দেশের জ্বালানি ব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন আনার লক্ষ্য নিয়ে তৈরি করা হয়েছিল মহেশখালীর গভীর সমুদ্রভিত্তিক তেল পরিবহন প্রকল্প। পরিকল্পনা ছিল বড় জাহাজ থেকে সরাসরি পাইপলাইনের মাধ্যমে তেল সংরক্ষণাগারে পৌঁছে দেওয়া হবে, কমবে সময় ও খরচ। কিন্তু প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এই প্রকল্প এখনো নিয়মিত কার্যক্রমে যেতে পারেনি।
অপারেটর নিয়োগের দীর্ঘসূত্রতার কারণে কক্সবাজারের মহেশখালীতে নির্মিত ১১০ কিলোমিটার দীর্ঘ পাইপলাইন দুই বছরের বেশি সময় ধরে পড়ে আছে। ফলে যে প্রকল্প থেকে বছরে শত শত কোটি টাকা সাশ্রয়ের আশা করা হয়েছিল, সেটির পূর্ণ সুবিধা এখনো পাওয়া যাচ্ছে না।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) এই প্রকল্পের মোট ব্যয় দাঁড়িয়েছে ৮ হাজার ২৯৮ কোটি টাকা। কিন্তু প্রকল্প চালু না হলেও এর ঋণের কিস্তি পরিশোধ করতে হচ্ছে। ইতোমধ্যে বিপিসি ৩ হাজার ৭৭ কোটি টাকা পরিশোধ করেছে। আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে আরও ৬৯০ কোটি টাকার কিস্তি পরিশোধ করতে হবে।
সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হলো, প্রকল্পের কারিগরি ত্রুটি মেরামতের জন্য নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের দেওয়া ১৮ মাসের গ্যারান্টির সময়ও শেষ হয়ে গেছে। এখন কোনো যান্ত্রিক সমস্যা দেখা দিলে তার ব্যয় বিপিসিকেই বহন করতে হতে পারে।
বড় জাহাজ থেকে তেল আনার পদ্ধতিতে পরিবর্তনের লক্ষ্য
মহেশখালীর এই প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য ছিল দেশের তেল আমদানি ও সংরক্ষণ ব্যবস্থাকে আধুনিক করা। বর্তমানে বড় জাহাজ থেকে সরাসরি তেল গ্রহণের পরিবর্তে ছোট জাহাজের মাধ্যমে তেল স্থানান্তর করতে হয়, যা সময়সাপেক্ষ ও ব্যয়বহুল।
নতুন ব্যবস্থায় সমুদ্রে ভাসমান একটি বিশেষ বয়ার সঙ্গে বড় তেলবাহী জাহাজ যুক্ত হবে। সেখান থেকে সমুদ্রের নিচ দিয়ে স্থাপিত পাইপলাইনের মাধ্যমে অপরিশোধিত তেল ও ডিজেল সরাসরি মহেশখালীর সংরক্ষণাগারে পৌঁছাবে।
এই ব্যবস্থার মাধ্যমে বড় জাহাজ থেকে তেল খালাসের সময় কয়েক দিন থেকে কমিয়ে কয়েক ঘণ্টায় আনার লক্ষ্য ছিল। একই সঙ্গে বছরে প্রায় ১ হাজার থেকে ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা পর্যন্ত সাশ্রয়ের প্রত্যাশা করা হয়েছিল।
প্রকল্পের আওতায় সমুদ্র ও স্থলভাগ মিলিয়ে ১১০ কিলোমিটার দীর্ঘ দুটি পাইপলাইন স্থাপন করা হয়েছে। এর একটি দিয়ে অপরিশোধিত তেল এবং অন্যটি দিয়ে ডিজেল পরিবহন করার কথা।
এই পাইপলাইনগুলো মহেশখালীর কালারমারছড়ায় নির্মিত ছয়টি সংরক্ষণ ট্যাংকের সঙ্গে যুক্ত। এর মধ্যে তিনটি অপরিশোধিত তেলের জন্য এবং তিনটি ডিজেল সংরক্ষণের জন্য তৈরি করা হয়েছে। পরে এসব জ্বালানি চট্টগ্রামের ইস্টার্ন রিফাইনারিতে পাঠানোর ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
প্রকল্প শেষ, কিন্তু নিয়মিত পরিচালনা শুরু হয়নি
মহেশখালীর এই প্রকল্পের নির্মাণকাজ শুরু হয় ২০১৮ সালের আগস্টে। বেল্ট অ্যান্ড রোড উদ্যোগের আওতায় চীনের সহজ শর্তের ঋণ, সরকারি অর্থ এবং বিপিসির নিজস্ব অর্থায়নে এটি বাস্তবায়ন করা হয়।
প্রকল্পটি নির্মাণ করেছে চীনের প্রতিষ্ঠান চায়না পেট্রোলিয়াম পাইপলাইন ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি লিমিটেড।
চার দফা সময় বাড়ানোর পর ২০২৪ সালের মার্চে প্রকল্পের নির্মাণকাজ শেষ হয়। তবে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ না হওয়ায় প্রকল্প ব্যয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। শুরুতে প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা ধরা হলেও শেষ পর্যন্ত ব্যয় দাঁড়ায় ৮ হাজার ২৯৮ কোটি টাকা।
