আন্তর্জাতিক ক্রেডিট রেটিং প্রতিষ্ঠান মুডিস রেটিং বাংলাদেশের অর্থনীতি নিয়ে একটি স্বস্তিদায়ক মূল্যায়ন প্রকাশ করেছে। সংস্থাটি দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক পূর্বাভাস বা আউটলুক ‘নেতিবাচক’ অবস্থান থেকে সরিয়ে এনেছে ‘স্থিতিশীল’ পর্যায়ে। তবে দীর্ঘমেয়াদি ঋণমান ‘বি২’ এবং স্বল্পমেয়াদি রেটিং ‘নট প্রাইম’—এই দুটি সূচকে কোনো পরিবর্তন আনা হয়নি।
মুডিসের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০২৪ সাল পর্যন্ত রাজনৈতিক অস্থিরতার জেরে যে অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছিল এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ নিয়ে যে উদ্বেগ দেখা দিয়েছিল, তা মূলত কেটে গেছে। এই উন্নতির কারণেই সংস্থাটি মনে করছে, নিকট ভবিষ্যতে বাংলাদেশের ঋণমান আরও নিচে নামার সম্ভাবনা কম।
তবে এর অর্থ এই নয় যে ঝুঁকি একেবারে শেষ হয়ে গেছে। মুডিস স্পষ্ট করেই বলেছে, দেশের রাজস্ব আয় এখনও অপ্রতুল এবং ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের হার উচ্চ—এই দুটি কাঠামোগত দুর্বলতা এখনো বিদ্যমান। কোনো বৈশ্বিক বা অভ্যন্তরীণ ধাক্কা এলে দীর্ঘমেয়াদে এই দুর্বলতাগুলো থেকে নতুন ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। এই কারণেই ঋণমান এখনও ‘বি২’ বা উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ শ্রেণিতেই রাখা হয়েছে। স্বল্পমেয়াদি ‘নট প্রাইম’ রেটিংয়ের অর্থ হলো, এক বছর বা তার কম মেয়াদে জরুরি দেনা মেটানোর ক্ষেত্রে সরকারের আর্থিক অবস্থান এখনও সর্বোচ্চ নিরাপদ পর্যায়ে পৌঁছায়নি।
গতকাল মঙ্গলবার সিঙ্গাপুরে অবস্থিত মুডিসের আঞ্চলিক কার্যালয় থেকে এই রেটিং প্রকাশ করা হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অস্থিরতা কাটিয়ে বাংলাদেশ তার বৈদেশিক লেনদেন ব্যবস্থাকে অনেকটাই স্থিতিশীল করতে পেরেছে। তবে দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক গতি বজায় রাখতে ব্যাংকিং খাতের কাঠামোগত সমস্যার সমাধান এবং রাজস্ব আদায় বৃদ্ধিকে অপরিহার্য বলে মনে করছে সংস্থাটি।
প্রসঙ্গত, অন্য দুটি বড় রেটিং সংস্থার মূল্যায়ন কিন্তু ভিন্ন দিকে গিয়েছিল। গত জুনে এসঅ্যান্ডপি গ্লোবাল বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি আউটলুক ‘স্থিতিশীল’ থেকে ‘নেতিবাচক’ করে দেয়, যার পেছনে তারা ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা, বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ঝুঁকিকে কারণ হিসেবে দেখিয়েছিল। এর মাত্র এক মাস আগে ফিচ রেটিংসও একই পথে হেঁটে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত থেকে তৈরি সামষ্টিক অর্থনৈতিক ঝুঁকির কথা বলে বাংলাদেশের আউটলুক নেতিবাচক করে দিয়েছিল। এই প্রেক্ষাপটে মুডিসের ইতিবাচক অবস্থান তুলনামূলকভাবে ভিন্ন সুর বহন করছে।
মুডিসের মূল্যায়নে গুরুত্বপূর্ণভাবে উল্লেখ করা হয়েছে গত ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনের কথা। এই নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত নতুন সরকার একটি শক্তিশালী জনসমর্থন নিয়ে দায়িত্ব নেওয়ায় নীতিগত অনিশ্চয়তা এবং সংস্কার কার্যক্রম থমকে যাওয়ার আশঙ্কা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে এসেছে। সরকারের বিনিয়োগ-সহায়ক নীতি, দীর্ঘদিন আটকে থাকা প্রকল্পগুলো এগিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ এবং ব্যবসায়িক পরিবেশ উন্নয়নের চেষ্টা—এসব মিলিয়ে অর্থনীতিতে নতুন গতি সঞ্চারিত হচ্ছে বলে মনে করছে সংস্থাটি।
