জাপানের বিশাল পোশাক বাজারে বাংলাদেশের উপস্থিতি জোরদার করতে বিশেষ একটি ‘জাপান ডেস্ক’ চালু করেছে বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ)। প্রায় দুই হাজার দুইশ কোটি ডলার আকারের এই বাজার ধরতে এই কৌশলগত উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যার আওতায় জাপানি ক্রেতাদের সঙ্গে কাজ করার জন্য ইতিমধ্যে প্রায় একশটি পোশাক কারখানাকে বেছে নেওয়া হয়েছে।
বুধবার ঢাকায় বিজিএমইএর কার্যালয়ে এই ডেস্কের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন হয়। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশে নিযুক্ত জাপানের রাষ্ট্রদূত। এ ছাড়া জাপানের কয়েকটি বড় ক্রেতা ও শিল্প প্রতিষ্ঠানের জ্যেষ্ঠ প্রতিনিধিরাও এতে অংশ নেন।
বিজিএমইএর তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বাংলাদেশ জাপানে প্রায় একশ কোটি ডলারের কিছু বেশি মূল্যের পোশাক রপ্তানি করে থাকে। নতুন এই উদ্যোগের মাধ্যমে ২০৩০ সালের মধ্যে এই রপ্তানি তিনগুণ বাড়িয়ে তিনশ কোটি ডলারে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন সংগঠনের একজন পরিচালক।
বিজিএমইএর ভাষ্য অনুযায়ী, এই ডেস্কের মূল কাজ হবে ক্রেতা ও সরবরাহকারীদের মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরি করা, কোনো বিরোধ দেখা দিলে তা নিষ্পত্তিতে সহায়তা করা, এবং একই ক্রেতার কাছ থেকে বারবার ক্রয়াদেশ পাওয়ার সুযোগ তৈরি করা।
জাপান-বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির একজন শীর্ষ কর্মকর্তা বলেন, জাপানের বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান মজবুত করতে শুধু বাণিজ্য চুক্তির সুবিধা যথেষ্ট নয়—বরং আস্থা, পণ্যের মান ও প্রতিশ্রুতি রক্ষার সংস্কৃতিই আসল চাবিকাঠি হতে পারে।
বিজিএমইএর সভাপতি জানান, এই ডেস্ক বিশেষভাবে সেই জাপানি ক্রেতাদের সহায়তা করবে যারা তুলনামূলক ছোট বা নমনীয় পরিমাণে ক্রয়াদেশ দিতে চান। তার ব্যাখ্যায়, ছোট ক্রয়াদেশ মানেই ছোট ক্রেতা নয়—বরং ক্রেতার প্রয়োজন অনুযায়ী উপযুক্ত কারখানার সঙ্গে যুক্ত করাই এই উদ্যোগের লক্ষ্য। তিনি আরও স্পষ্ট করেন, এই ডেস্ক কোনো ব্যক্তিবিশেষের উদ্যোগ নয়, বরং সম্পূর্ণ প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোতে গঠিত হয়েছে, যাতে বাংলাদেশি উৎপাদক ও জাপানি ক্রেতাদের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্ক গড়ে ওঠে।
জাপানের রাষ্ট্রদূত তার বক্তব্যে বলেন, বাংলাদেশ মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হওয়ার পথে এগিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দেশের উৎপাদকদের এখন থেকেই কৃত্রিম ও রাসায়নিক তন্তুর মতো উচ্চমূল্যের পণ্য উৎপাদনে বৈচিত্র্য আনার প্রস্তুতি নেওয়া উচিত। একই অনুষ্ঠানে উপস্থিত একটি জাপানি বস্ত্র কোম্পানির একজন মহাব্যবস্থাপক মনে করেন, বাংলাদেশের উৎপাদন সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে, যা জাপানের বাজারে প্রবেশের জন্য এখন একটি বড় সুযোগ তৈরি করেছে। অন্য একটি জাপানি বাণিজ্য প্রতিষ্ঠানের প্রধান প্রতিনিধির মতে, দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য সম্প্রসারণে পণ্যের মান, পরস্পরের প্রতি আস্থা এবং সরবরাহ ব্যবস্থার দক্ষতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
অনুষ্ঠানে জ্বালানি খাতেও দুই দেশের সহযোগিতার বিষয়টি সামনে আসে। জাপানের রাষ্ট্রদূত জানান, বাংলাদেশসহ এশিয়ার বিভিন্ন দেশকে সম্পৃক্ত করে জাপান একটি নতুন জ্বালানি সহযোগিতা কাঠামো তৈরি করছে। বাংলাদেশের জ্বালানি খাতের সক্ষমতা আরও বাড়াতে সরকারি পর্যায়ে নতুন প্রকল্প নেওয়ার বিষয়টিও জাপান বিবেচনা করছে বলে তিনি জানান, এবং উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগের মাধ্যমে শিগগিরই এ নিয়ে একটি সমঝোতায় পৌঁছানো সম্ভব হতে পারে বলে আশা প্রকাশ করেন।
তিনি আরও উল্লেখ করেন, উচ্চ জ্বালানি মূল্য ও লোডশেডিংয়ের মতো সমস্যার কারণে বাংলাদেশের মানুষ যে চাপের মধ্যে রয়েছেন, সে বিষয়ে জাপানও সমানভাবে সচেতন এবং এই উদ্বেগের সঙ্গে একমত।
অনুষ্ঠান শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় জেবিসিসিআইয়ের সভাপতি জানান, জাপান একটি নতুন জ্বালানি কাঠামো নিয়ে কাজ করছে বলে তারা জেনেছেন, যেখানে অংশগ্রহণকারী দেশগুলো জ্বালানি সংকটের সময় একে অপরকে সহায়তা করতে পারবে। তবে এ বিষয়ে এখনও আরও বিস্তারিত তথ্য প্রয়োজন বলে তিনি মন্তব্য করেন।
সামগ্রিকভাবে এই উদ্যোগ বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের বাজার বহুমুখীকরণের প্রচেষ্টায় একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে, যা আগামী কয়েক বছরে জাপানের বাজারে দেশের অবস্থান আরও মজবুত করবে বলে সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন।

