চলতি অর্থবছরে রাজস্ব আদায়ে ৪৫ শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ঠিক করেছে সরকার। এই লক্ষ্য পূরণে আদালতে আটকে থাকা বিপুল অঙ্কের বকেয়া রাজস্ব দ্রুত আদায়ের চেষ্টা চলছে। এ জন্য বড় বেসরকারি কোম্পানি ও রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি (এডিআর) ব্যবস্থার ওপর বিশেষ জোর দিচ্ছে সরকার।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, গত দুই মাসে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী একাধিক প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে ধারাবাহিক বৈঠক করেছেন। এর মধ্যে আছে গ্রামীণফোন, বাংলালিংক, সোনালী ব্যাংক, জনতা ব্যাংক ও বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)। দীর্ঘদিন ঝুলে থাকা বিরোধ মেটানোর পথ খোঁজাই ছিল বৈঠকের উদ্দেশ্য।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা টিবিএসকে জানান, আদালতে বিচারাধীন রাজস্ব মামলা এডিআরের মাধ্যমে নিষ্পত্তির সম্ভাবনা যাচাই করতে অর্থমন্ত্রী খুব শিগগির আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বসবেন। ওই কর্মকর্তার ভাষ্য, চলতি অর্থবছরে প্রায় ৪৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধির বড় লক্ষ্য রয়েছে। তা অর্জনে আইনি জটিলতায় আটকে থাকা রাজস্ব উদ্ধারসহ নানা পথ খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রীর অর্থনীতি ও পরিকল্পনা বিষয়ক উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, সরকার মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তি করতে চায়। এডিআরের মাধ্যমে সমাধানে আগ্রহী যেকোনো পক্ষকে সরকার স্বাগত জানাবে। তাঁর মতে, দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য সম্ভাব্য সব পথ খুঁজে দেখাই সরকারের অবস্থান।
এনবিআরের কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, বিভিন্ন আপিল ট্রাইব্যুনাল ও আদালতে ৩০ হাজারের বেশি মামলায় প্রায় ৯০ হাজার ৮০০ কোটি টাকার রাজস্ব আটকে আছে। এর মধ্যে আয়করের ২৫ হাজার কোটি, শুল্কের ২২ হাজার কোটি এবং ভ্যাটের ৪৩ হাজার ৮০০ কোটি টাকা। কিছু বিরোধ এক দশকের বেশি সময় ধরে, কোনো কোনোটি দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে অমীমাংসিত।
গত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সরকার ৪ দশমিক ১৫ লাখ কোটি টাকার রাজস্ব সংগ্রহ করেছিল। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৬ দশমিক ০৪ লাখ কোটি টাকা। এর মধ্যে ১ জুলাই থেকে সরকারি কর্মচারীদের নতুন বেতন কাঠামো কার্যকর হয়েছে, যার জন্য বাড়তি ১ দশমিক ০৬ লাখ কোটি টাকা লাগবে। ফলে রাজস্ব বাড়ানোর চাপ আরও বেড়েছে। তবে চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে আদায়ে তেমন গতি দেখা যায়নি।