২০২৪ সালের মার্চেই পরীক্ষামূলকভাবে প্রকল্প ব্যবহার করা হয়েছিল। তখন গভীর সমুদ্রের জাহাজ থেকে অপরিশোধিত তেল ও ডিজেল পাইপলাইনের মাধ্যমে পাঠানো হয়। কিন্তু এরপর নিয়মিত কার্যক্রম শুরু হয়নি।
অপারেটর নিয়োগেই দীর্ঘ বিলম্ব
প্রকল্পের অন্যতম বড় সমস্যা হলো পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য এখনো দীর্ঘ সময় ধরে অপারেটর নিয়োগ সম্পন্ন না হওয়া।
২০২৪ সালের আগস্টে নির্মাতা প্রতিষ্ঠানকে প্রকল্প বুঝে নেওয়ার সনদ দেয় বিপিসি। তবে এর আগেই অপারেটর নিয়োগের প্রস্তুতি নেওয়া হয়নি বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
২০২৫ সালের এপ্রিলে প্রথমবার আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করা হয়। একজন প্রতিষ্ঠান কারিগরিভাবে যোগ্য হলেও তার প্রস্তাবিত ব্যয় বিপিসির হিসাবের চেয়ে ৫১ শতাংশ বেশি হওয়ায় দরপত্র বাতিল করা হয়।
এরপর সরকার-টু-সরকার পদ্ধতিতেও বিষয়টি বিবেচনা করা হয়। ২০২৬ সালের মার্চের মধ্যে প্রকল্প চালুর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হলেও সেটিও বাস্তবায়িত হয়নি।
পরবর্তীতে ২০২৫ সালের ১৯ ডিসেম্বর দ্বিতীয়বার আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করা হয়। এতে ১১টি প্রতিষ্ঠান দরপত্রের কাগজ সংগ্রহ করলেও শেষ পর্যন্ত তিনটি প্রতিষ্ঠান প্রস্তাব জমা দেয়।
এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ছিল ইন্দোনেশিয়ার পিটি পের্তামিনা ট্রান্স কনটিনেন্টাল, চায়না পেট্রোলিয়াম পাইপলাইন ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি এবং হংকংভিত্তিক হিলং মেরিন ইঞ্জিনিয়ারিং।
মূল্যায়নের পর পিটি পের্তামিনা ট্রান্স কনটিনেন্টালকে পাঁচ বছরের জন্য পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির মূল দর ১২৮ মিলিয়ন ডলার। করসহ মোট মূল্য দাঁড়ায় ১৫৯ দশমিক ১৩৫ মিলিয়ন ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ১ হাজার ৯৪৬ কোটি টাকা।
তবে এখনো প্রতিষ্ঠানটিকে আনুষ্ঠানিকভাবে কাজের আদেশ দেওয়া হয়নি।
চালুর আগেই শেষ হলো গ্যারান্টি
প্রকল্পের নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের দেওয়া ১৮ মাসের ত্রুটি-দায়বদ্ধতার সময় চলতি বছরের আগস্টে শেষ হয়েছে। কিন্তু নিয়মিত কার্যক্রম শুরু না হওয়ায় এখন নতুন কোনো ত্রুটি দেখা দিলে মেরামতের খরচ বিপিসিকেই বহন করতে হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এত বড় বিনিয়োগের পর প্রকল্পটি সময়মতো চালু না হওয়া অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতির কারণ হতে পারে। কারণ একদিকে ঋণের কিস্তি পরিশোধ করতে হচ্ছে, অন্যদিকে প্রত্যাশিত সাশ্রয়ও পাওয়া যাচ্ছে না।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক এম শামসুল আলম মনে করেন, এত বড় সরকারি বিনিয়োগের পর প্রকল্প চালু হতে দেরি হওয়ার কারণ খুঁজে দেখা প্রয়োজন। পাশাপাশি দেরির কারণে যে আর্থিক ক্ষতি হয়েছে, সেটিও মূল্যায়ন করা দরকার।
শিগগির চালুর আশা
বিপিসি জানিয়েছে, অপারেটর নিয়োগের প্রক্রিয়া প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে। বিষয়টি শিগগির সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটিতে উপস্থাপন করা হতে পারে।
জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের কর্মকর্তারাও জানিয়েছেন, প্রক্রিয়াটি শেষ হলে দ্রুত প্রকল্পের কার্যক্রম শুরু করার চেষ্টা করা হবে।
মহেশখালীর এই পাইপলাইন প্রকল্প দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা শক্তিশালী করার একটি বড় উদ্যোগ ছিল। তবে অবকাঠামো তৈরি হওয়ার পরও পরিচালনাগত জটিলতায় এর সুফল আটকে রয়েছে। এখন দ্রুত অপারেটর নিয়োগ ও কার্যক্রম শুরু করাই হবে প্রকল্পটির মূল চ্যালেঞ্জ।

