ্ধের আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে সামঞ্জস্য থাকবে।
তিতুমীর বলেন, দেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা দুর্বল হয়েছে এবং অনেক ক্ষেত্রে জবাবদিহি নিশ্চিত করা যায়নি। অর্থনৈতিক বিষয় গুরুত্বপূর্ণ হলেও টেকসই উন্নয়নের সবচেয়ে বড় শর্ত হলো শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান।
এ ক্ষেত্রে কার স্বার্থে প্রতিষ্ঠানগুলো কাজ করছে, কারা আইন তৈরি করছে, কারা এর সুবিধা পাচ্ছে এবং কার হাতে প্রতিষ্ঠান পরিবর্তনের ক্ষমতা রয়েছে—এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজে দেখা প্রয়োজন বলে তিনি মন্তব্য করেন।
সুশাসনের জন্য বিনিয়োগ বাড়ানোর তাগিদ
অনুষ্ঠানে জাতীয় অধ্যাপক ড. মাহবুব উল্লাহ বলেন, সুশাসনের ধারণা নতুন নয়। কনফুসিয়াস, নিজামুল মুলক, তিরুবল্লুভর ও ইবনে খালদুনের লেখাতেও এর বিভিন্ন উপাদান পাওয়া যায়।
তিনি বলেন, সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য প্রশাসন, শিক্ষা ও প্রশিক্ষণসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। দেশের আইনশৃঙ্খলা, রাজস্ব, ভূমি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও ব্যবসাসহ প্রায় সব খাতেই সুশাসনের সমস্যা রয়েছে।
শুধু প্রযুক্তি বা ডিজিটাল ব্যবস্থা চালু করলেই দুর্নীতি বন্ধ হবে না উল্লেখ করে তিনি বলেন, এর পাশাপাশি মানুষের মধ্যে আস্থা, ন্যায়বিচার ও জবাবদিহির পরিবেশ তৈরি করতে হবে।
রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কাঠামোয় সুবিধাভোগী গোষ্ঠীর প্রভাব এবং ক্ষমতাকেন্দ্রিক ব্যবস্থা থাকলে সুশাসন প্রতিষ্ঠা কঠিন হয়ে পড়ে বলেও তিনি মন্তব্য করেন। তাই প্রচলিত ‘সুশাসন’-এর পাশাপাশি বাস্তব পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ‘যথেষ্ট কার্যকর শাসনব্যবস্থা’র ধারণা নিয়েও ভাবা প্রয়োজন।
নীতি ও বাস্তবায়নের ব্যবধান কমানোর উদ্যোগ
অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজের পরিচালক আবদুল বাকি। তিনি বলেন, বাংলাদেশে চলমান পরিবর্তনগুলো দেশের ভবিষ্যতের জন্য বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। একই সঙ্গে মানুষের প্রত্যাশাও আগের তুলনায় অনেক বেড়েছে।
তার মতে, শুধু সুশাসনের কথা বললেই হবে না; মানুষ বাস্তবে কী পরিবর্তন হচ্ছে, সেটি দেখতে ও বুঝতে চায়। গণতন্ত্র, সামাজিক পরিবর্তন, আন্তর্জাতিক ভূরাজনৈতিক সম্পর্ক এবং সরকারি নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বিদ্যমান ব্যবধান কমানো জরুরি।
তিনি বলেন, দেশে অনেক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হলেও বাস্তবায়নের পর্যায়ে গিয়ে সেগুলো আটকে যায়। জ্ঞান, নীতি ও বাস্তব প্রয়োগের মধ্যে এই দূরত্ব কমানোই নতুন কেন্দ্রটির অন্যতম লক্ষ্য।
সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ গবেষণা, নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে আলোচনা, দক্ষতা উন্নয়ন, পেশাগত শিক্ষা এবং সামাজিক উদ্ভাবনের মাধ্যমে নীতিকে আরও কার্যকর করার বিষয়ে কাজ করবে বলে জানান আবদুল বাকি। পাশাপাশি আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটেও বাংলাদেশের বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে গবেষণা করা হবে।
ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির উপাচার্য অধ্যাপক ড. এম আর কবির বলেন, নতুন এই কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা, গবেষণা, উদ্ভাবন ও সামাজিক অবদানের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।
তার মতে, বিশ্ববিদ্যালয়ের দায়িত্ব শুধু শিক্ষাদানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। নতুন জ্ঞান তৈরি, দায়িত্বশীল নেতৃত্ব গড়ে তোলা এবং দেশের বিভিন্ন জাতীয় ও বৈশ্বিক সমস্যা মোকাবিলায় অবদান রাখাও বিশ্ববিদ্যালয়ের দায়িত্ব।
কার্যকর সুশাসনের জন্য শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান, জ্ঞানভিত্তিক নেতৃত্ব, উদ্ভাবনী চিন্তা এবং তথ্য-প্রমাণনির্ভর সরকারি নীতি প্রয়োজন বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

