মাত্র দুই মাসের মধ্যেই নতুন চালু করা ত্রৈমাসিক ভ্যাট রিটার্ন ও পরিশোধ ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ব্যবসায়ীদের সুবিধার কথা বিবেচনা করে জুলাই মাস থেকে চালু করা এই নতুন পদ্ধতি থেকে আবারও আগের মাসিক ভ্যাট ব্যবস্থায় ফিরে যাওয়ার কথা ভাবছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)।
এনবিআরের মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের কাছ থেকে পাওয়া বিভিন্ন সমস্যার তথ্যের ভিত্তিতে অর্থ মন্ত্রণালয়ের কাছে বর্তমান ব্যবস্থার পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়ার অনুরোধ জানানো হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
একজন এনবিআর কর্মকর্তা জানান, প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি তাদের পক্ষ থেকে সম্পন্ন হয়েছে। এখন বিষয়টি চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের জন্য প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে।
এদিকে নতুন অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে ভ্যাট আদায়ে বড় ধরনের পতন দেখা গেছে। এনবিআরের প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জুলাই ও আগস্ট মাসে ভ্যাট সংগ্রহ আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ২১ শতাংশ কমেছে।
জুলাই মাসে ভ্যাট আদায় হয়েছে ৯ হাজার ৩০২ কোটি টাকা, যেখানে গত বছরের একই সময়ে আদায় হয়েছিল ১১ হাজার ৫৪৭ কোটি টাকা। আগস্টে ভ্যাট সংগ্রহ দাঁড়িয়েছে ৮ হাজার ৩৬২ কোটি টাকায়, যা গত বছরের আগস্টের ১১ হাজার ৮১ কোটি টাকার তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম।
ফলে জুলাই-আগস্ট দুই মাসে মোট ভ্যাট আদায় হয়েছে ১৭ হাজার ৬৬৩ কোটি টাকা। গত অর্থবছরের একই সময়ে এই পরিমাণ ছিল ২২ হাজার ৬২৮ কোটি টাকা।
তবে এনবিআর কর্মকর্তারা বলছেন, নতুন ত্রৈমাসিক ব্যবস্থার কারণে ভ্যাট আদায় কমেছে কি না, সে বিষয়ে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো পর্যাপ্ত তথ্য এখনো পাওয়া যায়নি। কারণ নতুন নিয়ম অনুযায়ী প্রথম তিন মাসের রিটার্ন জমা দেওয়ার শেষ সময় সেপ্টেম্বরের শেষ পর্যন্ত রয়েছে।
নতুন ব্যবস্থায় ব্যবসায়ীরা ভ্যাটের অর্থ সরকারের কাছে জমা দেওয়ার জন্য তুলনামূলক বেশি সময় পাচ্ছেন। আগের নিয়মে প্রতি মাসের ভ্যাট পরবর্তী মাসের ১৫ তারিখের মধ্যে জমা দিতে হতো। অর্থাৎ ব্যবসায়ীরা সর্বোচ্চ প্রায় এক মাস পর্যন্ত ভ্যাটের অর্থ নিজেদের কাছে রাখতে পারতেন।
কিন্তু নতুন ত্রৈমাসিক ব্যবস্থায় তারা প্রায় তিন মাস পর্যন্ত সংগৃহীত ভ্যাটের অর্থ নিজেদের কাছে রাখতে পারছেন। এনবিআরের কর্মকর্তাদের আশঙ্কা, এই দীর্ঘ সময়ের কারণে বড় প্রতিষ্ঠানগুলো সরকারি অর্থ ব্যবহার করে সুদ আয় করার সুযোগ পাচ্ছে।
এক কর্মকর্তা উদাহরণ দিয়ে বলেন, কোনো প্রতিষ্ঠানের কাছে এক মাসে ২০০ কোটি টাকা এবং পরের মাসে আরও ২০০ কোটি টাকা ভ্যাট হিসেবে জমা হলে, তিন মাসের মধ্যে সেই অর্থ বিভিন্ন আর্থিক মাধ্যমে বিনিয়োগ করে প্রতিষ্ঠানগুলো বাড়তি আয় করতে পারে। অথচ এই অর্থ মূলত সরকারের প্রাপ্য রাজস্ব।
