বাংলাদেশের জন্য নতুন ঋণ কর্মসূচি নিয়ে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সঙ্গে আলোচনা শুরু হতে যাচ্ছে। তবে সম্ভাব্য এই ঋণ কর্মসূচিতে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে সরকারের ক্রমবর্ধমান ভর্তুকি ব্যয়।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা মনে করছেন, আগামী মাসে অথবা নভেম্বরের শুরুতে নতুন ঋণ কর্মসূচি নিয়ে আইএমএফের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরু হতে পারে। আলোচনায় বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে সরকারের বিপুল ভর্তুকি ব্যয় অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠতে পারে।
এর আগে বাংলাদেশের জন্য ৫ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারের ঋণ কর্মসূচি চালু করেছিল আইএমএফ। ওই কর্মসূচির আওতায় সংস্থাটি বারবার বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে ভর্তুকি কমানোর বিষয়ে সরকারকে পরামর্শ দিয়েছিল।
তবে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বৃদ্ধি, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত এবং আমদানি ব্যয় বেড়ে যাওয়ার কারণে সরকার বর্তমানে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয় করতে বাধ্য হচ্ছে।
অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর তথ্য অনুযায়ী, গত অর্থবছরে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে ভর্তুকি ব্যয় ৪০০ বিলিয়ন টাকা ছাড়িয়েছে। উৎপাদন ও আমদানি খরচের তুলনায় কম দামে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ করার কারণে সরকারের ওপর এই অতিরিক্ত আর্থিক চাপ তৈরি হয়েছে।
চলতি অর্থবছরের বাজেটে সরকার বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকির জন্য ৩৭০ বিলিয়ন টাকা বরাদ্দ রেখেছে। পাশাপাশি এলএনজি ভর্তুকির জন্য আরও ১১০ বিলিয়ন টাকা রাখা হয়েছে। অর্থাৎ শুধু বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতেই মোট বরাদ্দ দাঁড়িয়েছে ৪৮০ বিলিয়ন টাকা।
তবে অর্থ বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, গত আড়াই মাসেই জ্বালানি আমদানি কার্যক্রম চালিয়ে নিতে প্রায় ২৩৮ বিলিয়ন টাকা ছাড় করা হয়েছে।
আইএমএফের দৃষ্টিতে বর্তমান ভর্তুকি ব্যবস্থার একটি বড় সমস্যা হলো, এর সুবিধা শুধু দরিদ্র জনগোষ্ঠীর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। উচ্চ আয়ের মানুষও একই দামে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি ব্যবহারের সুবিধা পাচ্ছেন।
জুলাই মাসে আইএমএফের একটি অনুসন্ধানী দল সরকারকে পরামর্শ দিয়েছিল, ভর্তুকি ব্যবস্থাকে আরও লক্ষ্যভিত্তিক করতে হবে। অর্থাৎ যাদের প্রকৃত সহায়তা প্রয়োজন, তাদের কাছেই যেন সরকারি অর্থের সুবিধা পৌঁছায়।
অর্থ বিভাগের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, নতুন ঋণ কর্মসূচির আওতায় আইএমএফ এত বড় পরিমাণ ভর্তুকি ব্যয় অব্যাহত রাখার বিষয়ে আপত্তি জানাতে পারে। সংস্থাটি বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে ভর্তুকি কমানোর পাশাপাশি দাম সমন্বয়ের বিষয়েও চাপ দিতে পারে।
তবে সরকারের কর্মকর্তারা বলছেন, মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংকট এবং আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতার কারণে স্বল্পমেয়াদে ভর্তুকি কমানো কঠিন হতে পারে। সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে জ্বালানির দামও উচ্চ পর্যায়ে থাকতে পারে।
নতুন ঋণ কর্মসূচির আওতায় বাংলাদেশ ৪ থেকে ৪ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারের অর্থায়ন পাওয়ার আশা করছে। এই অর্থ দেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এবং প্রয়োজনীয় সংস্কার কার্যক্রম এগিয়ে নিতে সহায়তা করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
অর্থ বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, অক্টোবরের দ্বিতীয় সপ্তাহে থাইল্যান্ডে অনুষ্ঠিতব্য আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল ও বিশ্বব্যাংকের বার্ষিক সভার সময় বাংলাদেশের প্রতিনিধিদল আইএমএফের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করবে।
এই বৈঠকে নতুন ঋণ কর্মসূচির বিষয়ে প্রাথমিক আলোচনা হবে। বাংলাদেশ সরকার ইতিবাচক সিদ্ধান্ত নিলে আইএমএফের একটি প্রতিনিধি দল অক্টোবরের শেষ দিকে অথবা নভেম্বরের শুরুতে ঢাকায় এসে আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরু করতে পারে।
নতুন ঋণ কর্মসূচিতে শুধু ভর্তুকি নয়, ব্যাংক খাত ও রাজস্ব ব্যবস্থার সংস্কারও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হতে পারে।
অর্থ বিভাগের কর্মকর্তারা মনে করছেন, আইএমএফের সঙ্গে নতুন কর্মসূচিতে যুক্ত হলে ব্যাংক খাতের দুর্বলতা দূর করা এবং রাজস্ব আয় বাড়ানোর মতো সংস্কার কার্যক্রম বাস্তবায়নে সরকারের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হবে।
একজন অর্থ বিভাগের কর্মকর্তা বলেন, আইএমএফ কর্মসূচি থাকলে সরকার সাধারণত প্রয়োজনীয় সংস্কার বাস্তবায়নে বেশি গুরুত্ব দেয়। বর্তমানে দেশের রাজস্ব আয় অর্থনীতির প্রয়োজন অনুযায়ী বাড়ছে না, তাই কর ব্যবস্থায় বড় ধরনের সংস্কার প্রয়োজন।
ব্যাংক খাতের সংস্কার নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। কর্মকর্তাদের মতে, আগের আইএমএফ কর্মসূচিতে ব্যাংক খাত সংস্কারের বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হলেও এখনো কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি হয়নি।
বিশেষ করে খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণ, ব্যাংকের আর্থিক সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং নিয়ন্ত্রণ কাঠামো শক্তিশালী করা নতুন কর্মসূচির আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
বাংলাদেশের আগের আইএমএফ ঋণ কর্মসূচি ছিল ৫ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারের। তবে বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর আগের সরকারের সময় নেওয়া অনেক সংস্কার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন কঠিন মনে করে ওই কর্মসূচি বাতিল করে।
আগের কর্মসূচির আওতায় আইএমএফ বাংলাদেশকে মোট ৩ দশমিক ৫৯৫ বিলিয়ন ডলার ছাড় করেছিল।
নতুন ঋণ কর্মসূচি বাংলাদেশের জন্য একদিকে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখার সুযোগ তৈরি করতে পারে, অন্যদিকে ভর্তুকি ব্যবস্থাপনা, জ্বালানির দাম সমন্বয় এবং আর্থিক খাত সংস্কারের মতো কঠিন সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রয়োজন তৈরি করতে পারে।
বর্তমানে বাংলাদেশের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হলো, জনগণের ওপর অতিরিক্ত চাপ না বাড়িয়ে কীভাবে অর্থনৈতিক সংস্কার এগিয়ে নেওয়া যায়। নতুন আইএমএফ কর্মসূচির সফলতা অনেকাংশে নির্ভর করবে এই ভারসাম্য কতটা কার্যকরভাবে বজায় রাখা যায় তার ওপর।

