রাজধানীর যান চলাচলে নতুন সংযোগ আনতে যাওয়া মেট্রোরেল প্রকল্প এমআরটি লাইন-৫ সাউদার্ন এখন এক অনিশ্চিত মুহূর্তের মুখে দাঁড়িয়ে। প্রকল্প ব্যয় কয়েক হাজার কোটি টাকা কমানো হলেও শেষ পর্যন্ত এটি অনুমোদন পাবে কিনা, তা নিয়ে তৈরি হয়েছে ধোঁয়াশা।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, গাবতলী থেকে দাশেরকান্দি পর্যন্ত মাত্র ২৮ মিনিটে যাত্রা সম্পন্ন করা সম্ভব হবে এই মেট্রোরেলে। যাত্রীচাপ বেশি থাকা সময়ে প্রতি সাড়ে চার মিনিট অন্তর একটি ট্রেন চলবে, এবং প্রতিটি ট্রেনে একসঙ্গে প্রায় দুই হাজার যাত্রী বহনের সক্ষমতা থাকবে। মোট ১৭ দশমিক ২০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই রুটটি আজ বুধবার একনেক সভায় উপস্থাপনের কথা রয়েছে, যেখানে প্রস্তাবিত ব্যয় ধরা হয়েছে ৪৫ হাজার ৫০৩ কোটি টাকার বেশি। তবে কার্যতালিকায় থাকলেও অনুমোদন প্রশ্নে অনিশ্চয়তা স্পষ্ট।
সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানিয়েছে, প্রকল্পের প্রস্তুতিমূলক কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে থাকায় এটিকে একনেকে তোলার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল এবং পরিকল্পনা কমিশনের সংশ্লিষ্ট বিভাগ এ বিষয়ে উপস্থাপনাও প্রস্তুত করেছে। তবে শেষ মুহূর্তে সরকার প্রকল্পটি অনুমোদন না করার সম্ভাবনাও বিবেচনায় রাখছে। এর একটি কারণ, একই উন্নয়ন সহযোগীর অর্থায়নে পরিকল্পিত আরও দুটি মেট্রোরেল প্রকল্পের অনুমোদন প্রশ্নে সিদ্ধান্ত হতে পারে এর আগে। এ ছাড়া প্রকল্পের পরামর্শক নিয়োগ প্রক্রিয়ায় যোগসাজশের অভিযোগ তুলেছে একটি আন্তর্জাতিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান, যা পরিস্থিতি আরও জটিল করে তুলেছে।
প্রকল্পের বিস্তারিত পরিকল্পনা অনুযায়ী, মেট্রোরেলটি গাবতলী থেকে শুরু হয়ে টেকনিক্যাল, কল্যাণপুর, শ্যামলী, কলেজ গেট, আসাদ গেট, শুক্রাবাদ, কাওরান বাজার, হাতিরঝিল, তেজগাঁও ও আফতাবনগর অতিক্রম করে দাশেরকান্দিতে গিয়ে শেষ হবে। পুরো পথের মধ্যে ১৩ কিলোমিটারের বেশি অংশ থাকবে পাতালে, বাকি অংশ থাকবে উড়ালপথে। মোট ১৫টি স্টেশনের মধ্যে ১১টি হবে পাতাল স্টেশন এবং চারটি উড়াল স্টেশন।
শুরুর পরিকল্পনায় ছয় কোচবিশিষ্ট ১৯টি শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ট্রেন দিয়ে সেবা চালু করার কথা রয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের হিসাব বলছে, চালু হলে প্রতিদিন প্রায় সাড়ে নয় লাখের কাছাকাছি যাত্রী এই লাইন ব্যবহার করতে পারবেন। যদিও পাতালপথের অংশ বেশি হওয়ায় নির্মাণ ব্যয়ও তুলনামূলক বেশি পড়ছে—গড় হিসাবে প্রতি কিলোমিটারে ব্যয় হচ্ছে প্রায় ২ হাজার ৬৪০ কোটি টাকা।
পরিকল্পনা কমিশনের ভৌত অবকাঠামো বিভাগের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা মন্তব্য করেন, ঢাকার যানজট নিরসনে মেট্রোরেলের কোনো বিকল্প নেই এবং ধীরে ধীরে সব রুট বাস্তবায়ন করে যেতে হবে। তবে তার মতে, এই বিনিয়োগের পুরো সুফল তখনই পাওয়া সম্ভব হবে, যখন সবগুলো রুট একসঙ্গে চালু হবে।