এনবিআর কর্মকর্তাদের হিসাবে, সোনালী ব্যাংকের প্রায় ৭ হাজার কোটি টাকার আয়কর-সংক্রান্ত বিরোধ এক দশকের বেশি সময় ধরে অমীমাংসিত। বিপিসির প্রায় ৭ হাজার কোটি, জনতা ব্যাংকের ২ হাজার ৫০০ কোটি এবং রবি আজিয়াটার ভ্যাট-সংক্রান্ত প্রায় ১ হাজার কোটি টাকার বিরোধ আদালতে আটকে আছে।
রবি আজিয়াটার চিফ কর্পোরেট অ্যান্ড রেগুলেটরি অফিসার শাহেদ আলম বলেন, এ বিষয়ে অর্থমন্ত্রী বা এনবিআরের সঙ্গে কোম্পানির এখনো বৈঠক হয়নি। তবে এমন একটি বৈঠকের পরিকল্পনার কথা তাঁরা শুনেছেন। তিনি উদ্যোগটিকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, তাঁরাও মামলাগুলোর দ্রুত নিষ্পত্তি চান এবং মধ্যস্থতার মাধ্যমে সমাধানের অনুরোধ আগেই এনবিআরকে করেছেন। কোম্পানির আরেক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানান, এনবিআর রবির কাছে প্রায় ১ হাজার কোটি টাকা দাবি করছে, যার বেশির ভাগই ভ্যাট-সংক্রান্ত।
বাংলালিংকের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা নিশ্চিত করেছেন, কোম্পানির প্রতিনিধি দল ব্যবসা ও বিনিয়োগ-সংক্রান্ত অন্যান্য বিষয়ের সঙ্গে এই জটিলতা নিয়েও অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা করেছে। তাঁর ভাষ্য, অর্থমন্ত্রী বিষয়গুলো সমাধানে অত্যন্ত ইতিবাচক ছিলেন।
গ্রামীণফোন জানিয়েছে, তাদের রাজস্ব-বিরোধ এখন আদালতে বিচারাধীন। তবে দ্রুত, স্বচ্ছ ও আইনগতভাবে গ্রহণযোগ্য সমাধানের পথ হিসেবে সংবিধিবদ্ধ এডিআর প্রক্রিয়ায় নিষ্পত্তির সম্ভাবনা খতিয়ে দেখা যেতে পারে। বিরোধের অঙ্ক তারা প্রকাশ করেনি। এনবিআরের কর্মকর্তারা বলছেন, অঙ্কটি প্রায় ১ হাজার কোটি টাকা।
রাজস্ব-বিরোধের সূত্রপাত সাধারণত আমদানি-রপ্তানি, স্থানীয় বিক্রি বা রিটার্ন পরীক্ষার সময় কোনো অসঙ্গতি ধরা পড়লে। কর্তৃপক্ষ নির্দিষ্ট অঙ্কের কর দাবি করে। করদাতা তা না মানলে আপিল করতে পারেন। যেমন, আমদানিকারক এক এইচএস কোডে পণ্য ঘোষণা করলেন, কিন্তু কাস্টমস মনে করল পণ্যটি বেশি শুল্কের অন্য কোডে পড়ে। তখন অতিরিক্ত শুল্ক ও জরিমানা দাবি করা হতে পারে। সংক্ষুব্ধ পক্ষ প্রথমে এনবিআরের আপিল ট্রাইব্যুনালে যায়, পরে উচ্চ আদালতেও যেতে পারে। অভিযোগ আছে, কিছু প্রতিষ্ঠান রাজস্ব দিতে অযথা দেরি করতে মামলা করে। আবার এনবিআর কর্মকর্তাদের অবাস্তব বা প্রশ্নবিদ্ধ দাবিতেও বিরোধ তৈরি হয়।
