সরকারি চাকরিজীবীদের এক দশকের বেশি সময়ের প্রতীক্ষার অবসান হতে চলেছে। নবম জাতীয় পে স্কেলের গেজেট জারির প্রক্রিয়া এখন শেষ পর্যায়ে। আইন মন্ত্রণালয়ের ভেটিং বা আইনি যাচাইয়ের কাজ প্রায় সম্পন্ন, আর বৃহস্পতিবার (১৭ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যার মধ্যে গেজেট জারি হতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানাচ্ছে। গত ৩১ আগস্ট মন্ত্রিসভায় জাতীয় বেতন স্কেল-২০২৬ অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল, যা ১ জুলাই ২০২৬ থেকে কার্যকর ধরা হয়েছে। তবে মন্ত্রিসভার অনুমোদনের পরপরই গেজেট প্রকাশের কথা বলা হলেও প্রায় দুই সপ্তাহ পেরিয়ে গেছে; আর সেই অপেক্ষা শেষ হতে চলেছে বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
মন্ত্রিসভায় অনুমোদনের পর প্রজ্ঞাপনের খসড়াটি প্রথমে বাংলাদেশ সরকারি মুদ্রণালয়ে পাঠানো হয়েছিল। সেখান থেকে প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া শেষে তা ফিরে আসে অর্থ মন্ত্রণালয়ে। এরপর খসড়াটি যাচাইয়ের জন্য পাঠানো হয় আইন মন্ত্রণালয়ে। আইন মন্ত্রণালয়ের ভেটিং শেষ হলেই এসআরও নম্বর দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি হবে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, ভেটিংয়ের প্রায় সব কাজ শেষ হয়েছে এবং অল্প কিছু কার্যক্রম বৃহস্পতিবার বিকেলের মধ্যেই সম্পন্ন করার চেষ্টা চলছে। প্রশাসনিক ও আইনি আনুষ্ঠানিকতা শেষে খুব দ্রুতই আদেশ জারি করা হতে পারে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
নতুন বেতন কাঠামোয় আগের মতোই ২০টি গ্রেড বহাল রাখা হয়েছে। গ্রেডভেদে মূল বেতন বাড়ছে ১০০ থেকে সর্বোচ্চ ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত। সবচেয়ে বেশি সুবিধা পাচ্ছেন নিম্ন ও মধ্যম গ্রেডের কর্মচারীরা। সর্বনিম্ন ২০তম গ্রেডের প্রারম্ভিক মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা করা হয়েছে, যা প্রায় ১৪২ শতাংশ বৃদ্ধি। অন্যদিকে প্রথম গ্রেডের নির্ধারিত বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা করা হয়েছে। পাশাপাশি নবম গ্রেডের মূল বেতন ২২ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ৪৪ হাজার টাকা, দশম গ্রেডে ১৬ হাজার টাকা থেকে ৩২ হাজার টাকা এবং দ্বাদশ গ্রেডে ১১ হাজার টাকা থেকে ২২ হাজার টাকা করা হয়েছে। তবে বর্ধিত বেতন একবারে পাওয়া যাবে না, মূল বেতন ও নিট পেনশন ২০২৬ সালের ১ জুলাই থেকে ২০২৭ সালের ১ জুলাইয়ের মধ্যে তিন ধাপে বাস্তবায়ন করা হবে।
শুধু মূল বেতন নয়, বিভিন্ন ভাতার ক্ষেত্রেও বড় ধরনের পরিবর্তন আসছে। নতুন কাঠামোয় প্রথমবারের মতো সব গ্রেডের সরকারি চাকরিজীবীরা মোবাইল ভাতা পাবেন। গ্রেড-৫ ও তার ঊর্ধ্বে মাসে ৫০০ টাকা এবং গ্রেড-৬ ও নিচের গ্রেডে ১৫০ টাকা মোবাইল ভাতা নির্ধারণ করা হয়েছে। যাতায়াত ভাতা ৩০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৬০০ টাকা এবং টিফিন ভাতা ২০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৫০০ টাকা করার প্রস্তাব রয়েছে। ধোলাই ভাতা ১০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৩০০ টাকা করা হচ্ছে। এছাড়া বয়সভেদে চিকিৎসা ভাতাও বাড়ানো হচ্ছে, ৫০ বছর পর্যন্ত ৩ হাজার টাকা, ৫০ থেকে ৬০ বছর পর্যন্ত ৪ হাজার টাকা, ৬০ থেকে ৭০ বছর পর্যন্ত ৫ হাজার টাকা এবং ৭০ বছরের বেশি বয়সে ৬ হাজার টাকা। বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন বা প্রতিবন্ধী সন্তানের জন্য মাসে ৩ হাজার টাকা করে ভাতা চালু হচ্ছে, যার সুবিধা পাবে সর্বোচ্চ দুই সন্তান। তবে বাড়িভাড়া ভাতার হার শতাংশের হিসাবে কমছে। বর্তমানে ঢাকা সিটি করপোরেশন এলাকায় গ্রেডভেদে মূল বেতনের ৫০ থেকে ৬৫ শতাংশ বাড়িভাড়া দেওয়া হয়, নতুন কাঠামোয় তা ৪০ থেকে ৬০ শতাংশে নামছে। তবে মূল বেতন উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ায় শতাংশ কমলেও বাড়িভাড়ার প্রকৃত টাকার অঙ্ক গ্রেডভেদে বাড়তে পারে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
সরকারের আর্থিক সক্ষমতা ও মূল্যস্ফীতির সম্ভাব্য চাপ বিবেচনায় মূল বেতন তিন ধাপে বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। প্রথম ধাপে চলতি বছরের ১ জুলাই থেকে মূল বেতনের ৩০ শতাংশ কার্যকর হবে, দ্বিতীয় ধাপে আগামী বছরের জানুয়ারি থেকে আরও ৩৫ শতাংশ এবং তৃতীয় ধাপে ২০২৭ সালের ১ জুলাই থেকে বাকি ৩৫ শতাংশ কার্যকর হবে। তবে সব ধরনের ভাতা একযোগে কার্যকর হবে ২০২৮ সালের ১ জানুয়ারি থেকে। এছাড়া গ্রেড-৬ ও তার নিচে বার্ষিক বেতন বৃদ্ধির হার ৫ শতাংশ, গ্রেড-৩ ও ৪-এ ৩ দশমিক ৫ শতাংশ এবং গ্রেড-২-এ ২ দশমিক ৭৫ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে।
নতুন পে স্কেল বাস্তবায়নে সরকারের বড় অঙ্কের বাড়তি অর্থের প্রয়োজন হবে। অর্থনীতিবিদদের মতে, এই বাড়তি ব্যয় মেটাতে সরকারকে ব্যাংক থেকে আরও বেশি ঋণ নিতে হতে পারে এবং বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে কাটছাঁটের প্রয়োজন হতে পারে। জ্বালানি সংকটে উৎপাদন খাত এমনিতেই চাপে রয়েছে; এর মধ্যে সরকারের রাজস্ব আয়ও দুর্বল। এই পরিস্থিতিতে সরকারি বেতন বাড়ানোর ফলে মূল্যস্ফীতির ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। তবে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান বলেছেন, নতুন পে স্কেলে বৈষম্য কমানোর চেষ্টা করা হয়েছে এবং কিছুটা মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি থাকলেও দীর্ঘমেয়াদে সরকারি কর্মচারীদের ক্রয়ক্ষমতা রক্ষা হবে।
২০২৫ সালে সাবেক অর্থসচিব জাকির আহমেদ খানের নেতৃত্বে ‘জাতীয় বেতন কমিশন, ২০২৫’ গঠন করেছিল অন্তর্বর্তী সরকার। ওই কমিশন গত ২২ জানুয়ারি সরকারের কাছে প্রতিবেদন জমা দেয়, যেখানে বেতন-ভাতা ১০০ থেকে ১৪০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়। পরবর্তীতে মন্ত্রিসভায় নতুন বেতন কাঠামোর প্রস্তাব উপস্থাপন করা হয় এবং ৩১ আগস্ট অনুমোদন দেওয়া হয়। সব মিলিয়ে, প্রায় এক যুগ পর সরকারি চাকরিজীবীরা নতুন বেতন কাঠামোর সুবিধা পেতে যাচ্ছেন। এখন দেখার বিষয়, গেজেট প্রকাশের পর বাস্তবায়ন কতটা মসৃণ হয় এবং অর্থনীতিতে এর প্রভাব কেমন পড়ে।

