বাংলাদেশের চা শিল্পে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। সীমান্ত দিয়ে অবৈধভাবে আসা চা এবং নির্ধারিত নিলাম ব্যবস্থার বাইরে বিক্রি হওয়া চায়ের কারণে বৈধ ব্যবসায়ীরা কঠিন প্রতিযোগিতার মুখে পড়েছেন বলে জানিয়েছেন শিল্প সংশ্লিষ্টরা।
দেশের চা শিল্পের উন্নয়ন ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে গঠিত পরামর্শক কমিটির প্রথম বৈঠকে এই বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে উঠে আসে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত বৈঠকে চা ব্যবসায়ী ও শিল্প প্রতিনিধিরা জানান, চোরাই পথে আসা চা কম দামে বাজারে বিক্রি হওয়ায় নিয়ম মেনে ব্যবসা করা প্রতিষ্ঠানগুলো ক্ষতির মুখে পড়ছে।
শিল্প সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে নিলামের মাধ্যমে বিক্রি হওয়া প্রতি কেজি চায়ের দাম প্রায় ২৯০ থেকে ৩০০ টাকা। অন্যদিকে চোরাই পথে আসা চা বাজারে বিক্রি হচ্ছে প্রায় ২০০ থেকে ২২০ টাকায়। দামের এই বড় পার্থক্যের কারণে বৈধ ব্যবসায়ীরা ক্রেতা ধরে রাখতে সমস্যায় পড়ছেন।
বৈধ ব্যবসায়ীরা নিয়ম অনুযায়ী কর, ভ্যাট, পরিবহন খরচ এবং অন্যান্য ব্যয় বহন করেন। অন্যদিকে অবৈধ পথে আসা চা এসব খরচ ছাড়াই বাজারে প্রবেশ করায় তারা দামের ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতা করতে পারছেন না। এর ফলে একদিকে যেমন ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন, অন্যদিকে সরকারও হারাচ্ছে সম্ভাব্য রাজস্ব।
চা শিল্পের প্রতিনিধিরা মনে করছেন, এই সমস্যা সমাধানে সীমান্ত এলাকায় নজরদারি বাড়ানোর পাশাপাশি দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারেও কঠোর তদারকি প্রয়োজন। বিশেষ করে নিলাম ব্যবস্থার বাইরে চা বিক্রির প্রবণতা বন্ধ করা জরুরি বলে তারা মত দিয়েছেন।
একই সঙ্গে চা ব্যবসার ওপর আরোপিত মূল্য সংযোজন কর এবং অগ্রিম আয়কর ব্যবস্থাকে আরও বাস্তবসম্মত করার প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছে। তাদের মতে, কর কাঠামো সহজ ও কার্যকর হলে বৈধ ব্যবসায়ীরা আরও শক্ত অবস্থানে থাকতে পারবেন।
বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির। তিনি বলেন, দেশের চা শিল্পের অর্থনৈতিক সক্ষমতা ফিরিয়ে আনতে সরকার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করবে।
তিনি জানান, চা বাগানগুলোকে শুধু সরকারি সহায়তা, ঋণ বা প্রণোদনার ওপর নির্ভর করে টিকে থাকা সম্ভব নয়। বাগানগুলোর নিজস্ব আর্থিক সক্ষমতা বাড়াতে হবে এবং নিয়মিতভাবে কর, ভ্যাট ও অন্যান্য রাজস্বের মাধ্যমে দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখতে হবে।
বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, দেশের চা বাগানের সঙ্গে বিপুলসংখ্যক শ্রমিক ও তাদের পরিবার জড়িত। কোনো চা বাগান বন্ধ হয়ে গেলে বা আর্থিক সংকটে পড়লে এর প্রভাব শুধু শ্রমিকদের ওপর নয়, পুরো স্থানীয় অর্থনীতির ওপর পড়ে।
তার মতে, চা শিল্পকে লাভজনক ও টেকসই করা হলে শ্রমিকদের জীবিকা সুরক্ষিত হবে, পরিবেশের ভারসাম্য বজায় থাকবে এবং দেশের অর্থনৈতিক স্বার্থও রক্ষা হবে।
একসময় বাংলাদেশ চা রপ্তানিকারক দেশ হিসেবে পরিচিত ছিল। কিন্তু উৎপাদন ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়লে ভবিষ্যতে আবারও আমদানির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ার ঝুঁকি রয়েছে বলে সতর্ক করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
চা শিল্পের সমস্যাগুলো সমাধান করতে সরকার, ব্যবসায়ী, উৎপাদক এবং অন্যান্য অংশীজনকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে বলে জানিয়েছেন বাণিজ্যমন্ত্রী।
বৈঠকে চা বাগান থেকে অতিরিক্ত আয় তৈরির বিভিন্ন উপায় নিয়েও আলোচনা হয়েছে। চা বাগানের অব্যবহৃত ও পতিত জমিতে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প স্থাপনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
অংশগ্রহণকারীরা মনে করেন, সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের মাধ্যমে চা বাগানগুলো অতিরিক্ত আয় করতে পারে। পাশাপাশি কৃষি কার্যক্রম, বিকল্প বনায়ন এবং বিভিন্ন সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমেও আয় বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে।
চা বাগানে উৎপাদিত অতিরিক্ত বিদ্যুৎ নেট মিটারিং ব্যবস্থার মাধ্যমে বিক্রি করার বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। তবে এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নের জন্য ভূমি মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট অন্যান্য কর্তৃপক্ষের অনুমোদন প্রয়োজন হবে।
শিল্প সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, শুধু সরকারি সহায়তা, ঘূর্ণায়মান তহবিল বা ব্যাংক ঋণের ওপর নির্ভর করে চা শিল্পকে দীর্ঘমেয়াদে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব নয়। বাগানগুলোর ব্যবস্থাপনা দক্ষতা বাড়ানো, উৎপাদন পদ্ধতি আধুনিক করা এবং নিজেদের আর্থিক ভিত্তি শক্তিশালী করা প্রয়োজন।
বাংলাদেশের চা শিল্প শুধু একটি অর্থনৈতিক খাত নয়, এটি লাখো মানুষের জীবিকার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। তাই চোরাই বাণিজ্য বন্ধ করা, বৈধ ব্যবসার পরিবেশ তৈরি করা এবং নতুন আয়ের সুযোগ সৃষ্টি করা এখন এই খাতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সরকার ও শিল্প সংশ্লিষ্টরা কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারলে দেশের চা শিল্প আবারও শক্তিশালী অবস্থানে ফিরতে পারে এবং আন্তর্জাতিক বাজারেও নিজেদের অবস্থান আরও উন্নত করতে পারে।