রাজস্ব-বিরোধ নিষ্পত্তিতে গতি আনতে ২০১১-১২ অর্থবছরে এডিআর ব্যবস্থা চালু করে এনবিআর। কিন্তু চালুর পর থেকে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মামলা নিষ্পত্তি করতে পারেনি এই ব্যবস্থা। এনবিআরের বাইরের বিশেষজ্ঞদের একটি প্যানেল মধ্যস্থতা করে। তবে সমঝোতার জন্য এনবিআর ও করদাতা, দুই পক্ষেরই সম্মতি লাগে। আইনি প্রশ্ন জড়িত থাকলে এডিআরের পরিধিও সীমিত। যেমন, আমদানি পণ্যের সঠিক এইচএস কোড কী হবে, সেই বিরোধ সাধারণত এডিআরে মেটে না। এটি মূলত তথ্যগত বিরোধের জন্য উপযোগী, যেমন প্রদেয় রাজস্বের অঙ্ক কত হবে।
এনবিআরের ভ্যাট উইংয়ের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, এডিআরে খুব কম ভ্যাট মামলার সমাধান হয়েছে। ব্যর্থতার কারণ চিহ্নিত করে আইনি সংস্কার না করলে ব্যবস্থাটি কার্যকর করা কঠিন হবে।
এনবিআরের সাবেক সদস্য ও এডিআরের সাবেক মধ্যস্থতাকারী সৈয়দ মো. আমিনুল করিম বলেন, ব্যর্থতার সবচেয়ে বড় কারণ কর্তৃপক্ষের অঙ্গীকারের অভাব। তাঁর ভাষ্য, এডিআর সেশনে রাজস্ব বোর্ডের প্রতিনিধিরা ছাড় দিতে অনিচ্ছুক ছিলেন। যে কর্মকর্তা মূল কর দাবি তুলেছিলেন, তাঁকেই আবার মধ্যস্থতায় পাঠানো হতো। ফলে শুরুতে যিনি ১০ টাকা দাবি করেছেন, তিনি হঠাৎ ৫ টাকায় রাজি হবেন না, এটাই স্বাভাবিক। তাই এনবিআরের আলাদা ও স্বতন্ত্র এডিআর প্যানেল থাকা উচিত ছিল বলে মনে করেন তিনি।
আমিনুল করিম আরও বলেন, ভবিষ্যতে আইনি জটিলতা বা সরকারি নজরদারির ভয়ে কর্মকর্তারা রাজস্ব মওকুফের ঝুঁকি নিতে চান না। তাঁর দেওয়া উদাহরণ অনুযায়ী, এক কর্মকর্তা মওকুফ অনুমোদনের পর দুদকের মামলায় পড়েন এবং তাঁর অবসরোত্তর সুবিধা স্থগিত হয়। এমন অভিজ্ঞতার পর কেউ ঝুঁকি নেবেন কি না, সে প্রশ্নও তোলেন তিনি। তাঁর মতে, এডিআর আইনে সংশোধনী আনতে এসব সমস্যার পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণ জরুরি।
কর্মকর্তাদের এই অতিরিক্ত সতর্কতার পেছনে ২০২৩ সালের একটি ঘটনার কথা বলা হচ্ছে। ওই বছর চারটি মোবাইল ফোন অপারেটর ও এনবিআরের বৃহৎ করদাতা ইউনিট-ভ্যাটের (এলটিইউ-ভ্যাট) বিরোধ এডিআরে নিষ্পত্তি হয়। এতে সরকার কোম্পানিগুলো থেকে প্রায় ১৯০ কোটি টাকার ভ্যাট আদায় করে। তবে সমঝোতার অংশ হিসেবে প্রায় ১৫২ কোটি টাকার সুদ মওকুফ করা হয়। পরে তৎকালীন বৃহৎ করদাতা ইউনিটের কমিশনার ওয়াহিদা রহমান চৌধুরীর বিরুদ্ধে সরকারের আর্থিক ক্ষতির অভিযোগে দুদক মামলা করে। অবসরোত্তর ছুটিতে যাওয়ার পর তাঁর অবসরকালীন ভাতাসহ নানা সুবিধাও আটকে দেওয়া হয়।
এনবিআর কর্মকর্তারা জানান, এরপর ওই কোম্পানিগুলোর আগে বন্ধ হওয়া ফাইলও নতুন করে খোলা বা তদন্ত করা হয়। সেই ঘটনার পর থেকে এনবিআরের কর্মকর্তারা এডিআরের মাধ্যমে রাজস্ব-বিরোধে সিদ্ধান্ত নিতে নিরুৎসাহিত হয়ে পড়েছেন। কোম্পানিগুলোও এই ব্যবস্থায় বিরোধ মেটানোর আগ্রহ হারিয়েছে।