রেটিং পরিবর্তনের পেছনে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের প্রবৃদ্ধি। ২০২৪ সালের শেষদিকে রিজার্ভ নেমে গিয়েছিল প্রায় ২১ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলারে, যা ছিল উদ্বেগের একটি বড় কারণ। তবে চলতি বছরের মাঝামাঝি সময়ে এসে সেই রিজার্ভ বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩২ দশমিক ৯ বিলিয়ন ডলারে—যা একটি লক্ষণীয় উন্নতি।
এই উন্নতির পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেলে রেকর্ড পরিমাণ প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্স প্রবাহ। পরিস্থিতি এতটাই পরিবর্তিত হয়েছে যে বাংলাদেশ ব্যাংক এখন মুদ্রার মান ধরে রাখতে রিজার্ভ থেকে ডলার বিক্রি করার পরিবর্তে বরং ডলার কেনার দিকে ঝুঁকছে। এর ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির উচ্চ মূল্যের ধাক্কা সামলানো তুলনামূলক সহজ হচ্ছে। মুডিস আরও উল্লেখ করেছে, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলসহ বিভিন্ন বৈশ্বিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বাংলাদেশের ধারাবাহিক সহযোগিতাও সংস্কার কার্যক্রমের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির প্রশ্নে মুডিস বলছে, আগামী কয়েক বছরে প্রবৃদ্ধির গতি ধীরে ধীরে বাড়বে এবং ২০২৮ অর্থবছর থেকে তা আবার শক্তিশালী রূপ নিতে পারে। হিসাব বলছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ছিল ৩ দশমিক ৫ শতাংশ, যা গত অর্থবছরে বেড়ে হয় ৪ দশমিক ১ শতাংশ। চলতি অর্থবছরে এই হার আরও বেড়ে ৪ দশমিক ৩ শতাংশে পৌঁছাতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। আগামী অর্থবছর থেকে বিনিয়োগ পরিস্থিতি ও শিল্প উৎপাদন স্বাভাবিক হয়ে এলে প্রবৃদ্ধির হার প্রায় ৪ দশমিক ৯ শতাংশে উন্নীত হতে পারে।
দীর্ঘমেয়াদি সম্ভাবনা ও বর্তমান ঝুঁকি—দুটোকেই সমান গুরুত্ব দিয়ে মুডিস বাংলাদেশের ‘বি২’ রেটিং অপরিবর্তিত রেখেছে। তাদের মতে, দেশের অনুকূল জনসংখ্যাগত কাঠামো এবং বৈশ্বিক বাজারে প্রতিযোগিতামূলক তৈরি পোশাক খাত ভবিষ্যতের প্রবৃদ্ধির জন্য শক্তিশালী চালিকাশক্তি হতে পারে। এছাড়া আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর কাছ থেকে সহজ শর্তে ঋণ পাওয়ার সুযোগ সরকারের ঋণ পরিশোধের ঝুঁকি কমাতে সহায়ক হচ্ছে। বাংলাদেশের সার্বিক ঋণের পরিমাণ জিডিপির প্রায় ৪০ শতাংশের মধ্যে থাকায় সেটিকেও মুডিস একটি মাঝারি বা সহনীয় পর্যায়ের ঋণভার বলে মূল্যায়ন করেছে।
তবে মুডিসের প্রতিবেদনে বাংলাদেশের অর্থনীতির গভীর কিছু দুর্বলতার কথাও স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়েছে। সবচেয়ে বড় সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে সরকারের সীমিত রাজস্ব ভিত্তি, যার কারণে উন্নয়ন কার্যক্রমে ব্যয় করার সক্ষমতা সীমিত থেকে যাচ্ছে। উদ্বেগজনক বিষয় হলো, আদায় করা রাজস্বের প্রায় ৩০ শতাংশই চলে যাচ্ছে ঋণের সুদ পরিশোধে। এর পাশাপাশি ব্যাংকিং খাতের নাজুক অবস্থাকেও মুডিস অর্থনীতির একটি বড় ঝুঁকির জায়গা হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, মুডিসের এই মূল্যায়ন বাংলাদেশের অর্থনীতির স্বল্পমেয়াদি স্থিতিশীলতাকে স্বীকৃতি দিলেও দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত সংস্কার—বিশেষ করে রাজস্ব আদায় বৃদ্ধি ও ব্যাংকিং খাতের শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা—ছাড়া প্রকৃত অর্থনৈতিক সুস্থিরতা অর্জন কঠিন হবে বলেই ইঙ্গিত দিচ্ছে।

