এ বছর আউশ ধানের ফলন ভালো হলেও দাম কমে যাওয়ায় লোকসানের হিসাব করছেন দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের কৃষকরা। নওগাঁর মহাদেবপুর উপজেলার এক কৃষকের হিসাবেই ফুটে উঠেছে এই বাস্তবতা— প্রায় এগারো বিঘা জমিতে আউশ চাষ করে প্রতি বিঘায় খরচ হয়েছে চৌদ্দ থেকে পনেরো হাজার টাকা, আর ফলন হয়েছে বিঘায় বারো থেকে ষোলো মণ। কিন্তু বর্তমান বাজারদরে ধান বিক্রি করে আয় হচ্ছে বিঘাপ্রতি প্রায় এগারো হাজার টাকা, ফলে প্রতি বিঘায় চার থেকে পাঁচ হাজার টাকা লোকসান গুনতে হচ্ছে তাকে।
এই চাষির মতো দেশের বহু আউশ চাষি একই পরিস্থিতির শিকার। গত বছরের তুলনায় এবার ধানের দাম মণে তিনশ থেকে চারশ টাকা কমেছে, অথচ উৎপাদন খরচ উল্টো বেড়েছে। কৃষকদের ভাষ্য, কম দামে ধান বিক্রি করে উৎপাদন খরচ তোলাই এখন কঠিন হয়ে পড়েছে, ফলে সার-কীটনাশক ও সেচের ঋণ মেটাতে অনেকে ভেজা ধানও অর্ধেক দামে বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন।
চালকল মালিকদের মতে, বাজারে বাড়তি মজুতই দাম কমার মূল কারণ। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে ব্যাপক চাল আমদানির ফলে এই মজুত তৈরি হয়েছে। খাদ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, চলতি সেপ্টেম্বরে দেশে খাদ্যশস্যের মজুত বেড়ে প্রায় সাড়ে তেইশ লাখ টনে পৌঁছেছে, যা এক বছর আগে ছিল সাড়ে আঠারো লাখ টনের মতো। গত অর্থবছরে দেশে মোট প্রায় সাড়ে বারো লাখ টন চাল আমদানি হয়েছে।
নওগাঁর স্থানীয় বাজার ঘুরে দেখা গেছে, আউশ ধান এখন প্রতি মণ সাড়ে ছয়শ থেকে সাড়ে সাতশ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, যেখানে গত বছর একই সময়ে দাম ছিল এক হাজার থেকে এক হাজার দুইশ টাকার মতো। স্থানীয় একজন মৌসুমি ধান ব্যবসায়ী জানিয়েছেন, বড় মিল মালিকরা এখন কম ধান কিনছেন, যা দাম কমার প্রধান কারণ। বগুড়ার শেরপুর থেকে আসা একজন চালকল মালিক জানান, তার গুদামেও এখনো বিপুল পরিমাণ ধান অবিক্রীত রয়ে গেছে, আর পর্যাপ্ত রোদ না থাকায় ধান শুকাতেও সমস্যা হচ্ছে।
নওগাঁ জেলার একজন কৃষি বিপণন কর্মকর্তা স্বীকার করেছেন, এ বছর আউশ ধানের উৎপাদন খরচ প্রতি কেজি ছাব্বিশ থেকে সাতাশ টাকা পর্যন্ত পৌঁছেছে, যার ফলে বর্তমান বাজারদরে কৃষকরা লোকসানের মুখে পড়ছেন। তিনি জানান, উৎপাদন খরচ ও বাজারদরের তথ্য নিয়মিত সরকারকে জানানো হলেও সরকারের হস্তক্ষেপ ছাড়া স্থানীয় পর্যায়ে দাম নির্ধারণের সুযোগ তাদের নেই।
ফরিদপুরের বোয়ালমারী উপজেলার একজন কৃষকও একই সমস্যার কথা জানিয়েছেন— প্রতি মণ ধান উৎপাদনে যেখানে অন্তত এক হাজার টাকা খরচ হয়েছে, সেখানে বিক্রি করতে হচ্ছে নয়শ পঞ্চাশ থেকে এগারোশ টাকার মধ্যে। বাড়তি সার খরচ, অনিয়মিত বিদ্যুৎ সরবরাহ এবং সেচের অতিরিক্ত খরচকে তিনি বড় সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের রংপুর অঞ্চলের একজন কর্মকর্তাও উৎপাদন খরচ বৃদ্ধির কারণেই এ বছর আউশ চাষে কৃষকের লাভ সীমিত থাকার কথা স্বীকার করেছেন।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের পরিসংখ্যান বলছে, গত পাঁচ বছরে দেশে আউশ চাষের জমির পরিমাণ ধারাবাহিকভাবে কমেছে— ২০২১-২২ অর্থবছরে যা ছিল সাড়ে এগারো লাখ হেক্টর, তা কমে চলতি অর্থবছরে দাঁড়িয়েছে সাড়ে নয় লাখ হেক্টরের কিছু কমে। এই সময়ে উৎপাদনও কমেছে প্রায় পাঁচ লাখ টন। দেশে আউশের প্রধান জাতগুলোর মধ্যে রয়েছে কয়েকটি উচ্চফলনশীল জাত, যাদের গড় ফলন হেক্টরে প্রায় তিন টনের কিছু বেশি।
একজন কৃষি অর্থনীতিবিদের মতে, সরকারের শস্য আমদানি সিদ্ধান্তে দেশের অভ্যন্তরীণ ফসল উৎপাদনের সময়সূচি ও বাজার সরবরাহ পরিস্থিতি বিবেচনায় নেওয়া জরুরি। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন সাবেক উপাচার্য ও অর্থনীতিবিদের ভাষ্য, উচ্চ উৎপাদন খরচ, সীমিত বাজার চাহিদা এবং তুলনামূলক কম ফলনের কারণে আউশের উৎপাদন বাড়ানো কঠিন হলেও পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষা ও ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ কমাতে এই চাষ সম্প্রসারণ জরুরি— বিশেষ করে অতিরিক্ত বোরো চাষের কারণে রাজশাহীর বরেন্দ্র অঞ্চলের মতো এলাকায় পানির স্তর যেভাবে নেমে যাচ্ছে, তার প্রেক্ষাপটে।
তিনি আউশ চাষিদের জন্য একটি সরকারি ক্রয়মূল্য নির্ধারণের পরামর্শ দিয়েছেন, পাশাপাশি এই খাতে গবেষণা ও উন্নয়নে বিনিয়োগ বাড়ানোর ওপরও জোর দিয়েছেন।
সামগ্রিকভাবে এই পরিস্থিতি একটি স্ববিরোধী চিত্র তুলে ধরছে— উৎপাদন বাড়লেও কৃষকের আর্থিক সুরক্ষা বাড়ছে না, বরং আমদানিনির্ভর মজুত ব্যবস্থাপনার প্রভাবে স্থানীয় বাজারেই কৃষক ক্ষতির মুখে পড়ছেন। দীর্ঘমেয়াদে এই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে কৃষকরা আউশ চাষ থেকে সরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে পারেন, যা খাদ্য নিরাপত্তা ও পরিবেশগত ভারসাম্য— দুটোর জন্যই দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি তৈরি করতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

