আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম হঠাৎ বেড়ে যাওয়ায় মাত্র পাঁচ মাসেই বিশাল অঙ্কের লোকসানের মুখে পড়েছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন। চলতি বছরের মার্চ থেকে জুলাই পর্যন্ত এই সময়ে সংস্থাটির লোকসানের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় বিশ হাজার কোটি টাকা। এই তথ্য উঠে এসেছে জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগ থেকে গতকাল মঙ্গলবার অর্থ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো এক চিঠিতে, যেখানে নতুন করে ভর্তুকির আবেদনের পাশাপাশি সংস্থাটির পুরনো ঋণ মওকুফেরও অনুরোধ জানানো হয়েছে।
চিঠি অনুযায়ী, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারির শেষ দিক থেকে ইরান এবং যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের মধ্যে শুরু হওয়া সংঘাতের প্রভাবে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়। তবে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা ও সার্বিক অর্থনৈতিক স্বার্থের কথা বিবেচনা করে সেই সময় স্থানীয় বাজারে দাম সমন্বয় করা হয়নি। এর ফলেই মার্চ থেকে জুলাই—এই পাঁচ মাসে সংস্থাটির মোট লোকসান দাঁড়ায় প্রায় বিশ হাজার উনষাট কোটি তিয়াত্তর লাখ টাকায়। মাসভিত্তিক হিসাবে দেখা যায়, মার্চে লোকসান হয়েছে দুই হাজার দুইশ আটচল্লিশ কোটি টাকা, এপ্রিলে তা বেড়ে দাঁড়ায় সাত হাজার আটশ ছেষট্টি কোটি টাকায়, মে মাসে কিছুটা কমে দুই হাজার ছয়শ একুশ কোটি টাকা, জুনে আবার বেড়ে ছয় হাজার একশ আটানব্বই কোটি টাকা এবং জুলাইয়ে তুলনামূলক কম—এক হাজার একশ পঁচিশ কোটি টাকা।
চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে, বাজার পরিস্থিতি এখনো অপরিবর্তিত থাকায় সংস্থাটির লোকসান অব্যাহত রয়েছে। এই ক্ষতি পুষিয়ে নিতে গত ১৭ আগস্ট বিপিসি জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগের কাছে ভর্তুকির জন্য আবেদন করে। এর আগেও চলতি বছরের ২ জুলাই, ২৮ জুলাই এবং ১৩ আগস্ট—তিন দফায় জ্বালানি বিভাগ থেকে অর্থ মন্ত্রণালয়ের কাছে ভর্তুকির অনুরোধ পাঠানো হয়েছিল। তবে এখন পর্যন্ত কোনো ভর্তুকি ছাড় হয়নি বলে চিঠিতে জানানো হয়েছে।
নতুন ভর্তুকির পাশাপাশি চিঠিতে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব রাখা হয়েছে—সরকারের কাছ থেকে নেওয়া বিপিসির সাড়ে সাতাশ হাজার কোটি টাকার পুরনো ঋণকে সরাসরি ভর্তুকিতে রূপান্তরের অনুরোধ। উল্লেখ্য, এই প্রস্তাব একেবারে নতুন নয়; অতীতেও একাধিকবার একই আবেদন জানানো হয়েছিল।
এই ঋণের উৎস সম্পর্কে চিঠিতে বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে। ১৯৯৯-২০০০ থেকে ২০১৩-১৪ অর্থবছর পর্যন্ত দীর্ঘ সময় ধরে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বাড়লেও দেশের বাজারে তার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ মূল্য সমন্বয় করা হয়নি। ফলে কম দামে তেল বিক্রির কারণে যে আর্থিক ঘাটতি তৈরি হয়েছিল, তা মেটাতে বিভিন্ন সময়ে বিপিসিকে ঋণ দেওয়া হয়। ধীরে ধীরে এই ঋণের পরিমাণ গিয়ে দাঁড়ায় সাড়ে সাতাশ হাজার কোটি টাকায়, যার মধ্যে প্রায় চার হাজার কোটি টাকা সরাসরি ঋণ হিসেবে এবং বাকি সাড়ে বাইশ হাজার কোটি টাকা লোকসান সমন্বয়ের ঋণ হিসেবে দেওয়া হয়েছিল।
এই ঋণ ভর্তুকিতে রূপান্তরের চেষ্টা অবশ্য নতুন নয়—দীর্ঘদিন ধরেই এই প্রক্রিয়া ঝুলে আছে। ২০১৬ সালের ডিসেম্বরে প্রথমবারের মতো জ্বালানি বিভাগ এই ঋণ ভর্তুকিতে রূপান্তরের জন্য অর্থ বিভাগকে অনুরোধ জানিয়েছিল। তখনকার অর্থমন্ত্রী শর্ত দিয়েছিলেন, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের বকেয়া ভ্যাট পরিশোধ সাপেক্ষে বিষয়টি নিষ্পত্তি হবে। সেই শর্ত মেনে বিপিসি পাঁচ কিস্তিতে প্রায় ছাব্বিশশ কোটি টাকার বকেয়া ভ্যাট ২০২০ সালের মধ্যে পরিশোধও করে দেয়। এরপর ২০২১ সালের এপ্রিলে আবারও একই অনুরোধ জানানো হলেও শেষ পর্যন্ত বিষয়টির কোনো চূড়ান্ত সুরাহা হয়নি। এই দীর্ঘ প্রক্রিয়ার মধ্যেই বিপিসি উদ্বৃত্ত তহবিল ও লভ্যাংশ বাবদ প্রায় সাড়ে ষোলো হাজার কোটি টাকা ইতিমধ্যে সরকারি কোষাগারে জমা দিয়েছে।
চিঠির সংযুক্তিতে বিপিসির আর্থিক প্রবাহের আরও কিছু তথ্য উঠে এসেছে। ২০১৪-১৫ অর্থবছর থেকে যখন আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম কমতে শুরু করে, তখন সংস্থাটি মুনাফার ধারায় ফেরে। সেই সময় থেকে বিপিসি রাষ্ট্রায়ত্ত বিভিন্ন ব্যাংকের কাছে থাকা প্রায় একত্রিশ হাজার কোটি টাকার দেনা পরিশোধ করে। পাশাপাশি পেট্রোবাংলার পাওনা, ভ্যাট কর্তৃপক্ষের বকেয়া এবং রিফাইনারি ইউনিটের জন্য জমি কেনার অর্থও পরিশোধ করা হয়েছে এই সময়ে। সরকারকে লভ্যাংশ হিসেবেও একটি অংশ প্রদান করেছে সংস্থাটি, পাশাপাশি বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের জন্যও তহবিল সংরক্ষণ করতে হচ্ছে তাদের।
সব মিলিয়ে দেখা যাচ্ছে, জ্বালানি তেলের বৈশ্বিক মূল্যবৃদ্ধির চাপ, দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত ঋণ জটিলতা এবং নিয়মিত ভর্তুকির প্রয়োজনীয়তা—এই তিনের সম্মিলিত চাপে বিপিসির আর্থিক অবস্থা এখন এক জটিল সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে, যার সমাধান নির্ভর করছে সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্তের ওপর।