এনবিআরের কর্মকর্তাদের মতে, সরকারের নিজস্ব ঋণের সুদ পরিশোধের চাপ রয়েছে। তাই দীর্ঘ সময় ব্যবসায়ীদের কাছে সরকারি অর্থ পড়ে থাকা রাজস্ব ব্যবস্থাপনার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।
মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের অভিযোগ, ত্রৈমাসিক ভ্যাট ব্যবস্থার জন্য প্রয়োজনীয় নজরদারি কাঠামো এখনো পুরোপুরি তৈরি হয়নি। আগে মাসিক ভিত্তিতে সার্কেল, বিভাগ ও ইউনিট পর্যায়ে রাজস্ব আদায়ের হিসাব পর্যবেক্ষণ করা যেত। নতুন ব্যবস্থায় সেই পর্যবেক্ষণ আরও কঠিন হয়ে পড়েছে বলে তারা মনে করছেন।
ঢাকা কমিশনারেটের এক কর্মকর্তা বলেন, প্রতিটি চালানের বিপরীতে ভ্যাট সরাসরি সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়ার মতো কার্যকর ব্যবস্থা এখনো গড়ে ওঠেনি। ফলে ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হচ্ছে।
তিনি মনে করেন, রিটার্ন জমা এবং ভ্যাট পরিশোধ—দুই প্রক্রিয়াই আবার মাসিক ভিত্তিতে ফিরিয়ে আনা উচিত।
তবে ব্যবসায়ী মহল এনবিআরের এই সম্ভাব্য সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করছে। তাদের মতে, ত্রৈমাসিক ভ্যাট ব্যবস্থা চালুর মূল উদ্দেশ্য ছিল ব্যবসার ওপর প্রশাসনিক চাপ কমানো এবং সহজ ব্যবসায়িক পরিবেশ তৈরি করা। এখন আবার মাসিক ব্যবস্থায় ফিরে গেলে সেই উদ্যোগ ব্যাহত হবে।
প্রিমিয়ার সিমেন্ট মিলসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ আমিরুল হক বলেন, কোনো সমস্যা থাকলে এনবিআরের উচিত ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আলোচনা করে সমাধান খোঁজা। তাদের সঙ্গে পরামর্শ না করেই নতুন নিয়ম চালু করা হয়েছিল, এখন আবার হঠাৎ পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
তিনি বলেন, কোনো কোনো প্রতিষ্ঠান নিয়মের অপব্যবহার করলে তার দায় সব ব্যবসার ওপর চাপানো উচিত নয়। যারা নিয়ম মেনে ব্যবসা করছে, তাদের জন্য একই ধরনের কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া ঠিক হবে না।
আমিরুল হক আরও প্রশ্ন তোলেন, যদি তিন মাস পর রাজস্ব গ্রহণ করা পর্যবেক্ষণের সমস্যা তৈরি করে, তাহলে দীর্ঘদিন ধরে চলা অগ্রিম আয়কর ব্যবস্থাতেও তো একই ধরনের সমস্যা থাকার কথা।
এদিকে এনবিআরের কিছু কর্মকর্তা একটি মধ্যবর্তী সমাধানের প্রস্তাব দিয়েছেন। তাদের মতে, ব্যবসায়ীরা চাইলে প্রতি তিন মাসে ভ্যাট রিটার্ন জমা দিতে পারেন, তবে সংগৃহীত ভ্যাটের অর্থ প্রতি মাসেই সরকারি কোষাগারে জমা দিতে হবে।
অর্থমন্ত্রী আমির কসরু মাহমুদ চৌধুরী জানিয়েছেন, ত্রৈমাসিক ভ্যাট রিটার্ন ব্যবস্থায় তৈরি হওয়া জটিলতা নিয়ে সরকার আলোচনা করবে এবং শিগগিরই সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
বর্তমানে বাংলাদেশে ৮ লাখের বেশি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ভ্যাট নিবন্ধনের আওতায় রয়েছে এবং তাদের প্রত্যেকের জন্য ভ্যাট ব্যবস্থার পরিবর্তন সরাসরি ব্যবসায়িক কার্যক্রমে প্রভাব ফেলতে পারে।

