জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব এবার দেশের আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রমের গুরুত্বপূর্ণ অংশ কনটেইনার ব্যবস্থাপনায় পড়েছে। ডিজেলের দাম বাড়ানোর পর চট্টগ্রামের বেসরকারি ইনল্যান্ড কনটেইনার ডিপো বা আইসিডিগুলোতে বিভিন্ন ধরনের কনটেইনার হ্যান্ডলিং ও পরিবহন সেবার চার্জ ৯ দশমিক ৮৫ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে।
বাংলাদেশ ইনল্যান্ড কনটেইনার ডিপোস অ্যাসোসিয়েশন (বিকডা) এই নতুন মূল্য সমন্বয়ের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সংগঠনটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, আইসিডিগুলোতে ব্যবহৃত জ্বালানিচালিত যন্ত্রপাতি, পরিবহন ব্যবস্থা এবং পরিচালন ব্যয় বেড়ে যাওয়ার কারণে এই অতিরিক্ত জ্বালানি সারচার্জ আরোপ করা হয়েছে।
বিকডার জারি করা সার্কুলার অনুযায়ী, নতুন নির্ধারিত চার্জ ২১ সেপ্টেম্বর থেকেই কার্যকর হয়েছে। সার্কুলারে স্বাক্ষর করেছেন সংগঠনটির মহাসচিব রুহুল আমিন সিকদার।
এর আগে একই দিনে সরকার ডিজেলের দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত কার্যকর করে। প্রতি লিটার ডিজেলের দাম ১১৫ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৩৫ টাকা করা হয়েছে। অর্থাৎ প্রতি লিটারে দাম বেড়েছে ২০ টাকা, যা প্রায় ১৭ দশমিক ৪ শতাংশ বৃদ্ধি।
বিকডার মতে, ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধির কারণে আইসিডিগুলোর অভ্যন্তরীণ পরিবহন, কনটেইনার স্থানান্তর এবং বিভিন্ন যান্ত্রিক কার্যক্রমের ব্যয় বেড়েছে। এই বাড়তি খরচ সমন্বয় করতেই নতুন সারচার্জ নির্ধারণ করা হয়েছে।
যেসব সেবায় বাড়ছে খরচ
নতুন ৯ দশমিক ৮৫ শতাংশ সারচার্জ বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কনটেইনার সেবার ক্ষেত্রে কার্যকর হবে।
এর মধ্যে রয়েছে চট্টগ্রাম বন্দর ও বেসরকারি আইসিডিগুলোর মধ্যে খালি কনটেইনার পরিবহন এবং পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনাল ও আইসিডির মধ্যে কনটেইনার স্থানান্তর কার্যক্রম।
এ ছাড়া খালি কনটেইনার গাড়িতে তোলা এবং গাড়ি থেকে নামানোর জন্য নির্ধারিত লিফট-অন ও লিফট-অফ চার্জেও এই বাড়তি মূল্য যুক্ত হবে।
রপ্তানি পণ্য ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রেও নতুন খরচ যোগ হচ্ছে। রপ্তানি পণ্য স্টাফিং ও হ্যান্ডলিং প্যাকেজের আওতায় খালি ইয়ার্ড থেকে কনটেইনার আনা, কনটেইনার ফ্রেইট স্টেশন এলাকায় নেওয়া, পণ্য কনটেইনারে বোঝাই করা, পণ্যভর্তি কনটেইনার নির্ধারিত ইয়ার্ডে স্থানান্তর এবং পরে চট্টগ্রাম বন্দর বা পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনালে পাঠানোর কার্যক্রম রয়েছে।
একইভাবে রপ্তানি পণ্যবোঝাই কনটেইনারের ওজন পরিমাপ বা ভেরিফায়েড গ্রস ম্যাস চার্জও ৯ দশমিক ৮৫ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে।
এই সেবার মধ্যে কনটেইনার লোড ইয়ার্ড থেকে ওজন মাপার স্থানে নেওয়া, ওজন করা এবং পুনরায় নির্ধারিত স্থানে ফিরিয়ে রাখার কাজ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
আমদানি পণ্য ডেলিভারি কার্যক্রমেও বাড়তি খরচ যুক্ত হবে। এর মধ্যে রয়েছে চট্টগ্রাম বন্দর বা পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনাল থেকে আমদানি পণ্যভর্তি কনটেইনার আইসিডিতে আনা, তা নামানো, সংরক্ষণ করা এবং শ্রমিকের মাধ্যমে পণ্য খালাস করে ট্রাকে তুলে দেওয়ার কার্যক্রম।
আমদানি-রপ্তানি খাতে বাড়বে ব্যয়ের চাপ
বেসরকারি আইসিডিগুলো দেশের আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রমের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে কাজ করে। চট্টগ্রাম বন্দরের সঙ্গে যুক্ত প্রায় সব ধরনের আমদানি ও রপ্তানি পণ্য ব্যবস্থাপনায় এসব আইসিডির ভূমিকা রয়েছে।
তাই আইসিডি সেবার খরচ বাড়লে এর প্রভাব সরাসরি পণ্য পরিবহন ও সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর পড়তে পারে। ব্যবসায়ীদের মতে, জ্বালানি, পরিবহন ও লজিস্টিকস খাতে ব্যয় বাড়লে উৎপাদন ও রপ্তানি কার্যক্রম পরিচালনার খরচও বাড়বে।
বিশেষ করে রপ্তানিমুখী শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলো বর্তমানে কাঁচামালের দাম, উৎপাদন ব্যয় এবং বৈশ্বিক বাজারের প্রতিযোগিতার চাপে রয়েছে। নতুন করে কনটেইনার ব্যবস্থাপনা খরচ বৃদ্ধি তাদের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি করতে পারে।
অন্যদিকে আমদানি পণ্যের ক্ষেত্রেও পরিবহন ব্যয় বাড়লে বাজারে পণ্য সরবরাহের মোট খরচ বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
বিকডা তাদের সদস্য আইসিডিগুলোকে সর্বশেষ নির্ধারিত হারের ওপর ৯ দশমিক ৮৫ শতাংশ বৃদ্ধির বিষয়টি গ্রাহকদের আনুষ্ঠানিকভাবে জানানোর নির্দেশ দিয়েছে।
জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির পর পরিবহন, শিল্প উৎপাদন এবং সরবরাহ ব্যবস্থার বিভিন্ন পর্যায়ে যে ব্যয়ের চাপ তৈরি হয়েছে, আইসিডির নতুন চার্জ বৃদ্ধি তারই আরেকটি প্রভাব হিসেবে দেখা হচ্ছে। এখন ব্যবসায়ীরা নতুন এই বাড়তি খরচ কীভাবে সামাল দেন, সেটিই হবে আমদানি-রপ্তানি খাতের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।

