বিশ্বজুড়ে চলমান ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা, জ্বালানি সরবরাহের অনিশ্চয়তা এবং সমুদ্রপথে বাড়তে থাকা ঝুঁকির প্রভাব সরাসরি পড়ছে বাংলাদেশের আমদানি বাণিজ্যে। মাত্র ৯ মাসের ব্যবধানে জাহাজে করে একটি কনটেইনার পণ্য দেশে এনে বন্দর থেকে খালাস পর্যন্ত ব্যবসায়ীদের অতিরিক্ত ব্যয় বেড়েছে গড়ে ৬৬ শতাংশ।
এই পরিস্থিতি শুধু ব্যবসায়ীদের জন্য নতুন চাপ তৈরি করছে না, বরং এর প্রভাব ধীরে ধীরে সাধারণ ভোক্তার ওপরও পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। কারণ দেশের জ্বালানি, খাদ্যপণ্য, শিল্পের কাঁচামালসহ অনেক গুরুত্বপূর্ণ পণ্যই সমুদ্রপথে আমদানি করা হয়।
চট্টগ্রাম বন্দরকে কেন্দ্র করে পরিচালিত দেশের আমদানি ব্যবস্থায় কয়েকটি কারণে একসঙ্গে ব্যয় বেড়েছে। এর মধ্যে রয়েছে বন্দরের বাড়তি মাশুল, আন্তর্জাতিক জাহাজ ভাড়া বৃদ্ধি, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি, বীমা খরচ বৃদ্ধি এবং সমুদ্রপথে নিরাপত্তাজনিত ঝুঁকি।
গত ডিসেম্বর মাসে চট্টগ্রাম বন্দর ২৩টি খাতে মাশুল বাড়ায়। এতে গড়ে ৪১ শতাংশ পর্যন্ত খরচ বৃদ্ধি পায়। ২০ ফুট আকারের একটি আমদানি কনটেইনার খালাস করতে ব্যবসায়ীদের অতিরিক্ত ৫ হাজার ৭২০ টাকা দিতে হচ্ছে। আগে যেখানে ১০ হাজার ৫২৩ টাকা খরচ হতো, এখন সেখানে দিতে হচ্ছে ১৬ হাজার ২৪৩ টাকা।
বন্দরের এই বাড়তি ব্যয়ের চাপ কাটিয়ে উঠতে না উঠতেই আন্তর্জাতিক সমুদ্রপথে নতুন সংকট তৈরি হয়। গত ফেব্রুয়ারি থেকে হরমুজ প্রণালিতে অস্থিরতা শুরু হলে জাহাজ চলাচলে ঝুঁকি বাড়ে। এর প্রভাবে চট্টগ্রাম বন্দরে একটি কনটেইনার পণ্য আনার পরিবহন খরচ বেড়ে যায় প্রায় ২৫ শতাংশ।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি, নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে অতিরিক্ত বীমা খরচ এবং জাহাজ পরিচালনার বাড়তি ব্যয়। সব মিলিয়ে একটি কনটেইনার পণ্য আমদানির মোট ব্যয় বেড়েছে প্রায় ৬৬ শতাংশ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতি যদি আরও খারাপ হয়, তাহলে বাংলাদেশের আমদানি ব্যয়ের চাপ আরও বেড়ে যেতে পারে। বিশেষ করে বাব-আল মান্দেব প্রণালিতে অস্থিরতা বাড়লে পরিস্থিতি আরও জটিল হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
লোহিত সাগরের এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ বন্ধ হয়ে গেলে ইউরোপ ও আমেরিকার সঙ্গে চলাচলকারী জাহাজগুলোকে আফ্রিকার উত্তমাশা অন্তরীপ ঘুরে যেতে হবে। এতে জাহাজকে প্রায় সাড়ে সাত হাজার কিলোমিটার অতিরিক্ত পথ পাড়ি দিতে হবে।
এমন পরিস্থিতিতে একটি কনটেইনার পণ্য আমদানির খরচ ৬৬ শতাংশ থেকে বেড়ে প্রায় ৮৬ শতাংশ পর্যন্ত যেতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন ব্যবসায়ীরা।
এরই মধ্যে এর বাস্তব উদাহরণ দেখা গেছে। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের জন্য অপরিশোধিত জ্বালানি তেল নিয়ে আসা ‘এমটি নিমেনিয়া’ জাহাজটি বিকল্প পথ ব্যবহার করে চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছায়। পথ পরিবর্তনের কারণে জাহাজটিকে মূল ভাড়ার বাইরে প্রায় ৫৪ লাখ ডলার অতিরিক্ত খরচ করতে হয়েছে। প্রতি ডলার ১২৩ টাকা ৫০ পয়সা হিসাবে এই অতিরিক্ত ব্যয়ের পরিমাণ প্রায় ৬৭ কোটি টাকা।
সমুদ্রপথে পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধির সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ছে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে। ফ্রেইট ফরোয়াডার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান খায়রুল আলম সুজনের তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধ শুরুর আগে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক থেকে চট্টগ্রামে ২০ ফুটের একটি কনটেইনার আনতে যেখানে গড়ে ১ হাজার ৪০০ মার্কিন ডলার খরচ হতো, বর্তমানে সেখানে লাগছে প্রায় ২ হাজার ৫০০ ডলার।
