মধ্যরাতে হঠাৎ করে জ্বালানি তেলের দাম লিটারে ২০ টাকা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি। সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) সকালে গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে সংগঠনের মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী এই দাবি জানান। বিবৃতিতে বলা হয়, বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম এখন নিম্নমুখী। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধি, জ্বালানি সংকটে বিভিন্ন কলকারখানা বন্ধের কারণে বেকারত্ব বৃদ্ধির মধ্য দিয়ে দেশে চরম অস্থিরতা বিরাজ করছে। এমন সময়ে নতুন সরকার সংকট মোকাবিলায় দেশের মানুষের পাশে দাঁড়ানোর পরিবর্তে দায়িত্ব গ্রহণের সাত মাসের মাথায় দুই দফা জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি করেছে। এই ‘গণবিরোধী’ সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসে জ্বালানি তেলের বর্ধিত দাম প্রত্যাহার করে আগের দাম বহাল রাখার দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি।
রোববার (২০ সেপ্টেম্বর) রাতে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ জ্বালানি তেলের নতুন দাম নির্ধারণ করে প্রজ্ঞাপন জারি করে। নতুন দর অনুযায়ী প্রতি লিটার ডিজেল ১১৫ টাকা থেকে বেড়ে ১৩৫ টাকা, কেরোসিন ১৩৫ টাকা থেকে ১৫৫ টাকা, অকটেন ১৪৫ টাকা থেকে ১৬৫ টাকা এবং পেট্রোল ১৪০ টাকা থেকে ১৬০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। নতুন দাম সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) থেকে কার্যকর হয়। প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের কারণে মার্চ থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম ও ফ্রেইট চার্জ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম দ্বিগুণের বেশি বাড়লেও জনস্বার্থে দেশে তা পুরোপুরি সমন্বয় করা হয়নি। এতে মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের প্রায় ২২ হাজার ৮৭৫ কোটি ৬৬ লাখ টাকা লোকসান হয়েছে। লিটারপ্রতি ২০ টাকা দাম বাড়ালে বছরে বিপিসির লোকসান প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা কমানো সম্ভব হবে বলে প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সংগঠনের মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, ‘সরকার জনস্বার্থে কোথাও ব্যবসা করবে, কোথাও ভর্তুকি দেবে এটাই বাস্তবতা। দেশের চরম আর্থিক সংকটের মুহূর্তে জ্বালানি খাতে ভর্তুকি দিয়ে দেশের অর্থনীতি সচল রাখা, মূল্যস্ফীতি কমানোর মধ্য দিয়ে দেশের সংকটাপন্ন জনগণের পাশে থাকা সরকারের দায়িত্ব।’ তিনি আরও বলেন, এই সিদ্ধান্তের ফলে যাতায়াত, যোগাযোগ, পণ্য ও যাত্রী পরিবহনসহ শিল্প উৎপাদনে ভাড়া ও মূল্য উস্কে দেওয়া হয়েছে। সংগঠনটি জরুরি ভিত্তিতে জ্বালানি তেলের বর্ধিত মূল্য প্রত্যাহার করে পূর্বের মূল্য বহাল রাখার দাবি জানিয়েছে।
যাত্রী কল্যাণ সমিতির বিবৃতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তুলে ধরা হয়েছে, বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম এখন নিম্নমুখী। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমার সময়েও বাংলাদেশে দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্তকে ‘গণবিরোধী’ আখ্যা দিয়েছে সংগঠনটি। অন্যদিকে সরকারের যুক্তি হলো, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম ও শিপিং চার্জ বেড়েছে। অর্থনীতি বিশেষজ্ঞদের একটি অংশ মনে করছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে দাম ওঠানামা করলেও দেশীয় বাজারে দাম সমন্বয়ের ক্ষেত্রে আরও সময় নেওয়া উচিত ছিল। কারণ জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি সরাসরি পরিবহন খরচ, খাদ্যপণ্যের দাম এবং শিল্প উৎপাদন খরচে প্রভাব ফেলে। এতে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়ে এবং মূল্যস্ফীতি আরও চাপে পড়ে।
জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির প্রভাব ইতিমধ্যেই পরিবহন খাতে পড়তে শুরু করেছে। ঢাকা থেকে খুলনাসহ দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন রুটে বাসের ভাড়া যাত্রীপ্রতি ৫০ টাকা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বাস মালিকরা। বিআরটিএ নতুন ভাড়া নির্ধারণ না করা পর্যন্ত এই সিদ্ধান্ত কার্যকর করা নিয়ে যাত্রীদের সঙ্গে বাস কন্ডাক্টরদের বিভিন্ন স্থানে বিরোধের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এছাড়া কৃষি, মৎস্য, নির্মাণ ও পরিবহন খাতে জ্বালানির দাম বৃদ্ধির প্রভাব পড়বে। কৃষকদের সেচ খরচ বাড়বে, মাছ ধরার ট্রলার পরিচালনার খরচ বাড়বে এবং নির্মাণ সামগ্রীর পরিবহন খরচ বাড়বে। সব মিলিয়ে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি একটি শৃঙ্খল প্রভাব তৈরি করবে, যা শেষ পর্যন্ত সাধারণ ভোক্তার ওপর বর্তাবে।
সরকারের সামনে এখন বড় চ্যালেঞ্জ হলো, একদিকে বিপিসির লোকসান কমানো, অন্যদিকে সাধারণ মানুষের ওপর বাড়তি চাপ না ফেলা। ভর্তুকি দিলে সরকারের রাজস্ব ঘাটতি বাড়ে এবং ব্যাংক থেকে ঋণ নিতে হয়। অন্যদিকে দাম না বাড়ালে বিপিসির লোকসান বাড়ে এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে চাপ পড়ে। এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করাই এখন সবচেয়ে বড় কাজ। যাত্রী কল্যাণ সমিতির দাবি প্রত্যাহার করা হলে বিপিসির লোকসান বাড়বে, আবার দাম বাড়িয়ে রাখলে সাধারণ মানুষের ভোগে চাপ পড়বে। এই পরিস্থিতিতে সরকার কী সিদ্ধান্ত নেয়, সেটাই এখন দেখার বিষয়।

