জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর পরও প্রতিবেশী ও আঞ্চলিক অনেক দেশের তুলনায় বাংলাদেশে ডিজেল, পেট্রল ও অকটেনের দাম এখনো কম রয়েছে। সরকারের দাবি, আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বৃদ্ধি, জ্বালানি খাতে লোকসান এবং সীমান্ত দিয়ে পাচারের ঝুঁকি বিবেচনা করেই নতুন করে মূল্য সমন্বয়ের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
গত রবিবার সরকার দেশের চার ধরনের প্রধান জ্বালানি তেলের দাম প্রতি লিটারে ২০ টাকা করে বাড়িয়েছে। নতুন দামে ডিজেলের দাম ১১৫ টাকা থেকে বেড়ে হয়েছে ১৩৫ টাকা, কেরোসিন ১৩৫ টাকা থেকে ১৫৫ টাকা, অকটেন ১৪৫ টাকা থেকে ১৬৫ টাকা এবং পেট্রল ১৪০ টাকা থেকে ১৬০ টাকা হয়েছে।
তবে এই মূল্য বৃদ্ধির পরও আঞ্চলিক বাজার বিবেচনায় বাংলাদেশের জ্বালানির দাম তুলনামূলকভাবে কম রয়েছে।
জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে মিয়ানমারে প্রতি লিটার ডিজেলের দাম ১৬৪ টাকা ৮৩ পয়সা, নেপালে ১৬১ টাকা ২৪ পয়সা, শ্রীলঙ্কায় ১৭৯ টাকা ৪২ পয়সা, থাইল্যান্ডে ১৫১ টাকা ২২ পয়সা, ভিয়েতনামে ১৩৭ টাকা, কলকাতায় ১৩৪ টাকা ৭৬ পয়সা, মালদ্বীপে ১৪০ টাকা ৭১ পয়সা, ফিলিপাইনে ১৬৮ টাকা ৫৩ পয়সা, পাকিস্তানে ১৮৫ টাকা ৪৮ পয়সা এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতে ১৪৪ টাকা ৭৯ পয়সা।
অর্থাৎ নতুন দামেও এসব দেশের বেশিরভাগের তুলনায় বাংলাদেশে ডিজেলের দাম কম রয়েছে।
সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, দীর্ঘদিন ধরে প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশের জ্বালানি তেলের দাম কম থাকায় সীমান্ত দিয়ে পাচারের ঝুঁকি তৈরি হয়েছিল।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেন, দেশের জ্বালানি তেলের দাম দীর্ঘদিন ধরে পার্শ্ববর্তী ও আঞ্চলিক দেশগুলোর তুলনায় সর্বনিম্ন পর্যায়ে ছিল।
তার মতে, দামের বড় পার্থক্যের কারণে দেশের বাজারে বিক্রি হওয়া জ্বালানি অন্য দেশে পাচারের আশঙ্কা তৈরি হয়।
তিনি বলেন, দায়িত্বশীল বিভিন্ন সূত্র থেকে সরকার এ ধরনের ঝুঁকির বিষয়ে তথ্য পেয়েছে। একই সঙ্গে সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়া এবং জ্বালানি খাতের চাপ সামলানোর বিষয়টিও বিবেচনায় নিয়ে দাম সমন্বয় করা হয়েছে।
তবে দেশে জ্বালানি তেল পাচারের নির্দিষ্ট কোনো পরিসংখ্যান বা তথ্য রয়েছে কি না জানতে চাইলে প্রতিমন্ত্রী বলেন, বিভিন্ন সূত্র থেকে ঝুঁকির বিষয়ে তথ্য পাওয়ার ভিত্তিতেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর আরেকটি বড় কারণ হিসেবে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) লোকসানের বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে।
বিপিসির চেয়ারম্যান ড. মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বৃদ্ধি এবং মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে জ্বালানি আমদানিতে ব্যয় বেড়েছে।
তিনি জানান, ডিজেলের ক্ষেত্রে প্রতি লিটারে বিপিসির গড় খরচ প্রায় ২০৫ টাকা হলেও এতদিন তা ১১৫ টাকা দরে বিক্রি করা হচ্ছিল। ফলে প্রতি লিটারে প্রায় ৯০ টাকা পর্যন্ত লোকসান হচ্ছিল।
দেশের মোট জ্বালানি তেলের ব্যবহারের প্রায় ৬৫ শতাংশই ডিজেল হওয়ায় এই খাতে লোকসানের চাপ সবচেয়ে বেশি।
বিপিসি চেয়ারম্যান বলেন, প্রতি লিটারে ২০ টাকা দাম বাড়ানোর ফলে সংস্থাটির লোকসানের একটি অংশ কমবে। তবে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম নিয়মিত পরিবর্তন হওয়ায় নির্দিষ্ট হিসাব করা কঠিন।
তিনি জানান, গত সাড়ে ছয় মাসে বিপিসির মাসিক গড় লোকসান প্রায় ৩ হাজার ৮০০ কোটি টাকা হয়েছে। অর্থাৎ প্রতিদিন গড়ে ১১০ কোটি টাকার বেশি লোকসান হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, বর্তমান পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে ডিসেম্বর পর্যন্ত বিপিসির লোকসান প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছাতে পারে। নতুন দাম সমন্বয়ের মাধ্যমে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহ সম্ভব হতে পারে। বাকি অর্থের ব্যবস্থা করতে সরকারের বিশেষ সহায়তা প্রয়োজন হতে পারে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ইজাজ হোসেন বলেন, দীর্ঘদিন ধরে প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশে জ্বালানি তেলের দাম কম ছিল।তার মতে, দুই দেশের দামের বড় পার্থক্য সীমান্ত এলাকায় পাচারের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। তাই জ্বালানি তেলের মূল্য নির্ধারণের ক্ষেত্রে শুধু আন্তর্জাতিক বাজার নয়, প্রতিবেশী দেশগুলোর বাজার পরিস্থিতিও বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন।
জ্বালানি তেলের পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি আমদানিতেও সরকারের ব্যয় বেড়েছে।
বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে এলএনজি খাতে বড় ধরনের ভর্তুকি দিতে হচ্ছে। একই সঙ্গে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি চালু রাখা এবং জ্বালানি খাতের আর্থিক চাপ মোকাবিলা করতে সরকারকে ব্যয় নিয়ন্ত্রণ ও মূল্য সমন্বয়ের পথে যেতে হচ্ছে।
সরকারের সর্বশেষ সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, গত রবিবার রাত থেকে নতুন জ্বালানি মূল্য কার্যকর হয়েছে।এর আগে সেপ্টেম্বর মাসে প্রতি লিটার ডিজেলের দাম ছিল ১১৫ টাকা, অকটেন ১৪৫ টাকা, পেট্রল ১৪০ টাকা এবং কেরোসিন ১৩৫ টাকা।
জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ে চাপ তৈরি করলেও সরকার বলছে, আন্তর্জাতিক বাজার পরিস্থিতি, বিপিসির আর্থিক চাপ এবং আঞ্চলিক বাজারের সঙ্গে ভারসাম্য রাখার প্রয়োজন থেকেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এখন বড় প্রশ্ন হলো, নতুন মূল্য কাঠামো জ্বালানি খাতের লোকসান কতটা কমাতে পারে এবং বাজারে এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব কী হয়।