প্রকল্পটির প্রাথমিক ব্যয় ছিল আরও বেশি। আগের সরকারের সময় নেওয়া পরিকল্পনায় ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছিল প্রায় ৫৪ হাজার ৬১৯ কোটি টাকা। অন্তর্বর্তী সরকার আসার পর প্রকল্পটি নতুন করে পর্যালোচনা করে বিভিন্ন খাতে ব্যয় কমানো হয়, যার ফলে সর্বশেষ প্রস্তাবে ব্যয় নেমে আসে ৪৫ হাজার ৫০৩ কোটি টাকায়। অর্থাৎ শুরুর তুলনায় মোট ব্যয় কমেছে প্রায় ৯ হাজার ১১৫ কোটি টাকা বা প্রায় সাড়ে ষোলো শতাংশ।
তবে এই হ্রাসের পুরোটাই বাস্তবিক সাশ্রয় নয়। বিদেশি ঋণের সুদ এবং কমিটমেন্ট চার্জের মতো কিছু দায় হিসাব থেকে বাদ দেওয়ায় কাগজে-কলমে ব্যয় কমেছে, যদিও প্রকৃতপক্ষে সরকারের ওপর এই দায় থেকেই যাচ্ছে। ঋণের গ্রেস পিরিয়ড শেষ হওয়ার পর পরিশোধযোগ্য সুদ ও চার্জ বাবদ প্রায় দুই হাজার কোটি টাকা আলাদাভাবে অর্থ বিভাগ পরবর্তীতে পরিশোধ করবে।
গত জুলাই মাসে পরিকল্পনা কমিশনের একটি পর্যালোচনা সভায়ও ব্যয় ছাঁটাই করা হয়েছিল, যেখানে প্রায় ৪৭ হাজার ৬৩৫ কোটি টাকার প্রস্তাব থেকে দুই হাজারের বেশি কোটি টাকা বাদ দেওয়া হয়। পরে সংশোধিত এই প্রস্তাব অনুমোদনের জন্য পাঠানো হয় পরিকল্পনা কমিশনে। ব্যয় কমানোর প্রক্রিয়ায় ঋণজনিত দায় ছাড়াও জমি অধিগ্রহণ, যানবাহন সংগ্রহ, পরামর্শক ব্যয়, সম্মানি ও প্রশাসনিক খরচের বিভিন্ন খাত পুনর্মূল্যায়ন করা হয়েছে। এমনকি জমির প্রয়োজনও কমিয়ে আনা হয়েছে—শুরুতে প্রায় ২৩ হেক্টর জমি প্রয়োজন ধরা হলেও সংশোধিত প্রস্তাবে তা নেমে এসেছে প্রায় ৯ হেক্টরে, যার ফলে জমি অধিগ্রহণ ব্যয় প্রায় ১০০ কোটি টাকা কমার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। তবে পুনর্বাসন খাতে এখনও বড় অঙ্কের বরাদ্দ থাকছে, যা প্রায় সাড়ে চার হাজার কোটি টাকার কাছাকাছি।
প্রকল্পের ব্যয়ের একটি বড় অংশ আসবে বৈদেশিক ঋণ থেকে। সরকারের নিজস্ব খাত থেকে ব্যয় হবে প্রায় ১৫ হাজার ২০০ কোটি টাকা, বাকি প্রায় ৩০ হাজার ৩০৬ কোটি টাকা আসবে বিদেশি ঋণ হিসেবে। এই অর্থায়নে এগিয়ে আসছে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক এবং দক্ষিণ কোরিয়ার একটি অর্থনৈতিক উন্নয়ন সহযোগিতা তহবিল, যারা যথাক্রমে সর্বোচ্চ ৩০০ কোটি ও ১৫০ কোটি মার্কিন ডলার ঋণ দেওয়ার প্রাথমিক প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। প্রকল্পের অগ্রগতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ধাপে ধাপে এই ঋণের অর্থ ছাড় করার পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রকল্পটির বাস্তবায়নকাল ধরা হয়েছে চলতি বছরের সেপ্টেম্বর থেকে ২০৩৩ সালের আগস্ট পর্যন্ত। এর আগেই প্রাক্-সম্ভাব্যতা সমীক্ষা, নকশা তৈরি, দরপত্র সহায়তা এবং জমি অধিগ্রহণ ও পুনর্বাসন পরিকল্পনার কাজ কারিগরি সহায়তার মাধ্যমে শেষ হয়েছে বলে জানা গেছে।
এখন সবকিছুই নির্ভর করছে একনেকের সিদ্ধান্তের ওপর। অনুমোদন পেলে অর্থায়ন চুক্তি স্বাক্ষর, জমি অধিগ্রহণ এবং ঠিকাদার নিয়োগের মতো পরবর্তী পদক্ষেপগুলো শুরু করা সম্ভব হবে। সেক্ষেত্রে আগের সরকারের আমলে পরিকল্পিত এই মেট্রোরেল প্রকল্পের বাস্তব রূপায়ণ শুরু হবে বর্তমান সরকারের সময়েই।