একইভাবে বাংলাদেশ থেকে নিউইয়র্কে একটি রপ্তানি কনটেইনার পাঠাতে আগে প্রায় ৩ হাজার ডলার খরচ হলেও এখন তা বেড়ে ৬ হাজার ডলারের বেশি হয়েছে। ইউরোপের হামবুর্গ বন্দরে পণ্য পাঠানোর ক্ষেত্রেও ব্যয় প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে।
চীনের নিংবো বন্দর থেকে সরাসরি রুটে বাংলাদেশে একটি ২০ ফুট কনটেইনার আনতে আগে প্রায় দেড় হাজার ডলার খরচ হতো। বর্তমানে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১ হাজার ৯৫০ ডলারে।
পরিবহন ব্যয়ের পাশাপাশি দেশের বন্দরের খরচও ব্যবসায়ীদের জন্য নতুন বোঝা তৈরি করছে। চট্টগ্রাম বন্দরে বর্ধিত মাশুল কার্যকর হওয়ার পর কনটেইনার ওঠানামা, সংরক্ষণ এবং অন্যান্য সেবার খরচ বেড়েছে।
ব্যবসায়ীদের আশঙ্কা, বাব-আল মান্দেব প্রণালিতে সংকট তৈরি হলে শুধু পরিবহন সময়ই বাড়বে না, বরং সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের বাধা তৈরি হবে। এশিয়া থেকে ইউরোপগামী পণ্য পৌঁছাতে অতিরিক্ত ১২ থেকে ২০ দিন সময় লাগতে পারে।
এর ফলে জাহাজ ভাড়া, জ্বালানি ব্যয় এবং বীমা খরচ মিলিয়ে পরিবহন ব্যয় আরও ৪০ থেকে ৪৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে।
বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য এই পরিস্থিতি গুরুত্বপূর্ণ কারণ দেশের বড় অংশের জ্বালানি চাহিদা আমদানির মাধ্যমে পূরণ করা হয়। প্রতি বছর দেশের মোট জ্বালানি চাহিদার প্রায় ৬০ শতাংশ আমদানির ওপর নির্ভরশীল। পাশাপাশি চাল, ডাল, ভোজ্যতেল, সার, ইস্পাতের কাঁচামাল এবং সিমেন্ট তৈরির উপকরণের বড় অংশও আসে সমুদ্রপথে।
ফলে সমুদ্রপথের এই সংকট দীর্ঘস্থায়ী হলে এর প্রভাব শুধু ব্যবসায়ী পর্যায়ে সীমাবদ্ধ থাকবে না। উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি, পণ্যের দাম বৃদ্ধি এবং বাজারে মূল্যস্ফীতির চাপ আরও বাড়তে পারে।
বর্তমানে বাংলাদেশের সমুদ্র বাণিজ্য অনেকাংশে বিদেশি জাহাজ কোম্পানির ওপর নির্ভরশীল। দেশে পর্যাপ্ত সংখ্যক পণ্যবাহী জাহাজ না থাকায় আন্তর্জাতিক জাহাজ কোম্পানিগুলোর বাড়তি পরিচালন ব্যয়ও শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের আমদানিকারকদের বহন করতে হচ্ছে।
দেশে প্রতিবছর শুধু চট্টগ্রাম বন্দরেই প্রায় ৩৩ লাখ ২০ ফুট আকারের কনটেইনার ওঠানামা করে। এই বিপুল বাণিজ্যের জন্য মায়েরস্ক, ওশেন নেটওয়ার্ক এক্সপ্রেস, সিএমএ সিজিএম, এমএসসি এবং হ্যাপাগ-লয়েডসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক জাহাজ কোম্পানি কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়েছে কনটেইনার সংরক্ষণ ও বিলম্বজনিত অতিরিক্ত চার্জ বৃদ্ধির কারণে। গত এপ্রিল থেকে কয়েকটি বড় জাহাজ কোম্পানি ডিটেনশন চার্জ ৪ থেকে ১০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়িয়েছে।
ব্যবসায়ীদের মতে, একদিকে বাড়ছে পণ্যের আন্তর্জাতিক দাম, অন্যদিকে বাড়ছে পরিবহন ব্যয় ও বন্দরের খরচ। সব মিলিয়ে আমদানি খাত এখন এক ধরনের ত্রিমুখী চাপের মধ্যে রয়েছে।
চট্টগ্রাম চেম্বারের সভাপতি আমিরুল হক চৌধুরীর মতে, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরান যুদ্ধ শুরুর পর থেকে প্রতি টনে জাহাজ ভাড়া ২০ থেকে ২৫ ডলার পর্যন্ত বেড়েছে। একই সঙ্গে গমের দামও প্রতি টনে ৩০ থেকে ৪০ ডলার পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে।
বর্তমান পরিস্থিতি বাংলাদেশের জন্য একটি বড় বার্তা দিচ্ছে—বিশ্ব বাণিজ্যের অস্থিরতা মোকাবিলায় দেশের নিজস্ব পরিবহন সক্ষমতা বৃদ্ধি, বিকল্প সরবরাহ ব্যবস্থা তৈরি এবং দীর্ঘমেয়াদি বাণিজ্য পরিকল্পনা এখন আগের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
সমুদ্রপথে চলমান এই সংকট সাময়িক নাকি দীর্ঘস্থায়ী হবে, তা নির্ভর করছে আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির ওপর। তবে এরই মধ্যে এর অর্থনৈতিক প্রভাব বাংলাদেশে অনুভূত হতে শুরু করেছে।

