বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি পোশাক শিল্প এখন বড় ধরনের চাপের মুখে পড়েছে। দীর্ঘদিনের জ্বালানি সংকট, বিদ্যুৎ ঘাটতি ও গ্যাস সরবরাহের অনিশ্চয়তায় দেশের নিট পোশাক কারখানাগুলোতে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে বিদেশি ক্রেতাদের অর্ডারে।
বাংলাদেশ নিট পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিকেএমইএ) এক জরিপে দেখা গেছে, চলমান জ্বালানি সংকটের কারণে প্রায় ৫৫ শতাংশ নিট পোশাক কারখানা বিদেশি ক্রেতাদের কাছ থেকে পাওয়া কাজের পরিমাণ কমতে দেখেছে। অনেক ক্ষেত্রে ক্রেতারা অর্ডার কমিয়ে দিয়েছে, আবার কিছু ক্ষেত্রে অর্ডার বাতিলও করেছে।
জরিপের তথ্য অনুযায়ী, জ্বালানি সংকট শুধু উৎপাদন কমায়নি, একই সঙ্গে তৈরি করেছে পণ্য সরবরাহে বিলম্ব, বাড়িয়েছে উৎপাদন ব্যয় এবং তৈরি করেছে আর্থিক চাপ। জরিপে অংশ নেওয়া প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ কারখানা ব্যাংক ঋণ পরিশোধ নিয়ে ঝুঁকির মুখে পড়েছে বলে জানিয়েছে।
বিকেএমইএ আগস্ট মাসের ২১ তারিখ থেকে ১৪ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর, চট্টগ্রাম, ঢাকা ও অন্যান্য এলাকার তাদের সদস্য কারখানার ২০ শতাংশের ওপর এই জরিপ পরিচালনা করে। সংগঠনটির নির্বাহী সভাপতি ফজলে শামীম এহসান জরিপের তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
জরিপে উঠে এসেছে, প্রায় ৭৮ শতাংশ কারখানা আংশিকভাবে উৎপাদন বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছে। ৮৭ শতাংশ কারখানা পণ্য সরবরাহে বিলম্বের সমস্যায় পড়েছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে প্রায় ৬০ শতাংশ কারখানাকে বিদেশি ক্রেতাদের মূল্য ছাড় দিতে হয়েছে।
বর্তমান সংকটের সবচেয়ে বড় কারণ হিসেবে উঠে এসেছে বিদ্যুৎ সরবরাহের দুর্বলতা। জরিপে অংশ নেওয়া প্রায় ৯০ শতাংশ কারখানা জানিয়েছে, বিদ্যুতের ঘাটতি তাদের উৎপাদন কার্যক্রমে সবচেয়ে বড় বাধা তৈরি করেছে। পাশাপাশি প্রায় ৭৫ শতাংশ কারখানা গ্যাস সংকটের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
গ্যাস সরবরাহের পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক বলে জানিয়েছে কারখানাগুলো। যেসব প্রতিষ্ঠান গ্যাসের চাপ ও সরবরাহের তথ্য দিয়েছে, তাদের হিসাবে স্বাভাবিক প্রয়োজনের তুলনায় গ্যাস সরবরাহ গড়ে প্রায় ৭৮ শতাংশ কমে গেছে।
বিদ্যুৎ পরিস্থিতির অবনতিও উৎপাদন ব্যবস্থাকে বড় ধরনের ধাক্কা দিয়েছে। যেসব কারখানা বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন থাকার সময়ের তথ্য দিয়েছে, তাদের হিসাবে আগের সময়ের তুলনায় দৈনিক বিদ্যুৎ না থাকার সময় প্রায় ২০০ শতাংশ বেড়েছে।
জ্বালানি সংকটের প্রভাব সবচেয়ে বেশি দেখা যাচ্ছে উৎপাদনের বিভিন্ন ধাপে। জরিপ অনুযায়ী, নিটিং বা কাপড় তৈরির উৎপাদন গড়ে ৩৭ থেকে ৩৮ শতাংশ কমেছে। কাপড় রং করার উৎপাদন কমেছে প্রায় ৫১ শতাংশ এবং পোশাক সেলাইয়ের উৎপাদন কমেছে প্রায় ৪০ শতাংশ।
শুধু উৎপাদন কমাই নয়, সংকটের কারণে কারখানাগুলোর ব্যয়ও বেড়েছে। প্রায় ৯২ শতাংশ কারখানা বিকল্প জ্বালানি ব্যবহারের কারণে অতিরিক্ত খরচের মুখে পড়েছে। একই ধরনের সংখ্যক কারখানা জানিয়েছে, শ্রমিকদের কাজের সময় নষ্ট হওয়ায় উৎপাদনশীলতাও কমেছে।
বিদেশি বাজারে বাংলাদেশের পোশাক শিল্প দীর্ঘদিন ধরে নির্ভরযোগ্য সরবরাহকারী হিসেবে পরিচিত। কিন্তু উৎপাদন ব্যাহত হলে সময়মতো পণ্য সরবরাহ করা কঠিন হয়ে পড়ে। এ কারণে প্রায় ৮৯ শতাংশ কারখানা ক্রেতাদের আস্থা হারানোর ঝুঁকির কথা জানিয়েছে।
আর্থিক চাপও ক্রমেই বাড়ছে। জরিপে প্রায় ৫৯ শতাংশ কারখানা জানিয়েছে, তারা ব্যাংক ঋণ খেলাপির ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। এছাড়া প্রায় ৭ শতাংশ কারখানা সম্পূর্ণভাবে উৎপাদন বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছে।
ফজলে শামীম এহসান বলেন, পোশাক শিল্প বর্তমানে কঠিন সময় পার করছে। অনেক প্রতিষ্ঠান ভালো অবস্থানে থাকলেও কিছু কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। তবে সরকার প্রয়োজনীয় নীতিগত সহায়তা দিলে এই সংকট কাটিয়ে ওঠা সম্ভব বলে তিনি মন্তব্য করেন।
জরিপে অংশ নেওয়া কারখানাগুলোর মধ্যে প্রায় ৪৫ থেকে ৪৬ শতাংশ ছিল নারায়ণগঞ্জের, ২০ শতাংশ গাজীপুরের, ১৮ শতাংশ চট্টগ্রামের, ১৩ শতাংশ ঢাকার এবং প্রায় ৩ শতাংশ অন্যান্য এলাকার।
বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের বড় অংশ আসে পোশাক খাত থেকে। এই খাতে উৎপাদন ব্যাহত হলে শুধু কারখানা মালিক নয়, শ্রমিক, সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান এবং দেশের সামগ্রিক রপ্তানি আয়ও চাপের মুখে পড়ে। দীর্ঘমেয়াদে এই ধরনের জ্বালানি সংকট বিদেশি ক্রেতাদের আস্থা ও বাংলাদেশের প্রতিযোগিতামূলক অবস্থানকে প্রভাবিত করতে পারে।
তাই শিল্প খাতের জন্য নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করা এখন শুধু উৎপাদনের বিষয় নয়, বরং দেশের রপ্তানি সক্ষমতা ধরে রাখার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হয়ে দাঁড়িয়েছে। জ্বালানি ব্যবস্থাপনায় স্থায়ী সমাধান না হলে পোশাক শিল্পের ওপর চাপ আরও বাড়তে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

